চিকিৎসক সংকটের সাথে জনবল মঞ্জুরীর অভাবে ধুকছে শেবাচিম  চিকিৎসক সংকটের সাথে জনবল মঞ্জুরীর অভাবে ধুকছে শেবাচিম  - ajkerparibartan.com
চিকিৎসক সংকটের সাথে জনবল মঞ্জুরীর অভাবে ধুকছে শেবাচিম 

4:18 pm , April 17, 2026

বিশেষ প্রতিবেদক ॥
হাম ডেঙ্গু আর ডায়রিয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ রোগের বিস্তার অব্যাহত থাকার মধ্যে ১ হাজার শয্যার শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি ৫শ রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত জনবলের প্রায় ৬০ ভাগ শূন্য। ফলে প্রতিদিন আড়াই হাজার রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন কর্তৃপক্ষ। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিনাঞ্চলের সর্ববৃহত সরকারি এ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়ন দূরের কথা, প্রতিদিন আগত হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণেও নতুন কোন উদ্যোগ নেই। ফলে এ হাসপাতালটিতে আগত রোগীদের ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা প্রদানও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এ হাসপাতালটিতে গড়ে আড়াই হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকলেও ৫শ শয্যার জন্য মঞ্জুরীকৃত চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ৩২৯ জনবলের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩৭ জন।
এমনকি হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬০ বছর পরেও যুগের সাথে সঙ্গতি রেখে এখানে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সমূহ স্থাপন সম্ভব হয়নি। এমনকি প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬০ বছর পরে এ হাসপাতালটিতে এখনো কোন এমআরআই মেশিন ও ক্যাথল্যাব স্থাপন হয়নি।
তবে অতি সম্প্রতি বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য একটি ক্যাথল্যাব ও আরো একটি এমআরআই মেশিন বরাদ্দ হয়েছে বলে পরিচালক জানিয়েছেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন সহ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব হবে বলে জানান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল  ডা. মশিউল মুনির।
১৯৬৮ সালে মহানগরীর সরকারি অন্ধস্কুল ও শিশু পরিবার সহ সদর হাসপাতালে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চালু করা হয়। পরে ১৯৭৮ সালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বর্তমান নিজস্ব ভবনে ৫শ শয্যার এ হাসাপাতালটি উদ্বোধন করে শের ই বাংলার নামে এর নামকরন করেছিলেন। পরবর্তিতে ২০১০ সালে নতুন কোন জনবল মঞ্জুরী ব্যতিরকেই ৫শ শয্যার এ হাসপাতালটিকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও তার জন্য বাড়তি কোন কিছুই বরাদ্দ হয়নি।
ফলে ৫শ শয্যার জনবলের অর্ধেক ঘাটতির মধ্যে হাসপাতালটি ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেখানে এখন দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াই হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকছে। ফলে এখানে প্রতিদিনই নানা জটিলতা বেড়েছে। বিশাল এ হাসপাতালের সার্জারী, গাইনী ও শিশু বিভাগের মেঝেতেও এখন রোগীদের ঠাঁই মিলছে না। শিশু বিভাগে ধারন ক্ষমতার প্রায় ১০গুন রোগী নিয়ে চিকিৎসক ও নার্স থেকে শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও প্রতিনিয়ত বিব্রত।
দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এ সরকারি হাসপাতালটিতে শুধু বরিশাল বিভাগই নয়, মাদারীপুর,শরিয়তপুর ও গোপালগঞ্জের রোগীরাও আসছেন চিকিৎসা সেবা নিতে।
কিন্তু বহুমুখি সংকটে জর্জরিত এ হাসপাতালটিতে জনবল সংকটে সুষ্ঠু চিকিৎসা সেবা প্রায় বন্ধের পথে। এমনকি বিশাল এ হাসপাতালটির জরুরী বিভাগে প্রতিদিন যেখানে গড়ে প্রায় ৮শ রোগী আসেন, সেখানে মঞ্জুরীকৃত ১০জন ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসারের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৬জন। ৯টি এ্যাম্বুলেন্স পরিচালনে ৫ জন চালক থাকলেও জ¦ালানী খাতে অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিপ্তরের নির্দেশে গত সপ্তাহ থেকে হাসপাতালটির এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে এ হাসপাতালে আর এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু হচ্ছেনা।
এমনকি হাসপাতালটির এ্যানেসথিওলজিস্ট থেকে শুরু করে সহকারী রেজিষ্টার পর্যন্ত সর্বত্রই চিকিৎসকের ঘাটতিতে চিকিৎসা সেবা মুখ থুবড়ে পড়ছে। অতি সম্প্রতি পরিচালকের অক্লান্ত পরিশ্রমে হাসপাতালটিতে ৪০ শয্যার একটি ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ড স্থাপন করা হলেও চিকিৎসকের অভাবে তা পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। ফলে ওয়ার্ডে রোগীর চাপ কমান কোনমতেই সম্ভব হচ্ছে না। অথচ একটি ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ড থাকলে জরুরী বিভাগে আগত বেশীরভাগ রোগীকে সেখানে ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষন সহ চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব। এতে করে ওয়ার্ডে রোগী ভর্তির সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব ছিলো।
এ হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিষ্ট’র একমাত্র পদটিতে কোন জনবল নেই। এছাড়া ডেন্টাল সার্জনের ১৩টি পদে মাত্র ৪জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট’র ৮টি পদে ৪ জন, একমাত্র নার্সিং সুপার পদটিও শূণ্য পড়ে আছে। ফার্মাসিস্ট-এর ৪টি পদে ২টি, রেজিস্ট্রার-এর ৪৯টি পদের ১৫টি এবং সহকারী রেজিষ্ট্রার-এর ৯৬টি পদের ২৬ পদে কোন চিকিৎসক নেই। এছাড়া একমাত্র প্যাথলজিস্ট এবং অউটডোর মেডিকেল অফিসার, বায়োকেমিস্ট সহ সহকারী প্রধান পরিসংখ্যান কর্মকর্তার পদটিও শূণ্য পড়ে আছে দীর্ঘ দিন ধরে। এছাড়া ২য়, তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বিপুল পদেও কোন জনবল নেই।
দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে গত আগষ্ট মাসেই বরিশালে ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও তখন বরিশালে ছুটে আসেন। ফলে কিছু স্বল্প মেয়াদী পদক্ষেপও গ্রহন করা হয়।
কিন্তু এ হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে জনবল বৃদ্ধির বিষয়টি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তবে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে এখানে সেনা চিকিৎসা কোরের একজন বিগ্রেডিয়ার জেনারেলকে পরিচালক নিয়োগের ফলে অনেক পরিবর্তন আসতে শুরু করে।  ইতোমধ্যে আধুনিক হৃদরোগ বিভাগ সহ অত্যাধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি চালু করা হয়েছে। এমনকি প্যাথলজিক্যাল ল্যাবটি অটোমেশনের আওতায়ও আনা হয়েছে।
হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম সরেজমিনে মনিটরিং’এর লক্ষ্যে ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালটির পুরাতন সব ট্রলি মেরামত করা হয়েছে। নতুন ১শ টি সিলিংফ্যান সংযোজন ছাড়াও সব টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে হরিজন সম্প্রদায় থেকে ৯০জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ওয়ার্ডগুলোর পরিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে ৮টি অটোমেটিক মেশিন চলমান রয়েছে। আরো ১২টি সংগ্রহের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন পরিচালক। একই সাথে অতি পুরনো বেডগুলোর পরিবর্তে নতুন ১শ টি বেড সংযোজন করা হয়েছে।
পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনির জানান, খুব শিঘ্রই  ৪৬০ শয্যার ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ ওয়ার্ডের ভবন নির্মান কাজ শেষ হলে সেখানে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি শিশু হাসপাতালটি হস্তান্তর হলে সেখানে শিশুদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে এসব কিছুই চিকৎসক নিয়োগ এবং জনবল মঞ্জুরীর ওপর নির্ভর করছে। এবিষয়ে পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি জানান, সব বিষয় নিয়ে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।  ভবিষ্যতে এসব সমস্যা সমাধানেরও চেষ্টা চলছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT