3:10 pm , January 5, 2026
এইচ.এম.জসীম উদ্দীন
বরিশাল নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক বিবির পুকুর যুগ যুগ ধরে নগরবাসীর স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। আধুনিক নগরায়ণের ব্যস্ততার মাঝেও এই পুকুর তার প্রাচীনতা ও ঐতিহ্যের গাম্ভীর্য নিয়ে আজও টিকে আছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, লোককথা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের আলোকে বলা যায় বিবির পুকুর কেবল একটি জলাধার নয়, এটি বরিশালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় বিভিন্ন তথ্য থেকে যতদূর জানা যায় উনিশ শতকের শেষ বা বিশ শতকের শুরুর দিকে (আনুমানিক ১৯০৮ সালে) জিন্নাত বিবি নামে একজন নিঃসন্তান মুসলিম নারীর উদ্যোগে খনন করা হয়েছিল বিবির পুকুর, যিনি খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক উইলিয়াম কেরি-এর পালিত কন্যা ছিলেন।
জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে এই পুকুর খনন করেন। সে সময় পানীয় জল ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য বড় জলাধার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিবির পুকুর সেই প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের জনপদের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছিল। যদিও ঐতিহাসিকভাবে বিবির সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবুও পুকুরটির নাম ও এর সঙ্গে জড়িত জনকল্যাণমূলক ভাবনা বরিশালের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
বিবির পুকুর দীর্ঘদিন ধরে নগর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। একসময় এর চারপাশে গড়ে ওঠে বসতি, বাজার, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সকাল-সন্ধ্যায় মানুষ এখানে আসতো জল নিতে। বিশ্রাম করতে কিংবা গল্পে মেতে উঠতে। ধর্মীয় ও সামাজিক নানা আচার-অনুষ্ঠানেও এই পুকুরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এটি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। বরং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনের এক মিলনস্থল হয়ে ওঠে।
ঔপনিবেশিক শাসনামল ও পরবর্তী সময়ে নগরায়ণের চাপে অনেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হারিয়ে গেলেও বিবির পুকুর টিকে থাকে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে পুকুরটির প্রাকৃতিক রূপ ও ঐতিহ্য অক্ষুন্ন থাকে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, নগরবাসীর আবেগ ও সচেতনতার কারণেই বিবির পুকুর আজও সংরক্ষিত।
বর্তমানে বিবির পুকুর বরিশালের ইতিহাসপ্রেমী মানুষ, গবেষক ও নতুন প্রজন্মের কাছে এক শিক্ষণীয় স্থান। এটি নগরের অতীতকে জানতে সাহায্য করে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল শহরজীবনে বিবির পুকুর আমাদের শেখায় উন্নয়নের পাশাপাশি শিকড়কে আঁকড়ে ধরাও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, বিবির পুকুর একটি জলাধারের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি বরিশালের ইতিহাসের নীরব দলিল, মানুষের স্মৃতির আধার এবং ঐতিহ্যের প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে বয়ে চলা এই পুকুরের শান্ত জল যেন আজও অতীতের গল্প ফিসফিস করে বলে শোনার মতো কান থাকলেই ইতিহাস কথা বলে।
