4:03 pm , April 18, 2026
গড়িয়ার পাড়ে নতুন বাসটার্মিনাল
বিশেষ প্রতিবেদক ॥
নগরীতে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যায় হবার পরেও চালু হয়নি নতুন বাসটার্মিনাল। নথুল্লাবাদে অসহনীয় যানজট স্থায়ী নিরসনে দ্রুত তিনটি পৃথক কার্যাদেশে করা হয় এই টার্মিনাল নির্মানের কাজ। কর্তৃপক্ষ যদিও এক সপ্তাহের মধ্যে এটি চালু করে দিতে পারবেন বললেও বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর কাশিপুরে ৬ একর জমির উপর নির্মানাধীন নতুন বাস টার্মিনাল গত তিন বছরেও চালু করা যায়নি। তিন পর্যায়ের এই টার্মিনাল নির্মানের শেষ সময় ছিলো ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই। নগরীর যানজটের স্থায়ী সমাধানে কাশিপুর এলাকায় ট্রাক টার্মিনালে এই বাস টার্মিনাল নির্মান করা হয়। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং অপর দুটি প্রকল্প থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিতব্য এ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন দূর পাল্লার অন্তত দেড় হাজার গাড়ি চলাচল করার কথা ছিলো। এজন্য নির্মান করা হয়েছে ১১৩টি বাস কাউন্টার। যাত্রি সুবিধার জন্য অত্যাধুনিক ওয়েটিং রুম ছাড়া রয়েছে বিপরিতমুখী প্রবেশ ও বাহির পথ। কর্তৃপক্ষ বলছে টার্মিনালের সব কাজ শেষ, বাস মালিকরা চাইলেই এটি হস্তান্তর করা যায়।
বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল বারি বলেন-নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে লোকাল ও দূরপাল্লার বাসগুলো সব এক স্থানে থাকায় এখানে প্রায়শই যানজটের সৃষ্টি হয়। এজন্য আমরা বাসগুলোর জন্য এই টার্মিনালের ব্যবস্থা করি। মূলত ট্রাক টার্মিনালকে বাস টার্মিনালের জন্য রেডি করে রাখা হয়েছে। যে মেয়র এই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি মনোনয়ন না পাওয়ার পর অন্য মেয়র আসায় আর একাজ এগোয়নি। এখন অল্প কিছু কাজ আছে, আমরা বাস মালিকদের সাথে বসবো, তারা চাইলে ৭ দিনের মধ্যে এটি হস্তান্তর করা যাবে।
একই কথা বলা হয়েছে মেট্রো পুলিশের পক্ষ থেকে। পুলিশের মতে প্রায় পৌনে দুইশ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্টিত নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় টার্মিনালে দুইশ বাস থাকার কথা থাকলেও এখন রয়েছে ৫০০টি। একই সাথে এই টার্মিনালের সামনে থেকে আগে সারাদিন রাতে যেখানে ১২ হাজার যানবাহন চলতো সেখানে এখন চলছে অন্তত ৩২ হাজার। এ অবস্থায় নতুন টার্মিনাল চালুর কোন বিকল্প দেখছে না তারা।
বিএমপি কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম বলেন-নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডটি কোন যোগ্য বাসস্ট্যান্ড নয়। এর পরিসর ভালো না থাকায় বাসগুলো রাস্তায় এসে যাত্রি ওঠানামা করায় যানজট হয়ে যায়। নতুন বাসস্ট্যান্ড হলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটি হলে সবারই সুবিধা। আমরাও বাস মালিক সমিতির সাথে এ নিয়ে কথা বলবো।
কিন্তু বিসিসি এবং বিএমপি’র এমন বক্তব্যের সাথে সরাসরি বিপরীতে রয়েছে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস মালিক গ্রুপ। তাদের মতে একেতো এটি ট্রাক টার্মিনালের জায়গা, এখানে বাস গেলে তাদের সাথে বিরোধ হবে। দ্বিতীয়ত এখানে টার্মিনাল নিমার্মানকাজ ৭ দিনতো দূরের কথা দেড় বছরেও শেষ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এর মাটি ভরাটের কাজও ভালো হয়নি।
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোঃ মোশারেফ হোসেন বলেন- ওখানে কাউন্টার করা হয়েছে ট্রাক টার্মিনালের জন্য। বাস টার্মিনালের জন্য জায়গা রাখা আছে গড়িয়ার দিঘির পাড় যেখানে কোন কাজই হয়নি। এরা যেখানে নিতে চাচ্ছে সেখানে গেলে ট্রাকের সাথে বিরোধ হবে আমাদের। তাছাড়া এই টার্মিনালের কাজ শেষ করতে আরো দু বছর লাগবে। ৭ দিনের মধ্যে কোন ক্রমেই কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। ওনারা কার্যত মিথ্যে কথা বলছে।
একই গ্রুপের সম্পাদক মোঃ মনোয়ার হোসেন বলেন-নতুন বাস টার্মিনালে কোনভাবেই গাড়ি প্লেস করা যাবে না, কাউন্টার করা যাবে না। এটি গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত নয়। স্ট্যান্ডের মাঝখানটা অনেক গভীর। বার্ষায় হাটু বরাবর পানি থাকে। টার্মিনাল নির্মানের নামে টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এখানে বাস পার্কিং সম্পূর্ণ অসম্ভব। তবে বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন একাধিক শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন আগের এবং বর্তমান কোন বাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দই বর্তমান স্ট্যান্ড থেকে চলে যেতে চাচ্ছেন না। এ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাস্তার পাশে বড় এবং ছোট গাড়ি যাত্রী ওঠা নামার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়। যা নতুন স্ট্যান্ডে না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও তিন দিক থেকে রাস্তা থাকায় যাত্রী বেশি পাওয়া যাবে এই অজুহাতেও বাস মালিক সমিতি এখান থেকে যেতে অনিহা প্রকাশ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় নির্মিত ১১৩টি স্টলের অর্ধেকেরও বেশির সার্টার খুলে নেয়া হয়েছে। অরক্ষিত পড়ে থাকা টার্মিনাল ভবনে করা হয়েছে দুটি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্থায়ি ভবন। আরসিসি ইয়ার্ড আছে নামে মাত্র। জংগলে ভরে আছে পুরো এলাকা। যাত্রি ছাউনি ও বিশ্রামাগার নেই। ছাদ পড়ে আছে ফাঁকা।
বিসিসি থেকে জানানো হয়েছে ভবন, বাউন্ডারি দেয়াল আরসিসি ইয়ার্ড বাবদ ইতিমধ্যেই ৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে দুটি প্রকল্প থেকে। এছাড়া ১১৩ স্টল ও আনুসাঙ্গিক নির্মানের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার মধ্যে ইতমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। কিন্তু কার্যত কিছুই দেখা যায়নি। সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকা চলে যায় মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রনে। এ নিয়ে হতাশ সংশ্লিষ্ট সবাই। এক গাড়ি চালক বলেন-আমরা ভালো নেই। আমাদের বিশ্রাম করার জায়গা নেই, রাস্তায় গাড়ি রাখতে হয়, সার্জেন্টদের হয়রানি চলে। রাস্তায় যেভাবে পাগল থাকে আমরাও ঠিক সেভাবেই আছি। একটা বাসট্যান্ড পেয়েছি তাও কার্যকর না হওয়ায় আমরা হয়রানির উপরই আছি। উল্লেখ্য বাসটার্মিনালের কাজটি দেওয়া হয়েছিলো তৎকালীন মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠজন শেখ সাঈদ আহমেদ মান্নাকে। মান্না মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি সেখানে এককোটি টাকার কাজও করেননি। কাজ না করেই প্রায় সাড়ে কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়া হয় ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে।
