3:00 pm , May 4, 2025
ড্রেন থেকে উঠে আসছে ময়লার স্তূপ, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন আর বালু
আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ নগরীর ব্রাউনকম্পাউন্ড সড়কে এই মুহূর্তে চলছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এর নর্দমা পরিচ্ছন্ন করা ও ড্রেনগুলোর জলস্রোত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। ছোট ড্রেজার দিয়ে নর্দমা পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং যেখানেই ড্রেজার চালানো হচ্ছে সেখানেই উঠে আসছে ময়লার স্তুপ। প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন আর বালু। বিসিসির পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইউসুফ ছুটছেন ড্রেজারের সাথে সাথে। তবে ড্রেজারের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফুটপাতের সড়ক ও ফুটপাতে বসানো ড্রেনের স্লাব। যদিও স্লাবগুলো সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা শাবল ও লোহার সরঞ্জাম ব্যবহার করে আগেই আলগা করে দিচ্ছেন। তবে অনেক স্লাব দীর্ঘদিন খোলা হয়নি, ফলে এগুলো খুলতেই ড্রেজারের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে বলে জানালেন পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইউসুফ। তিনি বলেন, ফুটপাতের নিচে নর্দমা পরিচ্ছন্ন রেখে জলস্রোত পুনরুদ্ধারের কঠিন নির্দেশ দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছার। তিনি এই নগরীতে কোনোরকম জলাবদ্ধতা দেখতে চাননা বলে আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ফুটপাত দখল করে অনেক স্থানে দোকানপাট যেমন রয়েছে তেমনি কোথাও কোথাও ঘরবাড়িও রয়েছে। এগুলোর কারণে কাজে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে।
ইতিপূর্বে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ অভিযানে রাজনৈতিক দলগুলোর বাধা সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করেছে নগরবাসী। নর্দমা বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিচ্ছন্ন অভিযানে নেমে এসব অবৈধ স্থাপনা নিয়ে তাই বিব্রত সিটি করপোরেশন প্রশাসন।
সরেজমিনে ৪ মে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৬ নং ওয়ার্ড ব্রাউনকম্পাউন্ড মসজিদ থেকে জিলাস্কুল সংলগ্ন দেয়াল ঘেঁষে এই পরিচ্ছন্ন অভিযান চলতে দেখা গেছে। এখানে জিলাস্কুল সংলগ্ন দেয়াল ঘেঁষে ফুটপাতের উপরই রীতিমতো বাড়িঘর ও গুদাম তৈরি হয়েছে। সেখানে আবার সিটি করপোরেশনেরই অবৈধ পানি সংযোগ দেয়া হয়েছে ড্রেনের ভিতর দিয়ে। ফলে পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাতে গিয়ে পানির পাইপলাইন ভেঙে সরু সড়কটির বেহালদশা হয়েছে। স্লাব সরিয়ে এখানে ঠিকমতো পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি এই বাড়িঘর ও গুদাম ঘরের কারণে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এখানে আগে চমৎকার স্রোতাবহ একটি খাল ছিলো। যেটাকে ভাটার খালই বলা হতো। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ এই খাল বন্ধ করে জর্ডন রোড থেকে সদর রোড সংযোগ তৈরি করেন। তবে পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধরে রাখতে খালটিকে নর্দমায় পরিণত করে জিলাস্কুল সংলগ্ন নর্দমা স্লাব বসিয়ে দেন। এতে এই সরু সড়কটিও তৈরি হয়। যা পরবর্তীতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াত সুবিধার জন্য সড়ক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এর সময় এই পুরাতন ভাটার খাল নর্দমার পাশে ছাপরা ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী। এরপর সে রীতিমতো সেখানে দালান নির্মাণ করে এখন ভাড়াও দিচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নারাজ পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইউসুফও। এদিকে নগরীর জেলখানা মোড় থেকে নাজিরের পুল পর্যন্ত সড়কের পাশের অবৈধ দোকানপাটের সংখ্যা আরো বেড়েছে। ফুটপাত দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা সিটি করপোরেশনের টং দালানটিকেই এজন্য দায়ী করলেন নাজির মহল্লার বাসিন্দারা। তারা বলেন, যেকোনো মুহূর্তে এই টং দালান ভেঙে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ নিয়ে ইতিপূর্বেই বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছার বলেছেন, ওটি ভেঙে দিয়ে সড়কের একপাশে ময়লার ডাম্পিংঘর বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)তৈরি করে দিতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপতো দূরের কথা সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি টং দালানটিও ভাঙা হয়নি।
এদিকে নগরীর ১৩ নং ওয়ার্ডে মহাসড়কের পাশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ময়লা আবর্জনা জড়ো করা হয়। যা রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর। খান সড়ক বাড়ি মালিক সমিতির সভাপতি সোহরাব হোসেন বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই এই ময়লা আবর্জনা মহাসড়কে ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া এখানে খান সড়কের পিছন অংশে খাল পার সংলগ্ন বাড়িঘরগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থায় সিটি করপোরেশনের নজরদারি নেই। ফলে এরা পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা পর্যন্ত উম্মুক্ত মাটির লাইন কেটে তৈরি করে ড্রেনে ছেড়ে দিয়েছে। যা সরাসরি সাগরদি খালের ভিতর পড়ছে এবং বৃষ্টিতে আশেপাশের পরিবেশ নষ্ট করছে।
বাসিন্দারা এখানে মহাসড়কের পাশে একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) তৈরি করা এবং খান সড়কের ভিতরের বাড়ি ঘরগুলোতে নজরদারির দাবী জানান।
একই দাবী ৯ নং ওয়ার্ড পদ্মাবতী, চকবাজার, হাটখোলা এলাকার বাসিন্দাদের। পোর্ট রোড বাজার ও হাটখোলা বাজারের মাঝামাঝি একটি ডাম্পিংঘর তৈরীর দাবী ব্যবসায়ীদের।
এদিকে নগরীর নবগ্রাম রোডের সড়কের পাশে ফুটপাতে চমৎকার ও প্রশংসনীয় পরিচ্ছন্ন অভিযান চালানো হয়েছে দাবী করে করিম কুটির এলাকার বাসিন্দারা বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বলেন, গত ১৫- ২০ বছর পর এবারের বৈশাখেই প্রথম প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার পরও নবগ্রাম রোডে কোনো জলাবদ্ধতা তৈরি হয়নি। এটা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছার এর অবদান। এসময় ঢাকনাহীন ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি ড্রেন বা নর্দমার মুখ দেখিয়ে বাসিন্দারা ম্যানহোলগুলোর জন্য দ্রুত ঢাকনার ব্যবস্থা করার দাবী জানান। বটতলা থেকে চৌমাথা বাজার পর্যন্ত সড়কের দুপাশে ফুটপাতের উপর প্রায় অর্ধশত ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। মুনসুর কোয়ার্টার এর বাসিন্দারা বলেন, ঢাকনা ছিলো। বছর দুয়েক আগে লোহার ঢাকনাগুলো কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। সেই থেকে এভাবে অরক্ষিত অবস্থা। অনেকেই পথ চলতে গিয়ে ঢাকনাহীন নর্দমায় পড়ে আহত হয়েছেন।
এসব বিষয়ে উচ্ছেদ কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, ম্যানহোলের ঢাকনার বিষয়টি ইউসুফ ভাই দেখেন। তিনি এই মুহূর্তে ব্রাউনকম্পাউন্ড এলাকায় পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাচ্ছেন। পরিচ্ছন্ন কাজে বাধা সৃষ্টি হয় এমন কোনো স্থাপনা বা বাড়িঘর থাকলে তা অবশ্যই সরিয়ে দেওয়া হবে। তবে আমাকে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কেউ কিছু বলেননি। ব্রাউনকম্পাউন্ডের ঐ সরুগলি বা নর্দমার পথটি একটু পরেই পরিদর্শনে যাবো।
স্বপন আরো বলেন, কিছুক্ষণ আগে সিটি করপোরেশনের সিইও জেলখানা মোড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের লিখিত আদেশ দিয়েছেন। আজই এগুলো উচ্ছেদ করতে পারবো।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সিইও রেজাউল বারী বলেন, জেলখানা মোড় থেকে নাজিরের পুল পর্যন্ত সড়কের দুপাশে আজই পরিচ্ছন্ন ও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলতে বলা হয়েছে ফুটপাতে নির্মিত সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ ঘরটিও। তবে কিছু দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে বরিশালের নাগরিক, রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতাধীন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করে সেখানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
