ঈদকে ঘিরে নগরীতে বাড়ছে অবৈধ যানবাহন ঈদকে ঘিরে নগরীতে বাড়ছে অবৈধ যানবাহন - ajkerparibartan.com
ঈদকে ঘিরে নগরীতে বাড়ছে অবৈধ যানবাহন

4:19 pm , March 25, 2024

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ঘড়ির কাটায় তখন বেলা এগারোটা। তীব্র যানজটে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার সদর রোড থেকে ফজলুল হক এভিনিউ, চকবাজার ও একে স্কুল সড়ক। একইসময় নতুন বাজার থেকে নতুল্লাবাদ এবং সাগরদি পুল থেকে রূপাতলী তীব্র যানজট হওয়ার সংবাদ চারিদিকে। গত শনিবার বিকেল পাঁচটার কিছু পরে একটি এম্বুলেন্সকে ঘীরে বাংলাবাজার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এলাকায় অসহনীয় যানজটে রোজদার মানুষের নাভিশ্বাস উঠে। কেউ কেউ মুখখিস্তি করে বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এলাকা থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল গুলো কেন নিরাপদ পরিবেশে সরিয়ে নিচ্ছে না। নগরীর রূপাতলী থেকে সাগরদি বাজার এবং নতুনবাজার থেকে নতুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা এখন স্থায়ী যানজটের এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
রবিবার সকালে কাকলীর মোড়ে দেখা গেলো বড় একটি খালি ট্রাক সরু সড়কের দুপাশই আটকে দিয়েছে। না পারছে নিজে যেতে, না দিচ্ছে অন্য যানবাহন আসতে। শুধু তাই নয়, ট্রাক চালকের পাশে বসা সিটি করপোরেশনের একজন কর্মচারী রীতিমতো ট্রাফিক পুলিশের সাথে তর্ক করছেন। বলছেন ‘ আমাদের পারমিশন আছে, সামনে কি লেখা চোখে পড়েনা? এই পথে সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক শাখা আমানতগঞ্জে যাওয়ার পারমিশন আছে আমাদের। বারবার হাত তুলে ট্রাকের সামনে লাগানো স্টিকার দেখতে বলেন তিনি ।  যদিও পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি সিটি করপোরেশনের কেউ না।
কাকলীর মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের একজন বলেন,  হঠাৎ করে তিনটি ট্রাক এই মোড়ে এসে কোনদিকে যাবে তা বুঝতে না পেরে এই সমস্যা তৈরি করেছে। এরকম অসংখ্য অবৈধ যানবাহন প্রবেশ করছে শহরে। এরা বড় বড় নেতাদের রেফারেন্স দিচ্ছে। ধরলে দু-তিন জন নেতা ফোন করে রীতিমতো চাকুরি নিয়ে টানাটানি করে বাজিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কি আপনারাই বলুন।
এসময় ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক আব্দুর রহিম এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, সকাল থেকে এই মোড়ে তিনজন সার্জেন্ট রয়েছেন। তাদের নিষেধ উপেক্ষা করে ৫ টনি ট্রাক প্রবেশ করায় এই যানজট তৈরি হয়েছে। এখনই পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং সত্যি সত্যি আধাঘন্টা সময়ে পুরোপুরি যানজট মুক্ত হয়ে যায় সদর রোড ও ফজলুল হক এভিনিউ।  কিছুক্ষণ পরে টিআই আব্দুর রহিম বলেন, ঈদ বাজারকে কেন্দ্র করে অসংখ্য  অবৈধ যানবাহন শহরে ঢুকে পড়েছে। আগামী কয়েকদিন যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
শনিবার ঠিক বিকেল ৫টার কিছু পরে ইফতারের আগমুহূর্তে বাংলাবাজার এলাকায় বিশাল যানজট সামলাতে ছুটে এসেছিলেন পরিদর্শক (ট্রাফিক) আব্দুল লতিফ। তিনি রীতিমতো হিমশিম খেয়ে ১৫ মিনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আনেন পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর কারণে সৃষ্ট  যানজট। মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে নিয়ে আসা একটি এম্বুলেন্স সড়কে রেখে ট্রলিতে রোগীকে নামিয়ে নিতে গিয়ে এই দুর্ভোগ এর সৃষ্টি হয়। আরশেদ আলী কন্ট্রাক্টর সড়কের বাসিন্দারা বলেন, প্রতিদিন এই পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর কারণে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কারণ এম্বুলেন্স এসে এভাবে সড়কের উপরেই রোগীকে নামিয়ে দিচ্ছে। কখনো সিএনজি বা অটোচালকের সাথে মারামারি করছে পপুলারের সিকিউরিটি গার্ডের লোকেরা। পুলিশের রাগ-ক্ষোভ সবকিছু ইজিবাইক ও সিএনজি চালকদের উপর বলে জানান তারা।
আর পপুলার সংলগ্ন রিফিউজি কলোনির বাসিন্দারা বলেন, এটি যতটা না ডায়াগনস্টিক সেন্টার, তারচেয়ে বেশী হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বার। এমন একটি বড় প্রতিষ্ঠান শহরের বাইরে নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে হওয়া উচিত।  এলাকাবাসীর দাবী শুধু পপুলার নয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উপর ও কাছাকাছি অবস্থান থেকে সব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সরিয়ে নিলে নগরবাসীর ভোগান্তি অনেকটা কমে যাবে। এই বক্তব্যে সহমত পোষন করেন নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান, শাহ সাজেদা, বরিশাল সাহিত্য সংসদ এর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কেএসএ মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীকসহ আরো অনেকে। নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান বলেন, বৈধ বা অবৈধ কোনো তালিকাইতো আমাদের নেই। ঈদকে সামনে রেখে নগরীতে যানজট আরো বাড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কতটা সহনীয় পর্যায়ে থাকবে তা ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব। আমরা নগরীতে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এক্সিলারেটর ব্রীজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে অপেক্ষায় আছি । মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ নিজেই যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন, তখন আমাদের একটু ধৈর্য্য ধরার বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।
বরিশাল সাহিত্য সংসদের সভাপতি মহিউদ্দিন মানিক বলেন, ১৫ থেকে ২০টি তিন রাস্তার মোড় ও চার-পাঁচটি চৌরাস্তা বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায়। ট্রাফিক সার্জেন্ট না দিতে পারলেও কনস্টেবল নিয়মিত করা খুব কঠিন নয়। তবে যত যা ই বলি পরিকল্পিত নগরায়ন ঘটাতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকার পরিধি বাড়াতে হবে। তা না হলে এই সংকট কাটবে না। সবচেয়ে জরুরী বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা।
পরিবেশ আন্দোলনের নেতা কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, নগরীর ৩৫/৪০টি পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের কার্যক্রম থাকার কথা। সেখানে হাতেগোনা চার/পাঁচটি পয়েন্টে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে ট্রাফিক বিভাগেরও ডিজিটাল হওয়া জরুরী। তারা ড্রোনের মাধ্যমে যানজট প্রবল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তবে তিন ও চার রাস্তার মোড়গুলোতে স্থায়ী ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রণ জোন তৈরি জরুরী। বিশেষ করে আমতলার মোড়, চৌমাথা, বটতলা ও চকবাজারের ফলপট্টি ও নতুন বাজার।
নগরীর ৩১/৩২ টি পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ থাকা জরুরী স্বীকার করে ট্রাফিক সার্জেন্ট শাহিন বলেন, কনস্টেবলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও মোড়গুলোতে একজন ট্রাফিক কনস্টেবল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন। কম হলেও তিনজন প্রয়োজন। বরিশালে রয়েছে মাত্র ৭৯জন কনস্টেবল। ৩৬টি পদ এখনো শূন্য আছে। একই দশা ট্রাফিক সার্জেন্টদেরও।  ৩৭ জনের কাজ করছি আমরা সবমিলিয়ে ২৭ জন সার্জেন্ট।
উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিন প্রতি শিফটে (৮ঘন্টা) ৩৫/৩৬ জন কনস্টেবল কাজ করছেন। ১১ জন মাত্র সার্জেন্ট কতদিক সামলাতে পারে আপনারাই বলুন। তবুও নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী, লুকাস পয়েন্টে তিন থেকে চারজন করে কনস্টেবল ও দুজন করে সার্জেন্ট রাখতে হচ্ছে। টিআইদের এতটুকু শান্তি নেই। সারাক্ষণ টহলের উপর থাকতে হয় তাদের। এরউপর ডিসি অফিস ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে ১ জন করে চলে গেলে থাকে কতজন? এতো অল্প লোকবল নিয়ে ৩২টি পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন। আমতলার মোড়ে একজন সার্জেন্ট নিয়মিত থাকেন উল্লেখ করে ট্রাফিক বিভাগের এই কর্মকর্তা বলেন, শুধু কনস্টেবল রেখে লাভ নেই, কারণ সেতো মামলা দিতে পারেন না। আমাদের লোকবল সংকটের কারণে সব পয়েন্টে ট্রাফিক কনস্টেবল রাখা আসলে সম্ভবও হচ্ছেনা। এদিকে নগরীতে ইজিবাইক ও অটোরিকশা যে হারে বাড়ছে তাও বিপদজনক,। আবার পদ্মা সেতুর সুফল ভোগ করতে ও ঈদকে কেন্দ্র করে বহিরাগত গাড়ির চাপও বেড়েছে বরিশালে। সড়কের পরিধি বৃদ্ধি, ভবনগুলোতে গাড়ি পার্কিং এগুলো সিটি করপোরেশনের কাজ। আমরা যানজট ও দুর্ঘটনা নিরসনের জন্য বেশকিছু প্রস্তাবনা তাদের দিয়েছি। নগরীর যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা আগে প্রয়োজন বলে জানান তানভীর আরাফাত।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT