4:02 pm , April 9, 2025
ইলিশ সংস্কৃতি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নয়
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ পান্তা ইলিশ নয়, পহেলা বৈশাখ উদযাপনে মরিচ পোড়া আর ডিমভাজা আমাদের ঐতিহ্য হওয়া উচিত। তবে এগুলো নয় হালখাতা হচ্ছে বৈশাখী উৎসবের প্রধান আকর্ষণ বলে জানালেন বরিশালের সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, এই ইলিশ সংস্কৃতি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নয়। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ হলেও গ্রামবাংলার বেশিরভাগ দরিদ্র কৃষকের ঘরে মানুষের সকালের খাবার হয় শুকনা লাল মরিচ পুড়ে বা ভেজে পিঁয়াজ দিয়ে মেখে পান্তা ভাত খাওয়া। সাথে হাস বা মুরগীর ডিম ভাজার স্বাদই আলাদা বলে জানালেন বরিশাল অঞ্চলের একাধিক বিভিন্ন শ্রেনীপেশার মানুষ। তবে এসব কিছুর উর্ধ্বে ছিলো হাটবাজারে ব্যাবসায়ীদের বাকী টাকা তোলার জন্য হালখাতা খোলার উৎসব। হরেকরকম মিষ্টিমুখ করিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিগত বছরের পাওনা টাকা উত্তোলন ছিলো এই হালখাতা। বরিশালের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, এটি যেহেতু সম্রাট আকবরের সময়ে শুরু হয়েছে, তাই এটিকে মুসলিম সংস্কৃতির অংশ বলা যায়। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু মুসলমান, সে-ই হিসাবে এটিতে মুসলিম সংস্কৃতি প্রাধান্য থাকা উচিত ছিলো, তা কিন্তু হয়নি। আমাদের ছোটবেলায় এই পান্তা ইলিশ বা শোভাযাত্রা, এসব ছিলো না। উৎসব আমেজ ছিলো, মেলা হতো, হালখাতা হতো। জারী-সারী, কবির গান, যাত্রাপালার আয়োজন হতো। তবে কোথাও ইসলামিক ভাবগাম্ভীর্য ছিলোনা। লোকজ উৎসব গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। নৌকাবাইচ, হাডুডু খেলার প্রতিযোগিতা এসব ছিলো পহেলা বৈশাখের আকর্ষণ।
বরিশালের প্রবীণ সাংবাদিক ও সাবেক নারী নেত্রী শাহ সাজেদা বলেন, আমাদের সময় এসব মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিলোনা। পান্তা ইলিশ, ডিমভাজা এসবেরতো প্রশ্নই আসেনা। তবে গ্রামগঞ্জের দোকানপাটে হালখাতা উৎসব হতো। হিন্দু বারোয়ারী দোকানগুলোতে বাহারি মিষ্টির আয়োজন থাকতো, মুসলিম ব্যবসায়ীরা মিলাদ পড়াতেন, মিষ্টি বিতরণ করতেন। আমার ছোটবেলায় এই হালখাতা খোলার উৎসব দেখতে দাদার হাত ধরে বিভিন্ন ব্যাবসায়ী দোকানে গিয়েছি। দইচিড়া, ঘোলমুড়িসহ বিভিন্ন রকমের মিষ্টি খেয়েছি। তখনকার পহেলা বৈশাখ উদযাপনের দিনগুলো মনে হলে প্রথমেই মনে পড়ে মা-খালা ফুপুদের ঘরবাড়ি ঝাড়পোঁছ এর এক কঠিন পরিচ্ছন্ন অভিযান। প্রতিটি ঘরের কোনাকাঞ্চিতে ধোয়ামোছা হতো। নতুন কাপড়, পিঠা পায়েস তৈরি হতো প্রায় প্রতিটি ঘরে। তখনকার দিনে অনেক বয়স্করা বলতেন, বছরের প্রথমদিনে ভালোমন্দ খাওয়া ও নতুন পোষাক পরলে, সারাবছর ভালো খাওয়া ও থাকা যায় । তাই যে কিছু কিনতে পারতোনা, সেও একটি গামছা কিনতো। ঐসময় তরকী বন্দরে একটা মেলা হতো, চাঁদশী মেলা। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়াও ঐ মেলায় শিশু কিশোরদের জন্য চরকী, কাঠের বা মাটির তৈরি খেলনাসহ বিভিন্ন আয়োজন থাকতো বলে জানান শাহ সাজেদা।
প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুকুল দাস বলেন, আমাদের সময়ের সাথে এখনকার বিস্তর ফারাক। তখনকার সময়ে প্রতিটি ব্যবসায়ী তার দোকানে হালখাতা উৎসব করতেন। এক এক দোকানে এক এক রকমের মিষ্টি রাখা হতো। আমরা ঘুরে ঘুরে প্রায় সব দোকানে যেতাম আর মিষ্টি খেতাম। মিষ্টি খেতে যেয়ে দৌড়ানিও খেয়েছি। কারণ, পাওনাদারতো আমরা ছিলাম না। হালখাতা খোলার ইতিহাসই হচ্ছে পাওনাদার থেকে টাকা আদায়ের একটা কৌশল। সম্রাট আকবর এই কৌশলে প্রজার কাছ থেকে কম বেশি খাজনা আদায় করতেন। প্রজারা যে যতটুকু পারতো খাজনা দিয়ে মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরে যেত। রাজাও খুশি, প্রজাও খুশি। সেই হালখাতা কোথায় হারিয়ে গেছে? এই হালখাতা না থাকলে বৈশাখী উৎসবের কোনো গুরুত্ব নেই বলে মুকুল দাস।
বরিশালের বিশিষ্টজনের সাথে কথা বলে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, পান্তা ইলিশ নয়, মরিচ পোড়া ও ডিমভাজা গ্রামবাংলার মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খাবার। তারপরও এসব খাবার কখনোই ঐতিহ্য হতে পারে না। পান্তা ইলিশ মূলত ঢাকার রমনার বটমূলের ছায়ানট ও উদীচী সংস্কৃতির বাবুয়ানা আবিষ্কার। তারা এটি এলিট শ্রেণীর জন্য কলকাতা থেকে ধার করে এনেছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ জনেরা।
ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ্, যিনি স্বাধীন বাংলার সুলতান ছিলেন ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯, তিনি বাংলা ‘সন’ চালু করেন। সর্বশেষ সম্রাট আকবরের শাসনামলে পহেলা বৈশাখে হালখাতা উৎসব নামে খাজনা আদায় করেছিলেন। শেষপর্যন্ত ধোপে টিকেছে সম্রাট আকবর তত্ত্বটি। সম্রাট আকবর তত্ত্বটি সম্পর্কে ১৯৫৪ সালে ভারতে পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা অঙ্ক কষে ফর্মুলা তৈরি করে প্রমাণ করেছেন আকবরই হচ্ছে বাংলা সনের প্রবর্তক এবং তার সপক্ষে মন্তব্য দিয়েছেন ওড়িশার প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ কাশীপ্রসাদ জয়াসওয়াল এবং সর্বশেষ ড. অমর্ত্য সেন। তারা মনে করেন আকবরই এ বাংলা সনের প্রবর্তন করেছেন এবং পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রেওয়াজ চালুর পিছনে তার খাজনা আদায় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
সেই সময়ে সম্রাট আকবর লক্ষ করলেন, বাংলাদেশে যারা চাষি তারা ‘সৌর বছর’ অনুসরণ করে ফসল বুনে এবং ফসল তোলে, কিন্তু আকবরের সময় প্রচলিত ছিল হিজরি সন, চান্দ্র সন। এতে ফসলের খাজনা আদায়ে সমস্যা হতো, সেজন্য আকবর তার নবরতেœর অন্যতম রতœ আমির ফতেউল্লাহ্ সিরাজীকে অনুরোধ করেছিলেন, এর একটি সমাধান বের করতে। তার কারণ হলো, আমির ফতেউল্লাহ্ সিরাজী ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আকবরের দরবারের ৯ জনই ছিল জ্ঞানে-পা-িত্যে রতœ। তিনি হিসাব করে বের করলেন যে আকবর ১৫৫৬ সালে সিংহাসনে এসেছিলেন আর ওই বছরটি ছিল হিজরি সন ৯৬৩। তিনি ৯৬৩ সনকেই বাংলা প্রথম সন করে ফেললেন। আকবরের রাজত্বকালের ২৯তম বর্ষে ১৫৮৫ সালে এটি জারি করা হলো; কিন্তু এর কার্যকারিতা নির্ধারণ করা হলো ১৫৫৬ থেকেই। আকবর এটাকে ‘ফসলি সন’ নাম দিলেন। তিনি রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য এ সন চালু করেছিলেন। কিন্তু আমরা জানি যে সারা পৃথিবীতে প্রায় সব সম্প্রদায় তাদের বছরের প্রথম দিন উদযাপন করেন, সেই সুবাদে আমাদের মধ্যেও পহেলা বৈশাখ উদযাপন এসে গেল। বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন সম্পর্কে যে ইতিহাস আছে তাতে দেখা যায়, মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সময় থেকেই এ উদযাপনটি শুরু হয়েছিল। তবে বাংলাদেশে উদযাপন শুরু হয় সেই সময়ের পাকিস্তান আমল থেকে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রসংগীতকে জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে ছায়ানট ১৯৬৪ থেকে বলদা গার্ডেনে প্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। কিন্তু প্রতিবছর জনসমাগম বাড়তে থাকে বলে বলদা গার্ডেনে আর স্থান সংকুলান হয় না। ১৯৬৭ থেকে রমনার বটমূলে বৃহত্তর পরিসরে বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। যদিও বলা হয়, বটমূল; কিন্তু ওটা অশ্বথ গাছ; লোকমুখে শুনতে শুনতে প্রচলিত হয়ে গেছে বটমূল। বিত্তবানরা আশির দশকের সূচনায় পান্তাভাত আর ইলিশ মাছ খাওয়া শুরু করেন। এটাকে আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা পান্তাভাত খেয়ে সকালে কাজে যান, তাদের সঙ্গে মশকরা করা হয় বলে মনে করেন অনেক বিশিষ্টজন। কেননা, দরিদ্র শ্রেনীর বেশিরভাগ মানুষ পান্তাভাত খান কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে, এটি স্বাস্থ্যকর খাবারও। কিন্তু পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ চলে না, এটি অস্বাস্থ্যকর খাবার। তারপরও দরিদ্রদের সাথে নিজেদের পার্থক্য প্রমাণ করতেই আমাদের বিত্তবানের কাছে পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে পান্তাভাত ও ইলিশ বলে জানান তারা।
১৯৮৫ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন আরও বড় পরিসরে শুরু হলো। সেখানে দেখা গেল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ যুক্ত করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী। সবাই মিলে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ বানিয়ে শোভাযাত্রা শুরু করেন। মঙ্গল শোভাযাত্রা যখন শুরু হয়, তখন বাংলাদেশের বাঙালির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা। ৯০ এর গণআন্দোলন থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ক্রমশ বিশৃঙ্খলা হতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী এটিকে কুক্ষিগত করে তাদের ইচ্ছামত শিরোনাম এবং মূর্তি বা প্রতীক ও ফানুস তৈরির মাধ্যমে এটিকে দলীয়করণ করত শুরু করে।
