দুটি প্রকাশনীর হাতে জিম্মি বরিশালের সব স্কুল দুটি প্রকাশনীর হাতে জিম্মি বরিশালের সব স্কুল - ajkerparibartan.com
দুটি প্রকাশনীর হাতে জিম্মি বরিশালের সব স্কুল

4:07 pm , April 19, 2026

বিশেষ প্রতিবেদক ॥
প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট দুটি প্রকাশনী সংস্থার বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে বরিশালে। এজন্য শিক্ষককে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে দুটি প্রকাশনী সংস্থা বা পাবলিশার্স। শিক্ষার্থীদের পড়াতে এদের বই কেনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। না কিনলে ফেল করিয়ে দেয়ার হুমকি। এদের একটি প্রকাশনী সংস্থা থেকে আবার প্রয়োজনীয় একটি বই বিক্রি হয়না। চারটি বইয়ের সেট সাজিয়ে তৈরি দুটি বই একসাথে কিনতে হবে। আলাদা বিক্রি নিষিদ্ধ বলে দাবী বই বিক্রেতাদের।  আর এ রীতি চালু করতে প্রকাশনী সংস্থা দুটি রীতিমতো ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মতো মার্কেটিং সিস্টেম চালু করেছে। ঔষধ কোম্পানি যেভাবে ডাক্তারদের বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে প্রেসক্রিপশন লেখায় ঠিক একইভাবে শিক্ষকদের দিয়ে  বইয়ের প্রেসক্রিপশন লেখায় ওরা। ফলে শিক্ষার্থী ও অবিভাবকদের গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা।
সরেজমিন বরিশালের বই বিক্রির দোকানগুলো ঘুরে জানা গেছে, তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে পাঞ্জেরী ও লেকচার  পাবলিশার্স এর গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ বই। আর এই বইগুলোর ক্রেতা উদয়ন, অক্সফোর্ড মিশন, ব্যাপ্টিস্ট মিশন, হালিমা খাতুন, শের ই বাংলা স্কুলসহ পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠির বিভিন্ন বইয়ের দোকান মালিকরা। তবে বরিশালে সবচেয়ে বেশি ক্রেতা হচ্ছে নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উদয়ন, অক্সফোর্ড মিশন, কালেক্টরেট, বিএম স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, এ ছাড়াও বরিশাল বিভাগের প্রায় কয়েক শ  হাইস্কুলে এই দুটি প্রকাশনী সংস্থার রাজত্ব চলছে। আর এজন্য বিশপ, ফাদার, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক নেতাসহ সাধারণ শিক্ষকদের বড় একটা অংশকে উপঢৌকন দিয়ে কিনে নিয়েছে প্রকাশনী সংস্থা পাঞ্জেরি ও লেকচার পাবলিশার্স।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উল্লেখযোগ্য একটি পাঠ্যবই বিক্রি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জানিয়েছেন,  তার শিক্ষক বন্ধু তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এককালীন ১০ লাখ পর্যন্ত টাকা ঐ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ফা-ে জমা দেয়া হয়েছে। যা ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। আবার কোথাও কোথাও চার্চের ফাদার বা বিশপ এই টাকা পেয়ে পাঠ্যবইয়ের তালিকায় পাঞ্জেরি ও লেকচার পাবলিশার্স এর বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ কেনা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে।
বরিশালের বই বাজারের বেশিরভাগ বিক্রেতা স্বীকার করেন, তাদের কাছে লেকচার ও পাঞ্জেরি পাবলিশার্স এর বই কিনতে রীতিমতো ভিড় হয়। তবে লেকচার এর বই সেট কিনতে হবে, এটাই কোম্পানির নির্দেশনা রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।
তবে বেশিরভাগ অবিভাবকের দাবী, এটা অন্যায়। এই পাবলিশার্স এর বইয়ের দাম অন্যান্য পাবলিশার্স থেকে বেশি। তাছাড়া আমরা গাইড নির্ভর কেন হবো, তাহলে শিক্ষকরা আছেন কেন। তাদের এতো এতো বাধ্যতামূলক কোচিং করানোর পরও আমাদের ছেলেমেয়ে কেন গাইডনির্ভর হবে বলে প্রশ্ন তোলেন একাধিক বাবা-মা।
যদিও কোচিং বাধ্যতামূলক স্বীকার করলেও গাইড বা ব্যাকরণ নিয়ে কোনো কথা বলতে নারাজ বেশিরভাগ শিক্ষক। উদয়ন ও অক্সফোর্ড মিশন এর দুজন শিক্ষক জানালেন, তারা শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে ভালো গ্রামার বই কেনার পরামর্শ দেন। শিক্ষার্থীরা বইয়ের দোকান থেকে যেটি ভালো সেটি কিনে আনছে। এতে তাদের কোনো দায় নেই বলে জানান এই শিক্ষকরা।
অন্যদিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও তাদের অবিভাবকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উদয়ন স্কুল ও অক্সফোর্ড মিশন  থেকে লেকচার এবং ব্যাপ্টিস্ট মিশন থেকে  অক্ষর প্রকাশনীর গ্রামার বই রেফার করা হয়েছে।
আবার বরিশাল নগরীর বেশিরভাগ বইয়ের দোকানের বিক্রেতারা বলছেন, তাদের কাছে পাঞ্জেরী ও লেকচার পাবলিশার্স এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এদের বইয়ের মানও অনেক ভালো।
এ বিষয়ে বরিশালের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উদয়ন স্কুলের  সহকারী প্রধান শিক্ষক প্রমোদ থিওফেল রোজারিও বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা পাবলিশার্স এর গাইড বা ব্যাকরণ বই কিনতে বাধ্য করা হয়না। বাজারে যেটি ভালো সেটিই শিক্ষার্থীরা খুঁজে নেয় বলে জানান তিনি।
এদিকে পাঞ্জেরি পাবলিশার্স এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য তালাত মাহমুদ বলেন, সারাদেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন প্রতিনিধি ছাড়াও উপজেলা পর্যায় তাদের বিক্রয় প্রতিনিধি রয়েছে। তাদের প্রকাশনার মান ভালো হওয়ার কারণেই শিক্ষার্থীদের মাঝে তাদের বইয়ের চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি।
আবার একসাথে বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ সেট তৈরি করে বিক্রির কোনো নিয়ম করেনি বলে দাবী লেকচার পাবলিশার্স কর্তৃপক্ষের। তাদের দাবী, এটা খুচরা বিক্রেতার বিক্রি কৌশল হতে পারে, আমাদের থেকে এমন কোনো কিছু করা হয়নি।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT