4:15 pm , April 19, 2026
বিশেষ প্রতিবেদক ॥
মৌসুমের প্রায় শেষভাগে এসে ডিজেল সংকটের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিপাকে পড়েছেন বোরো চাষীরা। রোববার মধ্যরাত থেকে অন্যান্য জ¦ালানীর সাথে ডিজেলের দামও ১৫ ভাগ বৃদ্ধি করায় ধানের উৎপাদন ব্যায়ও ১২শ টাকার ওপরে উঠে যাবে বলে দাবী কৃষক সহ কৃষিবীদদের। যদিও দেশের বেশীরভাগ এলাকায় বোরো ধানে সেচ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু ভাটির বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বোরো’র আবাদ শেষ হয়েছে ১৫ মার্চ। ফলে এ অঞ্চলে পুরো মে মাসজুড়েই বোরো জমিতে সেচ প্রদানের কোন বিকল্প নেই ।
উপরন্তু চলতি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ব্যাপক ঘাটতিতেও জমিতে অতিরিক্ত সেচ প্রদান অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। গত ৯ মার্চ বরিশালে প্রথম বৃষ্টি হলেও পুরো মার্চজুড়ে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৯%। আর আবহাওয়া বিভাগের দীর্ঘ মেয়াদী বুলেটিনে চলতি মাসে বরিশালে ১২০-১৪০ এবং মে মাসে ২৩০-২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয়া হলেও ১৯ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত বরিশালে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৩১ মিলিমিটার। ফলে তাপমাত্রার পারদও স্বাভাবিকের ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ওপরে উঠে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বরিশালে তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রীতে ছুঁই ছুঁই করছে। ফলে জমিতে পানি ধরে রাখতে বাড়তি সেচও দিতে হচ্ছে।
এমনকি চলতি মাসে বরিশাল সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ২-৩টি লঘুচাপের পাশাপাশি ১টি নি¤œচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে বিভিন্ন সময়ে তীব্র কালবৈশাখী ঝড়েরও পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া অফিস। তবে এখনো তারসাথে বাস্তবতার তেমন কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এদিকে বরিশাল সহ বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের মাঠে থাকা প্রায় ৪ লাখ হেক্টর বোরো ধানের জমিতে সেচকাজে এবার যে প্রায় ৮৭ হাজার পাওয়ার পাম্প চলমান রয়েছে, তার প্রায় ৭৪ হাজারই ডিজেলচালিত। এসব পাম্পে গড়ে দৈনিক ৫ লক্ষাধিক লিটার ডিজেল প্রয়োজন। ডিএই’র মতে মাঠে থাকা প্রায় ৪ লাখ হেক্টরের বোরো ধান থেকে ১৮ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তুলতে হলে পুরো মে মাসজুড়ে জমিতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দেড় থেকে ২ ইঞ্চি পরিমান পানি রাখতে হবে। ফলে সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কোন বিকল্প নেই।
এতে করে আরো অন্তত ৩৫-৪০ দিন ডিজেল সরবরাহ নির্বিঘœ রাখার দাবী কৃষকদের। এরই মাঝে বৈশি^ক জ¦ালানী সরবরাহ সংকটে দেশে ডিজেলের মূল্য ১৫ ভাগ বৃদ্ধির বিষয়টি কৃষকদের চরমভাবে হতাশ করেছে। এতে করে এবার বোরো ধানের উৎপাদন ব্যায় সাড়ে ১২শ টাকা অতিক্রম করবে বলে জানিয়ে ধানের দরপতন কৃষকদের পথে বসিয়ে দিতে পারে বলেও শংকিত মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদরা।
অপরদিকে বরিশাল অঞ্চলে এখনো ফসলের মাঠে সেচাবাদে ব্যবহৃত পাওয়ার পাম্পের ৯০ ভাগই ব্যায়বহুল ডিজেলচালিত হলেও তাতে সরকারি কোন ভর্তুকি নেই। অথচ ২০০২ সাল থেকে সেচাবাদে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত পাম্পে সরকার ২০ ভাগ ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কিন্তু ২০০৫ সালে একবারই সরকার সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকি প্রদান করলেও পরে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে একই দেশে দুই নিয়মে দক্ষিণাঞ্চলে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যায় অন্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশী। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে সেচকাজে ডিজেলের ব্যবহারের কারণেই দেশে বোরো ধান উৎপাদনে সেচব্যায় সারা বিশে^র সর্বাধিক, প্রায় ২৯%।
বোরো উৎপাদন ব্যায় হ্রাস সহ ডিজেলের নতুন করে মূল্যবৃদ্ধিজনিত বর্তমান সংকট উত্তরনে চলতি মৌসুম থেকেই সেচাবাদে ডিজেল ব্যহারের ওপর ভর্তুকি বা প্রনোদনা প্রদানের দাবী জানিয়েছেন কৃষিবীদরা। তা নাহলে দেশের প্রধান এ দানাদার খাদ্য ফসল উৎপাদনে আসল টাকা তুলতে পারবেন না কৃষকরা। ফলে আগামীতে বোরো আবাদে কৃষকের আগ্রহ ধরে রাখাই দুরুহ হয়ে পড়তে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
তবে বিশ^ব্যাপী জ¦ালানী সংকটের মধ্যেও দেশে ফসলের মাঠে এবার ৫১ লাখ হেক্টরেরও বেশী জমিতে আবাদকৃত বোরো ধান থেকে সোয়া ২ কোটি টনেরও বেশী চাল ঘরে তুলবেন কৃষিযোদ্ধারা। তবে বোরো ধানে সেচ নির্বিঘœ রাখতে দৈনিক গড়ে ৫০ লাখ লিটার ডিজেলের নিবিচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত রাখার কোন বিকল্প নেই।
ইতোমধ্যে হাওড় সহ কিছু এলাকায় বোরো ধান কর্তন শুরু হলেও দেশের অন্তত অর্ধেক এলাকায় পুরো এপ্রিলজুড়েই সেচ কার্যক্রম পুরো মাত্রায় অব্যাহত রাখতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে আবাদকৃত ৫১ লাখ হেক্টরের মধ্যে ১৯ এপিল পর্যন্ত ৪০ হাজার হেক্টরের বোরো ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। যা মোট আবাদের দশমিক ৮০ ভাগেরও কম।
