বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বন্ধ ১১ বছর বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বন্ধ ১১ বছর - ajkerparibartan.com
বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বন্ধ ১১ বছর

4:05 pm , December 17, 2022

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন নির্বিঘœ ও নিরাপদ করতে সরকারের শতাধিক কোটি টাকায় ৩টি নৌযান সংগ্রহ ও ২টির পুনর্বাসনের পরেও উপকূলীয় দুটি বিভাগীয় সদরের মধ্যে নিরাপদ নৌ যোগাযোগ সচল করার উদ্যোগ নেই বিআইডব্লিউটিসি’র। গত দুই দশকে বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটের কথা বলে নৌযান সংগ্রহ ও পুনর্বাসনে সরকারের কাছ থেকে কয়েক দফায়  বিপুল অর্থ গ্রহণ করেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি এ রুটে নিরাপদ নৌযোগাযোগ নিশ্চিত করণে খুব আগ্রহী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বরিশাল থেকে ভোলা-হাতিয়া-সন্দ্বীপ হয়ে চট্টগ্রামের নিরাপদ নৌ যোগাযোগের ভবিষ্যত এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। উপরন্তু অতি সম্প্রতি ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল রুটে রকেট স্টিমার সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছতে ২৪ ঘন্টারও বেশী সময় লাগছে। এমনকি দক্ষিণাঞ্চল থেকে নৌপথে চাঁদপুর হয়ে রেলপথে চট্টগ্রাম পৌঁছার বিকল্প পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে দক্ষিণাঞ্চল থেকে চট্টগ্রামগামী সাধারন যাত্রীরা। সর্বশেষ প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বরিশালÑভোলাÑহাতিয়াÑসন্দ্বীপÑচট্টগ্রাম রুটের জন্য ‘এমভি তাজউদ্দিন আহমদ’ ও ‘এমভি আইভি রহমান’ নামের দুটি উপকূলীয় যাত্রিবাহী নৌযান সংগ্রহের পর গেলো বছরের ২ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক পরিচালন সম্পন্ন হয়। তবে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কথা বলে এক বছরেও এর বানিজ্যিক পরিচালন শুরু করেনি রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। তবে নৌযান দুটি বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটের পরিবর্তে চট্টগ্রামÑহাতিয়া এবং কুমিরাÑগুপ্তছড়া রুটে চলছে। বরিশালÑচট্টগ্রাম রুটের কথা বলে চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে ২০০২ সালে প্রায় ৩৩ কোটি টাকায় ‘এমভি বার আউলিয়া’ নামের একটি নতুন নৌযান সংগ্রহ ছাড়াও ২০০৯ সালে আরো প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হক’ নামের দুটি উপকূলীয় নৌযান পুনর্বাসন করা হয়। ‘এমভি বার আউলিয়া’ সংগ্রহের পরে গত ২০ বছরে তার পুনর্বাসন ও নতুন ইঞ্জিন সংযোজনে আরো প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব কিছুর বাইরেও বিশ^ ব্যাংকের সুপারিশে দেশের উপকূলভাগে নিরাপদ যাত্রী পরিবহনকে সরকার ‘গণ দায়বদ্ধ সেবাখাত’ হিসেবে ঘোষণা করে প্রতি বছর বিআইডব্লিউটিসি’কে নগদ ভর্তুকি প্রদান করে আসছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও দেশের উপকূলীয় দুটি বিভাগীয় সদরের মধ্যে নিরাপদ নৌ যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ ২০১১ সালের মে মাস থেকে। ২০২১ সালের ২ ডিসেম্বর বরিশালÑচট্টগ্রাম নৌপথে ‘এমভি তাজউদ্দিন আহদমদ’কে নিয়ে পরীক্ষামূলক পরিচালনের পরে বিআইডব্লিউটিসি’র তরফ থেকে নৌপথটির ‘বামনীর নালা’ ও ‘সেলিম বাজার টেক’ এলাকায় নাব্যতা উন্নয়নের অনুরোধ জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ওই এলাকায় ড্রেজিং সম্পন্ন করে পুরো নৌপথটিকে ন্যূনতম ১৫ ফুট গভীরতার নৌযান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে বলে বিআইডিব্লিউটিএ’র চট্টগ্রাম জোনের পরিচালন পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র পরিচালক (বানিজ্য) আশিকুজ্জামানের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, বরিশালÑচট্টগ্রাম নৌপথের ভাষানচরের কাছে ‘বামনীর নালা’ ও তার উজানে ‘সেলিম বাজার টেক’ এলাকায় নাব্যতা সংকট রয়েছে। ফলে উপকূলীয় নৌযানগুলো ওইসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করতে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। একারণে যাত্রীবাহী নৌযানগুলোকে বরিশাল বা চট্টগ্রামে পৌঁছতে দীর্ঘ সময় নদীতে নোঙরে থাকতে হবে বিধায় উপকূলীয় যাত্রীবাহী স্টিমার  সার্ভিসটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু বিআইডব্লিউটিসি’র এসব বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষন করেছেন বিআইডব্লিউটিএ’র দায়িত্বশীল মহল। তাদের মতে চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া হয়ে ভোলার ইলিশাঘাট পর্যন্ত কোথাও ন্যূনতম নাব্যতা সংকট নেই। তবে অপর একটি সূত্রের মতে, গত বছর সংগ্রহ করা বিআইডব্লিউটিসি’র ‘এমভি তাজউদ্দিন আহমদ ও এমভি আইভি রহমান’ নৌযান দুটির গতি ১০ নটের বেশী নয়।  অথচ ভাটার সময় ইলিশাঘাট থেকে হাতিয়া হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ৭Ñ৮ নট গতিতে পানি সাগরে পতিত হয়। ফলে এসব নৌযান সাগরমুখী প্রবল ¯্রােত অতিক্রম করে চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে পৌঁছতে ১৮Ñ২০ ঘন্টারও বেশী সময় লাগবে বলে মনে করছেন কারিগরি বিশেষজ্ঞরা। গেলো বছরের ২ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক পরিচালনে এমভি তাজউদ্দিন আহমদ ১৯ ঘন্টায় গন্তব্যে পৌঁছে। উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সালে তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তান শিপিং করপোরেশন পশ্চিম জার্মানী থেকে সংগ্রহ করা ৪টি উপকূলীয় যাত্রীবাহী নৌযানের সাহায্যে চট্টগ্রামÑনারায়নগঞ্জÑবরিশালÑচট্টগ্রাম ও বরিশালÑহাতিয়া-সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম রুটে উপকূলীয় স্টিমার সার্ভিস চালু করে। তৎকালীন পাকিস্তানের শাসক আইয়ুব খানের কণ্যাদের নামে ‘এমভি জাকিয়া, এমভি জরিনা, এমবি জোহরা ও এমভি জোবেদা’ নৌযানের নামকরণ করা হলেও পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের পর শহীদদের নামে নামকরণ করা হয়। ‘এমভি আবদুল মতিন, এমভি মনিরুল হক, এমভি আলাউদ্দিন আহমদ ও এমভি তাজুল ইসলাম’ নামের নৌযানগুলোর মধ্যে প্রথম দুটি ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে পুনর্বাসন করা হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে। কিন্তু ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে নৌযান দুটি খুব বেশি দিন নির্বিঘেœ চলেনি। ফলে ২০১১ সালের মাধ্যভাগ থেকে বরিশালÑচট্টগ্রাম উপকূলীয় স্টিমার সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়। ইতোমধ্যে নৌযান দুটি বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। ‘এমভি তাজুল  ইসলাম’ স্বাধীনতার পরেই বিক্রি করা হয়েছে।অপরদিকে ২০০২ সালে সংগ্রহ করা ‘এমভি বার আউলিয়া’ নৌযানটিতেও সংগ্রহের কয়েক বছরের মধ্যে কারিগরি ও যান্ত্রিক ত্রুটি শুরু হয়। ইতিমধ্যে দু দফায় ভারী মেরামত ও পুনর্বাসন শেষে গত বছর মূল ইঞ্জিন পরিবর্তনের পরে  যাত্রী পরিবহনে ফিরলেও বরিশালের পরিবর্তে অন্য রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করে। তবে গত অক্টোবর থেকে এমভি বার আউলিয়া মাসিক প্রায় ১১ লাখ টাকা ভাড়ায় কক্সবাজারÑসেন্টমার্টিন রুটে প্রমোদ ভ্রমনের জন্য চট্টগ্রামের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয়া হয়েছে বিনা দরপত্রে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উপকূলীয় নৌ যোগাযোগ নির্বিঘœ করতে আরো দুটি উপকূলীয় নৌযান সংগ্রহের লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৫০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে  একটি ডিপিপি একনেক এর চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। প্রায় এক বছর পরে ৭শ যাত্রী বহনক্ষম উপকূলীয় নৌযান ‘এমভি তাজউদ্দিন আহমদ’ নির্মানের লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিসি’র সাথে ‘থ্রি এ্যাংগেল মেরিন লিমিটেড এন্ড দি কুমিল্লা শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড জেভি’র সাথে ১৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০ মাসে সরবরাহের কথা থাকলেও তিন দফায় ৪ বছর সময় বাড়িয়ে ৬৮ মাস পরে গত বছর এপ্রিলে নৌযানটি হস্তান্তর করে। প্রায় ১৯৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৯.৩৬ ফুট প্রস্থ এ নৌযানটিতে বেলজিয়ামের ‘এবিসি’ ব্র্যান্ডের মাত্র ৭শ অশ^ শক্তির ইঞ্জিন  সংযোজন করায় এর সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় মাত্র ১৮.৫২ কিলোমিটার। অপরদিকে চট্টগ্রামের ‘এফএমসি ডকইয়ার্ড লিমিটেড’ এর সাথে ৫শ যাত্রী বহনক্ষম অপর উপকূলীয় নৌযান, ‘এমভি আইভি রহমান’ নির্মানের লক্ষ্যে ২০১৫-এর ডিসেম্বরে চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ২০ মাসের পরিবর্তে ৪ দফায় আরো ৪৮ মাস সময় বাড়িয়ে গত বছর এপ্রিলে তা হস্তান্তরের পরে গত বছর ৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি নৌযানই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। তবে এ দুটি নৌযান যথাক্রমে চট্টগ্রামÑহাতিয়া ও কুমিরা-গুপ্তচড়া রুটে যাত্রী পরিবহন করছে। ১৬৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রায় ৩৫ ফুট প্রস্থ ‘এমভি আইভি রহমান  বেলজিয়ামের এবিসি ব্র্যান্ডের মাত্র সাড়ে ৪শ অশ^ শক্তির দুটি মূল ইঞ্জিন রয়েছে। ৫শ যাত্রী বহনক্ষম এ নৌযানটিও পূর্ণ লোড নিয়ে ঘন্টায় ১০ নটিক্যাল মাইল বা ১৮.৫২ কিলোমিটারের বেশী গতিতে চলতে পারছে না। যাত্রী ও পণ্য মিলিয়ে নৌযানটির বহন ক্ষমতা মাত্র ১২৫ টন।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT