2:37 pm , March 29, 2025
ঈদে সেবা দেবেন ৩৯৫ জন ডাক্তার ও নার্স
আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ মাঠের ভিতর এখন আর ময়লা আবর্জনা নেই, নেই ভাসমান দোকান। সেখানে এখন সারি সারি এ্যাম্বুলেন্স লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এই এ্যাম্বুলেন্সগুলো হাসপাতালের সামনে রীতিমতো জঞ্জাল ছিলো বিগত সময়গুলোতে। হাসপাতালের দেয়ালের ভিতর এখন আর কোনো হকারদের দৌরাত্ম নেই। দীর্ঘ সময় প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালও চোখে পড়েনি। মেডিসিন বিভাগের রোগীর স্বজনদের জন্য পরীক্ষামূলক দর্শনার্থী কার্ড সিস্টেম চালু করা হয়েছে। দর্শনার্থী কার্ড ব্যবস্থার নিয়মে বলা হয়েছে- দর্শনার্থী কার্ড ব্যতীত হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ নিষেধ, ১০০ টাকা দিয়ে কার্ড সংগ্রহ করুন, দর্শন শেষ করে কার্ড জমা দিয়ে ১০০ টাকা ফেরত নিন। একজন রোগীর জন্য সর্বোচ্চ দুইটি কার্ড সংগ্রহ করা যাবে। কার্ডের মেয়াদ ৭দিন। মেয়াদোত্তীর্ণ কার্ড ব্যবহার করলে ১০০টাকা জরিমানা আদায় করা হবে।
এতে করে হাসপাতালে দর্শনার্থীদের চাপ কমেছে বলে মনে করেন অনেক চিকিৎসক। এদিকে হাসপাতালের ভিতর চোরের উপদ্রব বেড়েছে। প্রতিদিনই চুরি যাচ্ছে মোবাইল, টাকা। তবে হাসপাতালের ভিতরের দেয়ালে এখন আর পানের পিক, কফ ইত্যাদি চোখে পড়ে না। নেই অন্ধকারাচ্ছন্ন আবহাওয়াও। টয়লেটগুলো সংষ্কার হয়েছে তবে পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি স্পষ্ট। তারপরও সবমিলিয়ে বলা যায়, বদলে গেছে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শেবাচিম এর চারপাশের পরিবেশ। সরেজমিনে ২৯ মার্চ এ চিত্র দেখা গেছে শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিতর ও বাইরে। জানা গেছে, আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটিতেও দক্ষিণাঞ্চলের রোগী ও স্বজনদের সেবা দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে শেবাচিম। আর এজন্য সুচিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩৯৫ জন চিকিৎসক, নার্স ও নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করবে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ কাজে যোগদানের পরপরই সাংবাদিকদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতির প্রাথমিক শর্ত পূরণ করেছেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনির। তবে চিকিৎসক সংকট এবং হাসপাতালের অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ক্যান্সার চিকিৎসার উপকরণ, রেডিওথেরাপি, গাইনকোলজির গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন সেটআপ, বায়োপসি পরীক্ষা, সিটিস্ক্যান ইত্যাদি বড় বড় পরীক্ষা সরঞ্জামে কোনো বন্দোবস্ত এখনো হয়নি বলে জানা গেছে। আর এ সমস্যাগুলো শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ৫৭ বছরের সমস্যা।
১৯৬৮ সালে ৫০০ শয্যা এবং প্রায় ১০০ জন চিকিৎসক নিয়ে বরিশাল শের-ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর ৫৭ বছরে ৫০০ শয্যা থেকে ১০০০ শয্যা এবং করোনাকালীন সংকটে আরও ১০০টি শয্যা বৃদ্ধি হয়েছে শুধু। চিকিৎসা সেবার উপকরণ, ভবনের উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কিছুই বাড়েনি। ৫৭ বছরে এ পর্যন্ত ৬৭ জন পরিচালক বদল হয়েছে এ হাসপাতালে। বেশিরভাগ পরিচালক দায়সারা দায়িত্ব পালন করেছেন। এরকম অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিচালক পদে সেনা কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি ছিলো বরিশালের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মেডিকেল শিক্ষার্থী ও বিশিষ্টজনদের। জনগণের এই দাবীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বরিশালের জন্য ৬৮তম পরিচালক হিসেবে সেনাবাহিনী থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীরকে নিয়োগ দিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বরিশালের সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, মেডিকেল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় সভা করেছেন মশিউল মুনীর। এ সময় তিনি শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমস্যা, পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসক সংকট, নষ্ট যন্ত্রপাতি, এক্সরে মেশিন, ডায়ালাইসিস, রেডিওথেরাপি ইত্যাদির প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্বারোপ করে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেন। যার ফলশ্রুতিতে হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে আর হাসপাতাল এলাকায় দেখা যায়না। এ্যাম্বুলেন্স চালক ও তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সাথে বৈঠক করে হাসপাতালের পরিবেশ সৌন্দর্য রক্ষায় ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর। হাসপাতালের সামনের ওষুধের দোকানগুলোতে সঠিক দাম রাখা এবং রোগীদের যাতে হয়রানি হতে না হয় সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি রয়েছে বলে জানালেন সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামান শাহিন। তিনি বলেন, শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষ এখন অনেক সহযোগিতামূলক আচরণ করছেন। আমাদের সাধারণ চিকিৎসক কিছু বেড়েছে তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণ, ইত্যাদি এখনো আগের মতোই রয়েছে বলে জানান তিনি।
১১শ বেডের হাসপাতাল হিসেবে শেবাচিমে এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ চিকিৎসকদের পদ শূন্য। প্রতিদিন গড়ে এ হাসপাতালে প্রায় তিন হাজার রোগী ভর্তি হন। রোগীর বিপরীতে বর্তমান চিকিৎসক সংখ্যা পর্যাপ্ত নয় স্বীকার করেছেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর নিজেও। তিনি বলেন, চিকিৎসক সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাবে। কেননা এ বিষয়টি জানেন স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
তবে সাধারণ চিকিৎসক, রোগীর স্বজন এবং বরিশালের সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি ইতিপূর্বে উম্মুক্ত আলোচনায় ঢাকা ও বরিশালের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দাপটে শেবাচিমে ভালো চিকিৎসক আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ হয়েছে। ডাক্তারদের সিন্ডিকেট বরিশালের রোগীদের ঢাকামুখী দৌড়ঝাঁপে বাধ্য করারও একাধিক অভিযোগ জমা রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর বাইরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সংকট নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আছে। চিকিৎসা বিভাগের ছাত্র সমন্বয়কদের দ্বারা আউটসোর্সিং নিয়োগ স্থগিত করে আপাতত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ চেষ্টার অনিয়ম অভিযোগ এখনো রয়েছে। নার্সিং কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫শ’ শয্যার জন্য ৮০৬ জন থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ৭৬৯ জন। ১ হাজার শয্যার হিসাব করতে গেলে নার্সিং কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৮৪৩টি পদ শূন্য। অপরদিকে হাসপাতালে তৃতীয় শ্রেণির পদ ৫শ’ শয্যার জন্য ১২৪ জনের কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ৮২ জন। কাগজে-কলমে ১ হাজার শয্যার এ হাসপাতালে তৃতীয় শ্রেণির পদ শূন্য রয়েছে ১৬৬টি। পাশাপাশি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের হিসাবে ৫শ’ শয্যায় ৪২৬টি পদ থাকলেও রয়েছে ৩০৯ জন, বাকি ১১৭টি পদ শূন্য।
সব মিলিয়ে অবকাঠামোগত দিক দিয়ে ৫শ’ শয্যার এ হাসপাতালে পদ শূন্য রয়েছে ৩২১টি এবং কাগজ-কলমে ১ হাজার শয্যার হিসাবে এ হাসপাতালে পদ খালি রয়েছে ১ হাজার ৯০১টি। বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর বলেন, হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হলেও হাসপাতালে জনবল কাঠামো ৫শ’ শয্যারই রয়ে গেছে। বর্তমানে চিকিৎসক সংকট খুব একটা নেই। গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিভাগেই দায়িত্বশীল চিকিৎসক এসেছেন। এখন সমস্যা হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির লোকবল সংকট জিইয়ে রেখে আউটসোর্সিং এর একটা ধারাবাহিকতা চালু করা হয়েছে যা আদতে কোনো উপকারে আসেনি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী সংকটের মুখে আউটসোর্সিং এর বেশ কয়েকজনকে পরীক্ষা করে দেখেছি এরা এপদে যোগ্য না। আউটসোর্সিং বা স্বেচ্ছাসেবক যেটাই হোক আমরা কিন্তু পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী চাই।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর আরো বলেন, ঈদের ছুটিতে সকলের কাজ রোষ্টার করে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক, স্টাফ, নার্স, নিরাপত্তারক্ষী সহ ৩৯৫ জনের মতো দায়িত্ব পালন করবেন। ৩ মার্চ পর্যন্ত ছুটি চলাকালীন তাদের তিনবেলা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও হাসপাতাল থেকে করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
