4:07 pm , January 25, 2026
মো. জসিম জনি, লালমোহন প্রতিবেদক ॥
‘বল সুন্দরী’ বরই কিনতে বাগানেই ক্রেতাদের ভিড়। তাও ভোলার লালমোহনের নিভৃত গ্রামে। যেখানে কোনদিনই বাণিজ্যিকভাবে ফল উৎপাদন হয়নি। সেখানেই ব্যতিক্রম এই ফলের বাগান করে চমক দেখালেন উদ্যোক্তা মো: হোসেন মিয়া। সাইজে আপেলের মতো এবং রসালো ও সুস্বাধু হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদার কারণে বাগান থেকেই বিক্রি করতে হচ্ছে মালিককে। করনা মহামারির সময় চাকরি হারিয়ে প্রায় বেকার হয়ে যাওয়া এই উদ্যোক্তা এখন লালমোহনের মডেল চাষী। চলতি মৌসুমে এরই মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন তিনি। এখনো ৩-৪ লাখ টাকার বিক্রির আশা আছে।
হোসেন মিয়ার বাগানের নাম ‘হোসেন মিশ্র ফল বাগান’। লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে পূর্ব চরউমেদ গ্রামের সড়কের পাশেই বাগানটি অবস্থিত। ১ একর ৬০ শতাংশ জমি জুড়ে বাগানে প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে তার নামফলক। ভেতরে ডুকলেই হাতের দুই পাশে নেট দিয়ে ঢেকে রাখা বরই ও আম বাগান। বরই এর পাশাপশি উন্নত জাতের আম, ক্যান্সার প্রতিরোধী দুর্লভ ‘ননী ফল’, কমলা সহ বিভিন্ন জাতের ফল শোভা পাচ্ছে এই বাগানে। যার কারণে তিনি বাগানের নাম দিয়েছেন ‘হোসেন মিশ্র ফল বাগান’। বাগানেই পাশাপাশি হাঁস-মুরগীরও খামার রয়েছে তার। সফল উদ্যোক্তা হোসেন মিয়া প্রথমে শেরেবাংলা নগর কৃষি বিশ^বিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরি করতেন। পরে চলে আসেন মেট্টো রেলে। করনা মহামারীর সময় তার চাকরি চলে যায়। চাকরি হারিয়ে তিনি নিজের বাড়িতে চলে এসে শুরু করেন ফল বাগানের উদ্যোগ।
হোসেন মিয়া জানান, শেরেবাংলা ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরির সুবাধে বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গাছ ও ফল নিয়ে গবেষণা নিজের চোখে দেখেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রাখেন তিনি। তখন থেকে স্বপ্ন দেখতেন নিজের জন্মভূমিতে একটি ফলের বাগান করবেন। করনা মহামারীর সময় চাকরি হারানোর পর তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়। প্রথমদিকে অল্প জমিতে বরই চাষ শুরু করেন। তারপর বড় আকারে বাগান তৈরি করার উদ্যোগ নিলে কেউ কেউ তখন তার এ কাজকে পাগলামী হিসেবে দেখতো। কিন্তু হোসেন মিয়া বিশ^াস করতেন, ‘মানুষ বেঈমানি করতে পারে, মাটি ও গাছ কখনো বেঈমানি করে না’। এই বিশ^াস থেকেই তিনি শুরু করেন। এখন তার বাগানে ১২ জাতের আম গাছ আছে। এই জাতগুলো বেনানা, গৌরমতি, হাঁড়িভাঙ্গা, কাটিমন, হিমসাগর, রুপালী ইত্যাদি। বরই এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী, থাই আপেল কুল, থাই বল সুন্দরী, বোম পুলি- এই চার জাতের বরই তিনি চাষ করে বেশি সফল হয়েছেন। আকারে বড় এবং রসালো ও সুস্বাধু হওয়ায় বরই কিনতে বাগানে ক্রেতাদের ভীড় লেগে থাকে প্রতিদিন। বাগান থেকেই তার বেশি অর্ধেক বরই বিক্রি হয়ে যায় বলে হোসেন মিয়া জানান। তিনি কাউকেই ফেরান না। যে যতটুকু কিনতে আসে, সেই পরিমাণই তিনি বিক্রি করেন। প্রতি কেজি বরই বাগান থেকে জাত ভেদে ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা কেজি বিক্রি করেন। পাইকারিও কিনতে আসেন চরফ্যাশন উপজেলা ও লালমোহন বাজার থেকে। ২০২০ সালে প্রথম বছরেই প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার ফলন পান তিনি। পর্যায়ক্রমে গত বছরই বিক্রি করতে পেরেছেন ১৬ লাখ টাকার বরই। এবছরও সমপরিমাণ বরই তিনি ইতোমধ্যে বিক্রি করেছেন। বরই চাষে তার খরচ হয় ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা।
এই বাগানে বড় আকর্ষণীয় আরেকটি ফল হলো ‘ননী ফল’। এটাকে অনেকে ‘মরিঙ্গা সিটি’ ফলও বলে। দুর্লভ এই ফলটি ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে পরিচিত। আরো বিভিন্ন রোগের জন্যও কার্যকর বলে পরিচিতি আছে। এই গাছের পাতাসহ ফল খুবই উপকারী। এর এক কেজি ফলের দাম ৫০০ টাকা। তার বাগানে এই ফলের ২২টি গাছ আছে। এপর্যন্ত প্রায় ২০ কেজির মতো ‘ননী ফল’ বিক্রি করতে পেরেছেন তিনি। হোসেন মিয়া বাগানে রাসায়নিক সার প্রয়োগ না করে, প্রাকৃতিক লতাপাতার ঔষধ ব্যবহার করেন। কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরীকালীন অভিজ্ঞতাই তার প্রতিটি পদক্ষেপে সাফল্য এনে দিচ্ছে বলে জানান হোসেন মিয়া। বরই এর মৌসুম শেষ হলেই আমের মৌসুম শুরু হবে। এখই বরই গাছের মাঝেই আম গাছে মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গেছে। সেই দৃশ্যও এক মনোরম পরিবেশ তৈরি করেছে ‘হোসেন মিশ্র ফল বাগানে।
