4:45 pm , May 6, 2026
বিশেষ প্রতিবেদক ॥
দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পরে অতিবর্ষণে বরিশালে সরকারি হিসেবেই লক্ষাধিক কৃষকের ৮৫ কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমান দেড়শ কোটি টাকারও বেশি। গত তিনদিন ভারী কোন বর্ষণ না হওয়ায় ইতোমধ্যে উঠতি বোরো, রোপা আউশ সহ বীজতলা এবং মুগ, সয়াবিন ও সূর্যমুখী সহ অন্তত ১৭টি ফসলের ভয়াবহ ক্ষতির চিহৃ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
এ অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধাদের অভিযোগ, ‘গণমাধ্যম সহ সরকারি প্রশাসন সবাই শুধু হাওড় নিয়ে আছে’। কিন্তু মার্চের বৃষ্টিপাতের ৪৯ ভাগ ঘাটতির পরে এপ্রিলে ১৬৯ ভাগ বেশি বৃষ্টিপাত বরিশালের ফসলের অনেক মাঠ বিরান করে দিয়েছে’। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের রেকর্ড ভারী বৃষ্টিপাতে বরিশালের প্রায় ২৫ হাজার টন ফসলের উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৮৫ কোটি টাকা। সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় উঠতি বোরো ধান ছাড়াও মুগ ডাল, চিনা বাদাম, মরিচ, সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল ফসল ছাড়াও বিপুল রোপা আউশ ও আউশ বীজতলাও রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-ডিএই’র মতে সদ্য বিদায়ী রবি মৌসুমে আবাদকৃত প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার হেক্টরের মধ্যে এখনো ২.৮১ লাখ হেক্টর জমির ফসল মাঠে। যার ১.৯১ লাখ হেক্টরই গত সপ্তাহের লাগাতার প্রবল বর্ষণে আক্রান্ত হয়েছে। এর প্রায় পুরোটাই সম্পূর্ণ থেকে আংশিক ক্ষতির কবলে পড়ে। যারমধ্যে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জমির প্রায় ২৫ হাজার টন ফসল সম্পূর্ণভাবেই বিনষ্ট হয়ছে।
ডিএই’র মতে ৭৫,৬১১ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির তলায় চলে যাবার ফলে ৫শ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ফলে প্রায় আড়াই হাজার টন বোরো চালের উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টরের মুগ ডালের জমি প্লাবনের শিকার হয়েছে। যারমধ্যে প্রায় ৯ হাজার হেক্টরের মুগ সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়েছে। ফলে প্রায় ১০ হাজার টন মুগডালের উৎপাদন ঘাটতি তৈরী হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।
অনুরূপভাবে সাড়ে ১০ হাজার হেক্টরের চিনা বাদাম ছাড়াও বিপুল পরিমান রোপা আউশ ও আউশ বীজতলা এবং প্রায় ৪ হাজার হেক্টরের গ্রীষ্মকালীণ সবজি এবং ৫ হাজার হেক্টরের সয়াবিন ও আড়াই হাজার হেক্টরের সূর্যমুখী তেল বীজের বাগান অতিবর্ষণে প্লাবিত হয়ে ভয়াবহ ক্ষতির কবলে পড়েছে।
তবে এখনো প্রায় ১ লাখ হেক্টরের উঠতি বোরো ধান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বরিশাল কৃষি অঞ্চলে আবাদকৃত প্রায় ৪ লাখ হেক্টরে চলতি মৌসুমে প্রায় ১৮ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তোলার কথা। কিন্তু মাঝারী থেকে বড় ধরনের কোন ঝড় ছাড়াই অনাবৃষ্টির পরে অতি বৃষ্টিতে কৃষকের স্বপ্ন ভঙ্গ হতে চলেছে। এখনো বোরো ধানের মাত্র ৩০ ভাগও কর্তন সম্ভব হয়নি। অন্তত পৌনে ৩ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান মাঠে। এসব ধানের অন্তত ১ লাখ হেক্টরই ‘হার্ড ডাব’ বা পাকার পর্যায়ে রয়েছে। যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ঘরে তুলতে হবে। অবশিষ্ট আরো অন্তত দেড় লাখ হেক্টর ‘সফট ডাব’ বা দুধ পর্যায়ে, যা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কর্তন শুরু করতে হবে। ফ্লাওয়ারিং স্টেজে রয়েছে অবশিষ্ট ধান। যা চলতি মাসের শেষভাগে কর্তন শুরু করতে হবে।
কিন্তু বোরোর মাঠে পানি এবং নরম মাটির কারণে এসব জমিতে হার্ভেস্টার নামতে পারছে না। উপরন্তু বরিশাল অঞ্চলে এখনো কৃষি ব্যবস্থার অর্ধেকও যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়নি। ফলে হার্বেস্টারেরও সংকট রয়েছে।
সব মিলিয়ে বৈশাখের ভারী বর্ষণ বোরো ধান নিয়ে চরম বিপাকে ফেলেছে বরিশাল অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধাদের। টানা অনাবৃষ্টিতে অতিরিক্ত সেচ আর ডিজেল নিয়ে নানামুখি অপতৎপরতার পরে বাড়তি দামে জ¦ালানী সংগ্রহে সেচ ও উৎপাদন ব্যায় বৃদ্ধির মধ্যেই বৈশাখের অতি বর্ষণে বিপুল পরিমান বোরো ধান পানির তলায়। এমনকি অতিবর্ষণের সাথে হালকা ঝড়ো হাওয়ায় অনেক জমির ধান ইতোমধ্যে নুয়ে পড়েছে। ফলে এসব ধানে চিটা ছাড়াও আংশিক থেকে পূর্ণ ক্ষতির আশংকাও বাড়ছে।
টানা ১২৭ দিন পরে গত ৯ মার্চ বরিশালে প্রথম বৃষ্টি হলেও পুরো মার্চজুড়ে ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৯%। ফলে বোরো ধানের জমিতে অতিরিক্ত সেচ দিতে হয়েছে। আবাহাওয়া বিভাগ এপ্রিলে বরিশালে ১২০-১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পূর্বভাস দিলেও ২০ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছিল মাত্র ৩১ মিলিমিটার। ফলে বোরো ধানে বাড়তি সেচের প্রয়োজনে ডিজেলের অতিরিক্ত চাহিদার সাথে মূল্য বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যায়ও বেড়ে গেছে। সাথে তাপমাত্রার পারদ স্বাভাবিকের ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ওপরে উঠে যাওয়ায় জমিতে পানি ধরে রাখতে বাড়তি দামেই অতিরিক্ত সেচ দিতে এবার বোরো ধানের উৎপাদন ব্যায় সাড়ে ১২শ টাকার ওপরে উঠে যাবার মধ্যেই এপ্রিলের শেষ সপ্তাহজুড়ে লাগাতার ভারী বর্ষণে বোরো সহ সব রবি ফসলের জমি পানির তলায় চলে যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, ভাটি এলাকা বিধায় এ অঞ্চলে ১৫ মার্চ পর্যন্ত রোপন অব্যাহত থাকায় বোরো ধান পাকে প্রায় একমাস বিলম্বে।
কিন্তু এবারের বৈশাখের অতি বর্ষণ সহ নানামুখি প্রাকৃতিক ছন্দপতন এ অঞ্চলের কৃষকের সব স্বপ্নকে মুছে দিয়েছে।
