বরিশালে চলছে ‘নিখোঁজ নাটক! বরিশালে চলছে ‘নিখোঁজ নাটক! - ajkerparibartan.com
বরিশালে চলছে ‘নিখোঁজ নাটক!

4:59 pm , May 9, 2026

কক্সবাজার থেকে শান উদ্ধার, মামার বাড়িতে মুনিয়া

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥
গত এক সপ্তাহ ধরে বরিশালের সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুই শিক্ষার্থীর রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা। একজন অষ্টম শ্রেণির স্কুলছাত্রী মুনিয়া আক্তার, অন্যজন কিশোর সৌরভ দাস শান। দু’জনের পরিবার, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। ফলে নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে- এসব কি সত্যিই অপহরণ, নাকি পরিকল্পিত ‘নিখোঁজ নাটক’?
১ মে বরিশাল নগরীর সাগরদী এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় এআরএস স্কুলের শিক্ষার্থী মুনিয়া আক্তার। সে ওই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী এবং সাগরদী এলাকার মনির হাওলাদারের মেয়ে। মুনিয়ার মা কোতোয়ালী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে ধান গবেষণা সড়কের বাসিন্দা সান্টু হাওলাদারের ছেলে নয়ন ও একজন স্কুলশিক্ষক মামুনকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের তথ্য। কোথাও বলা হয়, “শিক্ষকের সঙ্গে পালিয়েছে মুনিয়া”, আবার কোথাও “কাউন্সিলর ফিরোজের ভাতিজা নয়ন অপহরণ করেছে” এমন দাবিও উঠে আসে।
তবে ৯ মে সরেজমিন অনুসন্ধানে কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম জানান, “যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, মুনিয়া নিখোঁজ হয়নি। সে ঢাকায় তার মামার বাড়িতে অবস্থান করছে।”
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাব্বির বাদীপক্ষের যোগাযোগ নম্বর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ওসির সহায়তায় মুনিয়ার বাবা মুনীর হোসেনের নম্বর পাওয়া যায়। কিন্তু একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, মুনিয়ার মা পূর্বে সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, পহেলা মে সকাল ১০টার দিকে প্রাইভেট পড়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয় তার মেয়ে। পরে স্থানীয় একটি স্কুল মাঠ থেকে সে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। স্কুলশিক্ষক মামুনের বাসা থেকে ছাত্রীর স্কুলব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় যুবক নয়ন মাঝেমধ্যে তার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতো বলেও অভিযোগ করেন।
তবে ৯ মে শনিবার ঘটনাস্থল ধান গবেষণা সড়কের খেয়াঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কাঁচা ও কর্দমাক্ত সরু সড়ক পেরিয়ে প্রায় ৪০০ মিটার ভেতরে মুনিয়াদের টিনশেড ঘর। প্রতিবেশীরা জানান, মুনিয়া নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। তিন বোনের মধ্যে মুনিয়া মেঝো এবং পড়াশোনায় বেশ ভালো।
স্থানীয় কয়েকজন নারী জানান, সকাল পর্যন্তও মুনিয়ার মাকে কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে। অথচ পুলিশের দাবি, মেয়েটি নিরাপদে মামার বাড়িতে রয়েছে।
মুনিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি টিনশেড ঘরের একটি তালাবদ্ধ, অন্যটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। আশপাশের কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি পরিবারটি কোথায় গেছে। পাশের এক কিশোর জানায়, দুপুরের আগেও তারা ঘরে ছিল।
ঘটনাস্থলের বাইরে প্রধান সড়কে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি মোটরসাইকেলে ২০ থেকে ২৫ জন কিশোর ঘন ঘন এলাকায় টহল দিচ্ছে। স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “ওরাও আপনার মতো মুনিয়াদের বাড়ি খুঁজতেছে।”
এদিকে ২ মে বরিশালের ভাটিখানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় কিশোর সৌরভ দাস শান। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবির মুখে পুলিশ প্রশাসনও চাপে পড়ে।
নিখোঁজের চারদিন পর, ৭ মে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার ঈদগাহ থানা এলাকা থেকে শানকে উদ্ধার করে বরিশালের কাউনিয়া থানা পুলিশ। শানের মা মিতু রাণী ঘোষ দাবি করেন, তার ছেলেকে “অর্ধচেতন ও অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায়” পাওয়া গেছে। অন্যদিকে শান নিজের নিখোঁজের দায় চাপিয়েছে “দাড়ি-পাঞ্জাবি পরা অজ্ঞাত লোকদের” ওপর। তবে পুলিশ এখনো স্পষ্ট করতে পারেনি, কীভাবে একজন কিশোর বরিশাল থেকে কক্সবাজারে পৌঁছালো, কারা তাকে নিয়ে গেল, কিংবা তার বক্তব্য কতটুকু সত্য।কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনজিত চন্দ্র নাথ বলেন, “ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে খুব দ্রুত সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হবে।” দুটি ঘটনায়ই দেখা যাচ্ছে, পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে রয়েছে বিস্তর অসঙ্গতি। কোথাও নিখোঁজের অভিযোগ, কোথাও পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন, আবার কোথাও পুলিশের দাবি – সবই ‘নিরাপদ অবস্থান’। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যদি সত্যিই কেউ নিখোঁজ না হয়ে থাকে, তবে পরিবারগুলোর উদ্বেগ, থানায় জিডি, সামাজিক আতঙ্ক এবং পুলিশের তৎপরতার কারণ কী? বরিশাল নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজ, পালিয়ে যাওয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক সম্পর্কের নানা ঘটনা বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ছড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য। এতে একদিকে যেমন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত ঘটনাও চাপা পড়ে যাচ্ছে নানা গুঞ্জনের ভিড়ে। খোদ পুলিশের কর্মকর্তা বলছেন, অসংখ্য নিখোঁজ মামলার ভিড়ে মুনিয়া কোনটি, মনে নেই। এখন নগরবাসীর প্রশ্ন মুনিয়া ও শানের ঘটনায় প্রকৃত সত্য কী? এটি কি কেবল পারিবারিক বা সামাজিক সংকট, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো চক্র বা প্রভাবশালী মহলের ছায়া?

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT