3:39 pm , January 7, 2026
বিশেষ প্রতিবেদক ॥
ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে ৪ দিনব্যাপী মহাপবিত্র বিশ্ব উরশ শরিফ শুরু হচ্ছে শুক্রবার মাগরিব নামাজ বাদ। মূলত শুক্রবার জুমা বাদ এ উরশ শরিফের কার্যক্রম শুরু হলেও বাদ মাগরিব ২ রাকাত করে ৬ রাকাত নফল নামাজ আদায় ও দোয়া-মোনাজাত সহ ফাতেহা শরিফ পাঠন্তে মোনাজাতের মাধ্যমে এ দরবারে বিশাল এ ধর্মীয় কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। দেশের প্রতিটি প্রান্ত ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশ থেকে জাকেরান ও আশেকান ছাড়াও ধর্মপ্রাণ মুসলমান এ উরশ শরিফে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে সমবেত হচ্ছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের ভক্তবৃন্দ প্রতিবছরের মত এবারো বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের উরশ শরিফে সমবেত হচ্ছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি থেকে এক বিশাল কাফেলা এ উরশ শরিফে যোগদানের উদ্দেশ্যে শুক্রবার সকালেই বিশ^ জাকের মঞ্জিলে পৌঁছবে। এছাড়া ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকেও বিপুল সংখ্যক জাকেরান ও আশেকান সহ ভক্তবৃন্দ এ উরশ শরিফে যোগ দিচ্ছেন।
দিনরাত ওয়াক্তিয়া নামাজ, নফল নামাজ আদায় এবং ফাতেহা শরিফ ও খতম শরিফ আদায় ছাড়াও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, মিলাদ, মোরাকাবা-মোশাহেদা এবং ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে ৪ দিনের এ উরশ শরিফের কার্যক্রম চলবে। এছাড়াও রাতের শেষভাগে, রহমতের সময়ও কোরআন তোলাওয়াত, মিলাদ এবং জিকির সহ মোরাকাবাও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বিশ^ জাকের মঞ্জিলে। আগামী মঙ্গলবার ফজর নামাজ বাদ ফাতেহা শরিফ ও খতম শরিফ পাঠন্তে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও মিলাদ শেষে বিশ^ জাকের মঞ্জিলের পীর হজরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) এর রওজা শরিফ জিয়ারতের নিয়তে পুনরায় ফাতেহা শরিফ পাঠন্তে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ও সন্নিহিত প্রায় ২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ উরশ শরিফের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। লক্ষ লক্ষ জাকেরান ও আশেকান সহ ধর্মপ্রাণ মুসুল্লীদের এবাদত বন্দেগীতে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ও সন্নিহত এলাকাসমূহ এক ভিন্ন পরিবেশ লাভ করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে জাকেরান ও আশেকানবৃন্দ বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে সমবেত হতে শুরু করেছেন।
শুক্রবার সুচনা দিবসে কয়েক লাখ মুসুল্লী জুমার নামাজ আদায়ন্তে নফল নামাজ ও মিলাদ শরিফ পাঠের পরে পীর মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) এর রওয়াজা শরিফে ফাতেহা শরিফ পাঠন্তে মোনাজাতে অংশ নেবেন। বাদ আছর তওবা কবুলিয়াতের ফয়েজ আদায়ের পরে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত শুরু হবে। মাগরিব নামাজ বাদে দু’রাকাত করে ৬রাকাত নফল নামাজ আদায় ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এরপরে ফাতেহা শরিফ পাঠন্তেও দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এর পর থেকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, মিলাদ ও জিকিরের মাধ্যমে উরশ শরিফের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরাম ছাড়াও বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের বিশিষ্ট খাদেমবৃন্দও ৪ দিনের এ উরশ শরিফে ওয়াজ করবেন।
বিশ^ জাকের মঞ্জিলে সারা বছরই তরিকায়ে নকসবন্দিয়া-মোজাদ্দেীয়ার আমল অনুযায়ী রাতের শেষ প্রহরে, রহমতের সময়ে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে প্রতিটি দিনের এবাদত বন্দেগীর কার্যক্রমের সূচনা হয়। এরপরে মিলাদ ও দোয়া মোনাজাত ছাড়াও জিকির শেষে জাকেরান ও আশেকানবৃন্দ জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায়ন্তে ফাতেহা শরিফ ও খতম শরিফ আদায়ের মাধ্যমে দিনের এবাদত বন্দেগীতে অংশ নেন।
এ উরশ শরিফে নকসবন্দিয়াÑমোজাদ্দেদীয়া তরিকতের নিয়ম অনুযায়ী বাদ এশা ৫শ বার দুরুদ শরিফ পাঠন্তে নবী করিম (সাঃ) কে নজরানা দেয়া হয়। এছাড়াও জোহর, মাগরিব ও এশার নামাজন্তে নফল নামাজ আদায় এবং দোয়াÑমোনাজাতও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে।
আপন পীর উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফী সাধক হজরত মাওলানা শাহ সুফী সৈয়দ খাজা ইউনুস আলী এরায়েতপুরী (কুঃছেঃআঃ) এর নির্দেশে বাংলা ১৩৫৪ সালে শাহসুফি সৈয়দ খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) এর ফরিদপুরের আটরশী গ্রাম থেকে ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত হন। সেদিন মাত্র সাড়ে ৬ টাকায় খেজুরের খোলের বেড়া ও ছনের ছাউনি দেয়া একটি ঘর কিনে তিনি আটরশীতে ‘জাকের ক্যাম্প’ প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন। কালের বিবর্তনে সেই জাকের ক্যাম্পই আজকের ‘বিশ্ব জাকের মঞ্জিল’। মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) তার জীবদ্দশায় বিশ্ব জাকের মঞ্জিল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হেদায়াত প্রদান করে গেছেন। নানা গঞ্জনা ও প্রবল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ২০০১ সালের ১মে ওফাত লাভ পর্যন্ত তিনি ইসলাম প্রচারে ব্রতী ছিলেন।
আজ থেকে প্রায় ৭৯ বছর আগে খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) যখন আটরশীতে আসেন, তখন এখানের মুসলমানরা ইসলামের বিধি বিধান সম্পর্কে মোটেই অবহিত ছিলেন না। তারা ঈদ ও কোরবানীর দিন লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে জমিতে যথারীতি কাজে যেতেন। পুজাÑপার্বনে নতুন জামা কাপড় পরে প্রতিমা দর্শনে বের হতেন।
সে অবস্থাতেই পীর ‘জাকের ক্যাম্প’ প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত জাকের ক্যাম্প ক্রমে জাকের মঞ্জিল থেকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের রূপ নিয়ে এখনো সারা বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দিচ্ছে।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের পীর এর আপন পীর খাজা এনায়েতপুরী (কুঃছেঃআঃ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন শনিবার । তিনি ওফাতলাভ করেন রোববার দুপুর সোয়া ১২টায়। তার দাফন হয় সোমবার বাদ আসর। আর বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের পীর এর দাদা হুজুর মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ খাজা ওয়াজেদ আলী (রাঃ) ওফাত লাভ করেন মঙ্গলবার। আপন পীর ও দাদা হুজুরের জন্ম-মৃত্যুর এসব দিবসকে হিসেব করেই প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের প্রথম শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে ৪ দিনব্যাপী মহাপবিত্র বিশ্ব উরশ শরিফ উদযাপিত হয়ে থাকে। তবে এবার নির্বাচন ও রমাজানের কারণে উরশ শরিফ প্রায় একমাস এগিয়ে আনা হয়েছে। বিশ্ব জাকের জাকের মঞ্জিলের পীর নিজেও সোমবার দিবাগত মধ্যরাতের পরে মঙ্গলবার ওফাত লাভ করেন। এ সবেরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে উরশ শরিফের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হচ্ছে।
মহা পবিত্র উরশ শরিফ উপলক্ষ্যে বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ও সন্নিহিত এলাকায় লাখ লাখ জাকেরান ও আশেকান ছাড়াও মুসুল্লীবৃন্দ কালবে আল্লাহর জিকিরে মেহনত করছেন। এ উরশ শরিফে সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের আহার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ছাড়াও জামাতের সাথে নামাজ আদায়ে সব ব্যবস্থা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শান্তিÑশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও পুলিশ সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে।
