বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠনে নাগরিকদের সমন্বয় চায় বিশিষ্টজন বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠনে নাগরিকদের সমন্বয় চায় বিশিষ্টজন - ajkerparibartan.com
বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠনে নাগরিকদের সমন্বয় চায় বিশিষ্টজন

3:03 pm , February 6, 2022

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ গতানুগতিক উন্নয়ন নীতিমালা নয়, বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিটি নিয়ে বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠনের পরামর্শ বরিশালবাসীর। সম্প্রতি বরিশালের নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) আইন ২০২২ এর খসড়া তৈরি হয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারী এ সংক্রান্ত বৈঠক শেষে খসড়াটি জনগণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে। যেখানে ৬৬ টি ধারার অনেকগুলো উপ ধারা যুক্ত হয়েছে। ৫ নং ধারায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হিসেবে যারা থাকবেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানের উপ ধারাগুলোতে বেশিরভাগই সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্ত। যা বরিশালের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দের কাছে অপরিকল্পিত প্রস্তাব বলে মনে হয়েছে। তারা মনে করেন, এজন্য গণশুনানির আয়োজন খুব জরুরী। এ বিষয়ে মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, এতোদিনে বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এটা যেন আর ছয়টি নগরের মতো গতানুগতিক না হয়। এখানে যেন উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত মানুষের অংশীদারিত্ব সমান হয়। অধ্যাপক তপংকর চক্রবর্তী বলেন, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বউক) গঠন খুবই জরুরী। এটা আরো আগেই হওয়া উচিত ছিলো, দেরীতে হলেও এখন হচ্ছে এটা আশার কথা। তবে এতে অবশ্যই মাঠ প্রশাসনের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য হতে হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শাহ শাজেদা বলেন, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। এতে জনগণের চাহিদা পূরণ হতো। পাশাপাশি জনস্বার্থ রক্ষা করে উন্নয়নের যাত্রায় শামিল হতো বরিশাল। বরিশাল সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজগুলো করতে পারত। রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সব বিভাগীয় শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। সেখানে বরিশালে এ জাতীয় কিছু নেই যা সত্যি লজ্জার।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল আলম জাহাঙ্গীর তালুকদার বলেন, বরিশালে এখনো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হয়নি। যদি হতো তবে তাদের নিজস্ব বাজেট থাকত, লোকবল থাকত। পাশাপাশি তাদের আইন প্রয়োগ করারও ক্ষমতা দেওয়া হতো। সেক্ষেত্রে তারা পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারত। প্ল্যান অনুযায়ী গড়ে উঠত নগরীর সব রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মো. ফারুক বলেন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থাকলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারত। দেশের বিভিন্ন সিটিতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। বরিশালে এখনো এটা গড়ে ওঠেনি। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না থাকায় বরিশাল সিটি করপোরেশন নিজস্ব প্ল্যানার দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে খুবই আন্তরিক। তাই সিটি করপোরেশন এর সাথে সমন্বয় করে তাড়াতাড়ি এটা বাস্তবায়ন হবে এটাই আশা করছি আমরা।
স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, একটি বিষয় নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে সেটি ওই বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারে। তখন তারা আলাদা জনবল কাঠামো নিয়ে নিজস্ব গতিতে কাজ করার সুযোগ পায়। পরিকল্পিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তাই বরিশাল নগরীর উন্নয়নে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিকল্প নেই ।
বর্তমান প্রস্তাবিত খসড়াটিতে যোগাযোগ, পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ বাদ পড়েছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নগর উন্নয়নের প্রধান বাহন সিটি করপোরেশন। সেখানে প্রস্তাবনায় সিটি করপোরেশন থেকে মাত্র একজন রাখার প্রস্তাব সঠিক নয় দাবী বলে দাবী সুজন সম্পাদক রফিকুল আলমের।
তিনি বলেন, এতে কাউন্সিলর, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি থাকা আবশ্যক। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বয় করে কমিটি হতে হবে। সবার আগে একটা মাস্টার প্লান চাই। এ জন্য গণশুনানির আয়োজন খুব জরুরী বলে মনে করেন রফিকুল আলম।
বরিশালের উন্নয়ন ভাবনায় নিয়মিত কলাম লেখক ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতা কাজী মিজানুর রহমান ফিরোজ বলেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকার সকল ব্যক্তি মালিকানাধীন জলাশয়, পুকুরের তালিকা করে সে গুলি সংরক্ষনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। মিঠা পানির সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে, দেশীয় প্রজাতির মাছ উতপাদন এবং পরিবেশ রক্ষায় জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, কে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে এবং সেটা দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এ দাবী আমাদের সিটি করপোরেশন গঠনের পর থেকেই। বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শেবাচিম এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিতে নাগরিক কমিটির বিকল্প নেই। ২০০২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং ২০০৬ সালে মেট্রোপলিটান এলাকা প্রতিষ্ঠিত হলেও কোনো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিভাগীয় এই নগরী ক্রমশ অপরিকল্পিতভাবেই ডালপালা বিস্তার করেছে। পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনুভব প্রথম থেকেই। সাবেক জেলা প্রশাসক অজিয়র রহমান এ সংক্রান্ত উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নের আগেই তাকে চলে যেতে হয়। বর্তমান জেলা প্রশাসক পুনরায় এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং গত জানুয়ারী এ সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ২০১৬ সালে বরিশালে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে সরকার। এখানে তিনশ জনবল থাকার কথা থাকলেও আছে দুজন প্ল্যানারসহ মাত্র ৬ জন। তাদের কাজকর্ম শুধু ম্যাপিং আর সিটিং মিটিংয়ে সীমাবদ্ধ।এখন বরিশাল সিটি এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের কাজ হচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। বর্তমান পরিষদ দায়িত্বে আসার পর পরিকল্পিত উন্নয়নের ওপর জোর দেয়া হলেও বাজেট সংকুলান না হওয়ায় পরিকল্পিত উন্নয়নের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। অথচ গত অর্থবছরও নগরবাসী হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদান করেছে ২৪ কোটি টাকা। বকেয়া ট্যাক্সের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বিসিসি উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসাবে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চায়। কারণ এটি হলে করের টাকায় নগরবাসীকে আরও বেশি সুবিধা দিতে পারত বিসিসি। পাশাপাশি বাড়ির প্ল্যান পাশের হয়রানি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেত নগরবাসী।১০ বছর আগে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনে আরো একবার বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ করতে আইনের খসড়া করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিলো। এই মর্মে জেলা প্রশাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ৭টি দপ্তরে চিঠিও দেওয়া হয়। অজ্ঞাত কারণে তা বেশিদূর এগোতে পারেনি। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন হায়দার এর প্রশাসন পুনরায় বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২২ এর খসড়া প্রস্তাবনা পাঠালে তা নাগরিক মতামতের জন্য ওয়েব সাইটে ঝুলানো হয়েছে। হয়তো খুব শীঘ্রই বরিশালে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে-এমনটাই আশা জেলা প্রশাসনের।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT