4:07 pm , April 18, 2026
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে পেয়াজ ও গোল আলুর আবাদ এবং উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের পরেও দর পতনে কৃষকের চরম সর্বনাশ হয়েছে। বেশীরভাগ চাষি পেয়াজ ও গোল আলু উৎপাদন ব্যায়ও তুলতে পারেননি। গত কয়েকটি বছর ধরে গোলআলু কৃষকের গলার কাটা হয়ে ওঠার পরে এবার পেয়াজ নিয়েও প্রায় একই দুরাবস্থা। ফলে এ অঞ্চলের কৃষক ও কৃষি-অর্থনীতি অনেকটাই বিপর্যয়ের কবলে। ভাগ্য বদল ঘটছে ফড়িয়া ও মজুদদারদের।
সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ১.১২ লাখ হেক্টরের ১৪ লাখ টন পেয়াজ ও ১২ হাজার হেক্টরে ২ লক্ষাধিক টন গোল আলু উৎপাদন হলেও ১০ টাকা উৎপাদন ব্যায়ের গোলআলু মাঠ থেকে ৫-৭ টাকা এবং ২০-২২ টাকা ব্যায়ের পেয়াজ ১৫ টাকার বেশী বিক্রি করতে পারেননি কৃষকরা। বেশীরভাগ কৃষকই উৎপাদন ব্যায় তুলতে না পেরে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির কবলে পড়েছেন। ফলে আগামী মৌসুমে অত্যাবশ্যকীয় এ দুটি কৃষিপণ্য আবাদে কৃষকের আগ্রহ কতটুকু অটুট থাকবে তা নিয়ে সন্দিহান কৃষিবীদরা।
ভাটি এলাকা বিধায় বরিশাল অঞ্চলে রবি ফসলের আবাদ দেশের অন্য এলাকার তুলনায় ৩০-৪৫ দিন পর্যন্ত বিলম্বিত হয়ে থাকে। ফলে অন্য এলাকার রবি ফসলে যখন বাজার সয়লাব, তখন দরপতনের মধ্যেই এ অঞ্চলের ফসল বাজার যায়। ফলে এ অঞ্চলের কৃষকরা কখনোই ভাল দাম পান না। এমনকি ফড়িয়াদের বেধে দেয়া দামেই মাঠ পর্যায়ে গোল আলু বিক্রীতে বাধ্য হওয়ায় অনেক কৃষক কৃষি শ্রমিকদের মজুরী পরিশোধ করতেই হিমশিম খেয়েছেন।
তবে চলতি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদিত প্রায় ১৪ লাখ টন পেয়াজের অন্তত ১২ লাখ টন হালি পেয়াজের একটি বড় অংশ এখনো কৃষকের সংরক্ষণে রয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর-ডিএই জানিয়েছে। এসব পেয়াজ কৃষকরা লাগসই প্রযুক্তিতে ধরে রাখলেও তাপ প্রবাহ বৃদ্ধির সাথে তা বিক্রী করতে বাধ্য হবেন। তখন মজুদদারদের নির্দিষ্ট দরেই বিপুল পরিমান পেয়াজ বিক্রী করতে হবে। ফলে সামনে পেয়াজ নিয়ে কৃষকের ভাগ্যে কি অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলতে পারবে।
অথচ মাঠ থেকে কৃষকরা সর্বোচ্চ ৫-৭ টাকা দরের গোল আলু এবং ১২-১৫ টাকায় পেয়াজ বিক্রী করতে বাধ্য হলেও তা এখন খুচরা পর্যায়ে যথাক্রমে ২০ টাকা এবং ২৮-৩৫ টাকা দরে বিক্রী হচ্ছে। কৃষকের ঘরের পেয়াজ আড়তদার ও মজুদদারদের গুদাম হয়ে চলতি মাসের মধ্যেই হীমঘরে ঢোকার পরে আগামী মাসগুলোতে এদুটি পণ্যের দাম কোন পর্যায়ে ওঠে তা দেখার অপেক্ষায় আছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের ৪টি হীমঘরে প্রায় ৫ হাজার টন আলু মজুদ হয়েছে বলে ডিএই’র তথ্যে জানা গেছে।
গত ৯ মার্চ প্রথম বৃষ্টি হওয়ায় গোল আলু ও পেয়াজ তেমন ক্ষতির কবলে না পড়লেও দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টিতে জমিতে বাড়তি সেচের প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন ব্যায়ও বেড়েছে ।
নিকট অতীতেও বরিশাল সহ সারাদেশে পেয়াজ আবাদ ছিল সীমিত। ফলে বিপুল পরিমান পেয়াজ আমদানী ছাড়া কোন বিকল্প ছিলনা। তবে সাম্প্রতিককালে সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলেও পেয়াজ আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে বহুগুন।
বিগত ২৪-২৫ রবি মৌসুমে দেশে ৪.৭০ লাখ হেক্টর আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরিতে ৫.২৪ লাখ হেক্টরে আবাদের ফলে ১ কোটি ১৪ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরিতে বাস্তবে ১ কোটি ৩০ লাখ টন গোল আলু উৎপাদন হয়েছে বলে ডিএই জানিয়েছে। অপরদিকে ২ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টরে পেয়াজ আবাদের লক্ষ্য নির্ধারিত থাকলেও কৃষিযোদ্ধারা বিগত রবি মৌসুমে ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টরেরও বেশী জমিতে এ কৃষিপণ্য আবাদ করেন। ফলে ২৪-২৫ রবি মৌসুমে দেশে ৩৮ লাখ ২১ হাজার টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরিতে প্রায় ৪২ লাখ টন পেয়াজ উৎপাদন হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএই। ডিএই’র মতে দেশে পেয়াজের গড় ফলন এখন হেক্টর প্রতি প্রায় ১৫ টন।
ফলে দেশ পেয়াজ উৎপাদনে চাহিদার প্রায় কাছাকাছিতে পৌঁছে গেলেও কৃষকের কাছ থেকে কমদামে কিনে মজুদদাররা এখনো তা কয়েকগুন বেশী দামে বিক্রী করছে। অথচ এ দুটি কৃষিপণ্য বিক্রী করে গত কয়েকটি মৌসুমে কৃষকরা বিনিয়োগকৃত অর্থই তুলতে পারছে না।
আগের বছর যেখানে মাঠ পর্যায়ে পেয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়ও বিক্রী হয়েছে, সেখানে বিগত রবি মৌসুমের শেষভাগে এসে কৃষিযোদ্ধারা তা ১৫-২০ টাকায় বিক্রী করতে বাধ্য হয়েছেন। আগের কয়েকটি বছর মাঠ পর্যায়ে গোল আলু ১৫-২০ টাকায় বিক্রী হলেও এবারের সদ্য বিদায়ী রবি মৌসুমে তা ৫-৮ টাকা কেজি দরে বিক্রী করতে বাধ্য হয়েছেন।
অপরদিকে কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-‘বারি’ ইতোমধ্যে উন্নতমান ও উচ্চ ফলনশীল পেয়াজ-এর একাধিক জাত উদ্ভাবন করলেও কৃষক পর্যায়ে তার বীজ এবং আবাদ প্রযুক্তি হস্তান্তর না হওয়ায় এতদিন ঘাটতি মোকাবেলাও সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেয়াজের আবাদ ও উৎপাদন কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়ে চাহিদার প্রায় কাছাকাছি পৌছলেও দর পতনে উৎপাদিত পেয়াজ ক্রমশ গলার কাটা হয়ে উঠতে শুরু করেছে বলে দাবী কৃষকদের। ফলে এ অত্যাবশ্যকীয় কৃষিপণ্যটির আশাতীত উৎপাদন হলেও কৃষিযোদ্ধাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না।
অপরদিকে গোলআলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদনকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি পেয়াজ আবাদে যথাযথ প্রনোদনা প্রদান সহ সঠিক দাম নিশ্চিত করতে পারলে কৃষক ও ভোক্তারা উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন কৃষিবীদরা।
বারি উদ্ভাবিত “বারিÑ১” নামের বীজ থেকে হেক্টর প্রতি ১৬ টন পর্যন্ত উন্নতমানের পেয়াজ উৎপাদন সম্ভব বলে জানা গেছে। এ জাতের পেয়াজ ‘পারপেল ও স্টেম ফাইলাম’ রোগ প্রতিরোধে সক্ষম।
‘বারি’ ইতোমধ্যে ‘বারি আলুÑ১ (হিরা), বারি আলুÑ৪ (আইলসা), বারি আলুÑ৭ (ডায়মন্ড), বারি আলুÑ৮ (কার্ডিনাল), বারি আলুÑ১১ (চমক), বারি আলুÑ১২ (ধীরা), বারি আলুÑ১৩ (গ্রানোলা), বারি আলুÑ১৫ (বিনেলা), বারি টিপিএসÑ১ ও বারি টিপিএস-২’ নামের একাধীক উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল আলুবীজ উদ্ভাবন করেছে। এসব উন্নতমানের বীজ থেকে হেক্টর প্রতি ৩০টন পর্যন্ত গোল আলু উৎপাদন সম্ভব।
কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, গোল আলুর ভাল ফলন পেতে উন্নতমানের ও উচ্চফলনশীল বীজের সাথে সার সহ বালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে অধিক আলু উৎপাদনের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যায় হ্রাস করাও সম্ভব। ফলে কৃষকের পাশাপাশি সাধারন মানুষও অপেক্ষাকৃত কম দামে এ কৃষিপণ্য ভোগ করতে পারবেন।
তবে সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলের গোল আলু ও পেয়াজ চাষীদের এখন মূল সমস্যা দরপতন। অথচ ভরা উৎপাদন মৌসুমে মাঠ থেকে পানির দরে পেয়াজ ও গোল আলু বিক্রী করতে বাধ্য হবার কয়েক মাস পরেই তা ভোক্তাদের কাছে বিক্রী হয় কয়েকগুন বেশি দামে।
ফলে যারা উৎপাদন করে, তাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন না হলেও অধীক দামে বিক্রী করে ভোক্তাদের দুর্ভোগ ও কৃষকের সর্বনাশের বিনিময়ে ফড়িয়া ও মজুদদারদের ভাগ্য বদল ঘটছে।
