ঈদের দিন শহীদ পরিবারের পাশে বরিশালের প্রশাসন ঈদের দিন শহীদ পরিবারের পাশে বরিশালের প্রশাসন - ajkerparibartan.com
ঈদের দিন শহীদ পরিবারের পাশে বরিশালের প্রশাসন

2:54 pm , April 5, 2025

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ব্যতিক্রমী ও স্বস্তির ঈদ আনন্দের অনন্য উদাহরণ হয়েছিলো চলতি বছর ২৫ এর ৩১ মার্চ। গণপরিবহন থেকে শুরু করে হাটবাজারে যেমন স্বস্তি ছিলো তেমনি ছিলো প্রশাসনিক আন্তরিকতা। সবচেয়ে ব্যতিক্রম ছিলো ঈদের ছুটিতে বরিশালের প্রশাসনের কর্মকর্তারা ছুটে বেড়িয়েছেন দূর গ্রামে শহীদ পরিবারের ঘরে ঘরে। বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার যখন বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ও চরাদি ইউনিয়নের দু’জন শহীদ পরিবারের হাতে ঈদ উপহার তুলে দিচ্ছেন ঠিক তখন বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন ছুটে গিয়েছেন বাবুগঞ্জ উপজেলার গ্রামে আরেক শহীদ পরিবারের কাছে। বরিশালের প্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তাই শহীদ পরিবারের সাথে সময় কাটিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন ঈদের উপহার।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ইউনিয়নে মোট তিনজন শহীদের কবর রয়েছে। তিনজনই জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহত। তাদের মধ্যে দুজনের বাড়ি একই গ্রামে। গ্রামের নাম সুন্দরকাঠী। তবে এই গ্রামের একজন শহীদ সাজিদ হাওলাদার এর কবর এখানে হলেও তার পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় বসবাস করে। অন্য দু’জন শহীদ আরিফুর রহমান রাসেল এবং কবিরাজ গ্রামের শহীদ ওয়াদুদ। শহীদ রাসেলের বাড়ি থেকে শহীদ ওয়াদুদ এর বাড়ি যেতে এঁটোকাঁদা খানাখন্দের পথে প্রায় পাঁচ -সাত কিলোমিটার দূরত্ব । তবে তিনজন শহীদদেরই সহধর্মিণীসহ নাবালক শিশু সন্তান রয়েছে। যারা এখন পর্যন্ত বাবা ডাকটাও শেখেনি। এর আগেই রয়েছে চরাদি ইউনিয়ন। চরাদি ইউনিয়নের কৃষ্ণকাঠি গ্রামের মো. শাওন সিকদার (২৩)। তিনি ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শাওন। দুধাল গ্রামের মো. আবদুল ওয়াদুদ (৪৫)। তিনি ঢাকায় দর্জির কাজ করতেন। ইডেন মহিলা কলেজ এলাকায় তার মৃত্যু হয়। ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামের আরিফুর রহমান রাসেল (৩০)। তিনি ঢাকায় পপুলার ডায়গনস্টিক সেন্টারে চাকুরি করতেন। ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামের সজিব হাওলাদার (২২) একজন শিক্ষার্থী ছিলেন বলে জানা গেছে। চাচা মতি হাওলাদার তার কবরের দেখাশোনা করেন। এদের মধ্যে রাসেল ছাড়া বাকীরা ১৮ ও ১৯ জুলাই শহীদ হয়েছেন বলে জানান মতি হাওলাদার।
৩১ মার্চ সোমবার ঈদের দিন বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ইউনিয়নে এই দু জন বীর শহিদের পরিবারের বাড়ি পরিদর্শন করেন বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার। তিনি প্রথমেই শহীদ রাসেল এর বাড়িতে যান। কথা বলেন রাসেলের স্ত্রী ও বাবা-মায়ের সাথে।
শহীদ রাসেলের স্ত্রী জানালেন, লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে ঢাকার সাভারে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে নিহত হয়েছে আমার স্বামী। ঐ দিন শিক্ষার্থীরা আহত অবস্থায় ওকে এনাম মেডিকেলে ভর্তি করে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা ফোন করে বিষয়টি জানায় আর বলে রাসেল এর বুকে ও পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমরা দ্রুত ওর কাছে যাই। ৪০ মিনিট পর রাসেল মারা যায়।
এসময় রাসেলের স্ত্রী চিৎকার করে ওঠেন, কান্নারত কণ্ঠে বলেন, এনাম মেডিকেল রাসেলকে সুচিকিৎসা দেয়নি। বিনা চিকিৎসায় ফেলে রেখেছিল। আমরা যাওয়ার পর, টাকার নিশ্চয়তা দেওয়ার পর তারা আইসিইউতে নেয়। এর আগেই যদি তারা সুচিকিৎসার নিশ্চিত করতো তাহলে হয়তো আরো অনেক প্রাণহানি কমে যেত।
মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিজেই ভারাক্রান্ত বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার। তিনি কোনোভাবে শোকাহত পরিবারকে সান্ত¡না প্রদান করেন, বীর শহিদের সন্তানদের খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। তিনি শহিদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ করেন এবং যে কোন পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন তাঁদের সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে বলে শহিদ পরিবারের সদস্যগণকে আশ্বাস প্রদান করেন। বিভাগীয় কমিশনারের সফরসঙ্গী হিসেবে এসময় পাশে ছিলেন স্থানীয় সরকার বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক খন্দকার আনোয়ার হোসেন, বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোমানা আফরোজ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) তন্ময় হালদার।
অন্যদিকে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে শহীদ আবিরের পরিবারের কাছে গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ১৯ জুলাই বিকেলে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে রাজধানীর বারিধারা এলাকায় সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন আবদুল্লাহ আল আবির (২৪)। ২০ জুলাই সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পবিত্র ঈদ উল ফিতর এর দিন দুপুরে বরিশালের জেলা প্রশাসক বরিশাল মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ঈদের উপহার নিয়ে আবিরের গ্রামের বাড়ি বাবুগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্রকাঠিতে উপস্থিত হন। এসময় জেলা প্রশাসক আবিরের বাবা মিজানুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন পরিবারের খোঁজখবর নেন। জেলা প্রশাসক ঈদের উপহারসামগ্রী তুলে দেন আবিরের পরিবারের হাতে। এসময় তার পাশে আরো উপস্থিত ছিলেন উপপরিচালক স্থানীয় সরকার বরিশাল গৌতম বাড়ৈ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বরিশাল লুসিকান্ত হাজং, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রে বরিশাল সুফল চন্দ্র গোলদার, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার বাবুগঞ্জ কামরুন্নাহার তামান্না, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল মহানগর আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শাহেদ, স্বাস্থ্য কমিটির বরিশাল জেলার সদস্য লাবন্য রহমানসহ আরও অনেকে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT