4:31 pm , February 2, 2026
বিশেষ প্রতিবেদক ॥
দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বরিশাল সফরকে সাধারন মানুষের মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করছেন। নির্বাচনের আগে বুধবার এক ঝটিকা সফরে বিএনপি চেয়ারম্যান বরিশাল বিভাগীয় সদরে আসছেন। আকাশ পথে বুধবার দুপুর ১২টায় বরিশালে পৌছে ঐতিহাসিক বেলসপার্ক ময়দানে জনসভায় ভাষন দিয়ে তিনি ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন বলে জানা গেছে। এরআগে ২০০৫ সালে বরিশাল এসেছিলেন তারেক রহমান। তখন তিনি ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব।
তারেক রহমানকে বরণ করতে উম্মুখ হয়ে আছেন নেতাকর্মীরা। সে লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের এ সফরকে ঘিরে গত কয়েক দিন বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মাঝে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বাধীনতার পরে বরিশালের উন্নয়নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে পথনকশা তৈরী করেছিলেন, তা অনুসরন করে ‘যোগ্য উত্তরসুরী’ হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া তার তিনবারের শাসনামলে বিভাগ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখে গেছেন, সে পথ অনুসরন করে তারেক রহমান ভূমিকা পালন করবেন, তা শুনতে চায় বরিশালবাসী।
১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১ থেকে ’০৬ এর শাসনামলে বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠা সহ অনেকগুলো জনগরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কাজ বেগম জিয়ার হাতে শুরু ও শেষ হয়েছিল। তিনি সবসময়ই সারা দেশের সুষম উন্নয়নের কথা বলতেন। ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এবং ক্ষমতার বাইরে থেকেও বার বারই তিনি বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে ছুটে এসেছেন।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে ১৯৭৯ সালের ২৩ নভেম্বর বরিশাল সার্কিট হাউজে মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারী দেশের ৫ম প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে বরিশালের উদ্বোধন করেছিলন বেগম খালেদা জিয়া। ওই বছরই বরিশাল বিমানবন্দরের নির্মান কাজ শুরু করে ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর তা উদ্বোধন সহ বরিশাল সেক্টরে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান ফ্লাইটও চালু করেছিলেন।
খালেদা জিয়ার সরকারই ২০০২ সালে দেশের ৫ম বরিশাল সিটি করপোরেশন গঠন করেন। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মহানগরীর ডেফুলিয়াতে প্রায় ৫০ একর জমির ওপর বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ছাড়াও বরিশাল মডেল ¯ু‹ল এন্ড কলেজ, বরিশাল মহিলা টিটিসি, দপদপিয়া সেতু ও বরিশাল হার্ট ফাউন্ডেশন সহ বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। সে সময় এসব প্রকল্পের নির্মান কাজ শুরু হয়েছিল। তার সময়ই বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার, বরিশাল সার্কিট হাউজ, বরিশাল জেলা জজ আদালত ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করা হয়েছিলো। ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা হস্তান্তরের ৩দিন আগে বরিশাল মহানগর পুলিশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।
এমনকি দ্বীপজেলা ভোলার যে গ্যাস নিয়ে এখনো বাস্তব কাজের পরিবর্তে নানা কথা চালাচালি চলছে, তার আবিস্কারও বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই। ১৯৯৫ সালের মধ্যভাগে ভোলার শাহবাজপুরে প্রথম পরিক্ষামূলক গ্যাস কুপ খনন শুরু করে ঐ বছরই ৭ নভেম্বর ১ নম্বর কুপে গ্যাসের সন্ধান নিশ্চিত করেন বাপেক্স’র প্রকৌশলীরা। পরদিনই বেগম খালেদা জিয়া ভোলা গ্যাস ফিল্ডে ছুটে আসেন। ভোলাতে একাধিক গ্যাসকুপে প্রায় ২ টিসিএফ গ্যাস আবিস্কৃত হলেও আজ পর্যন্ত তা জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হয়নি। নিশ্চিত হয়নি বানিজ্যিক ব্যবহারও ।
বরিশাল বিমানবন্দর নির্মান ও জাতীয় পতাকাবাহী আকাশ পরিষেবাও তার সময় বাস্তব রূপ লাভ করে।
সারা দেশের সাথে সাগর পাড়ের কুয়াকাটার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা সহ সেখানে প্রথম সরকারি পর্যটন মোটেলের নির্মান কাজ তার সময়ই শুরু হয়। তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়া সরেজমিনে কুয়াকাটা সফর করে ‘একান্ত পর্যটন এলাকা’ ঘোষনা সহ সেখানে আরো একটি পর্যটন মোটেল নির্মানের লক্ষ্যে অর্থ বরাদ্দ করে গিয়েছিলেন ।
কুয়াকাটা-বরিশাল-ফরিদপুর-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কের শিকারপুর ও দোয়ারিকাতে সেতু নির্মান করে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর সেনানী মেজর এমএ জলিল ও বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে তার নামকরণ করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। একই মহাসড়কের বরিশাল-কুয়াকাটা অংশের দপদপিয়াতে দেশের অন্যতম বৃহৎ দপদপিয়া সেতুর নির্মান কাজের সূচনা সহ কলাপাড়া, হাজীপুর ও মহিপুর সেতু নির্মান কাজেরও অনুমোদন প্রদান করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি খুলনা-বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের নির্মানকাজ এবং ঐ মহাসড়কের বরিশাল-খুলনা অংশের গাবখান নদীর ওপর বাংলাদেশ-চীন ৫ম মৈত্রী সেতু নির্মান ছাড়াও বেকুটিয়াতে ফেরি সার্ভিস প্রবর্তনও তার সময়ই হয়েছিল। ফলে বরিশালের সাথে খুলনার সড়ক পথে দূরত্ব ২২ কিলোমিটার হ্রাস পায়।
এমনকি তার সময়ই বাংলাদেশ কোস্টগার্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপকূলভাগ সহ দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথ এবং নদ-নদীর নিরাপত্তা বিধানের বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ কার্যকর হয়।
কিন্তু বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এখনো দেশের ন্যায্য উন্নয়ন ধারা থেকে বঞ্চিত। এখনো বরিশালÑফরিদপুর জাতীয় মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ, ফরিদপুর-বরিশাল-পায়রা-কুয়াকাটা রেল লাইন নির্মান, ভোলার গ্যাস বরিশাল হয়ে ঢাকা ও খুলনায় জাতীয় গ্রীডে সংযুক্ত করা, বরিশালে ইপিজেড স্থাপন, বরিশাল সেক্টরে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট ছাড়াও চট্টগ্রাম-বরিশাল-যশোর আকাশপথে বিমান ফ্লাইট চালু, সাগরের ভায়াভহ ভাঙন থেকে কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র রক্ষার কাজ অন্ধকারে।
প্রায় ১২ লাখটন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলে রবি মৌসুমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারনের মাধ্যমে গম ও বোরো উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি আলোর মুখ দেখিনি। বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলীয় নৌপথে পুনরায় স্টিমার সার্ভিস চালু, বরিশালে পর্যটন মোটেল সহ ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, পূর্ণাঙ্গ ‘মডেল স্ট্যাডি’র মাধ্যমে বরিশাল বন্দরের নাব্যতা উন্নয়নে টেকসই সমাধান সহ বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে মহানগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরী।
বরিশালবাসী বুধবারের জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে তার বাবা-মায়ের যোগ্য উত্তরসুরী’ হিসেবে এ অঞ্চলের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওয়াদা শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে সোমবার দলীয় কার্যালয়ে বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এ সময় তিনি বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে তারেক রহমান অত্যন্ত সজাগ আছেন বলে জানান। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অতীতের মত এবারো দক্ষিণাঞ্চলে উন্নয়নে মাইল ফলক রচনা করবে বলেও জানান তিনি।
