মেজর এমএ জলিলকে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেয়ায় খুশি বরিশালবাসী মেজর এমএ জলিলকে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেয়ায় খুশি বরিশালবাসী - ajkerparibartan.com
মেজর এমএ জলিলকে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেয়ায় খুশি বরিশালবাসী

5:05 pm , March 6, 2026

বিশেষ প্রতিবেদক ॥
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিলকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘স্বাধিনতা পদক’ প্রদান করা হলেও এখনো তাকে মুক্তিযুদ্ধের ৯ম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ‘বীর উত্তম’ খেতাবটি দেয়া হয়নি। দেশ স্বাধিনের পরে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর লুটপাট প্রতিরোধ করতে গিয়ে তিনি দেশের প্রথম রাজবন্দী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। পরে সামরিক আদালতের বিচারে  খালাস পেলেও আর সামরিক চাকরিতে ফেরা হয়নি।
তবে দেশ স্বাধিনের অর্ধ শতাধিক বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানীকে মরনোত্তর ‘স্বাধিনতা পদক’ প্রদান করায় খুশি তার জন্মস্থান বরিশালের মানুষ। ১৯৭৭ সালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম ‘স্বাধিনতা পদক’  প্রবর্তন করেছিলেন। তার যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মত মুক্তিযুদ্ধের ৯ম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল’কে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানজনক খেতাব ‘স্বাধিনতা পদক’ প্রদান করতে যাচ্ছেন।
১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের কাকুল মিলিটারী একাডেমী থেকে দু’বছরের কঠোর প্রশিক্ষন শেষে কমিশন লাভ করেছিলেন বরিশালের উজিরপুরের সন্তান এমএ জলিল। এরপরে পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসে কর্মরত থাকার পরে মেজর পদে পদোন্নতি লাভ করেন এমএ জলিল। মায়ের অসুস্থতার খবরে ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী দু’মাসের ছুটি নিয়ে উজিরপুরে চলে আসার পর দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে  তিনি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না।
ইতোমধ্যে ২০মার্চ তাকে অবিলম্বে কর্মস্থলে যোগ দেয়ার জন্য বিশেষ জরুরী টেলিগ্রাম আসে। কিন্তু তিনি প্রথমবারের মত সামরিক কমান্ড অস্বীকার করে কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে ২৬ মার্চ বরিশাল শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘স্বাধিন বাংলাদেশের প্রথম সচিবালয়ে’ যোগদেন। তাকে স্বাধিন বাংলাদেশের সামরিক শাখার দায়িত্ব দেয়া হয়। নগরীর বেলসপার্ক সংলগ্ন আইডব্লিউটিএ’র হিমনীড় এর কাঠের ও চাড়ার বাংলো’তে মেজর জলিলের সামরিক শাখার অফিস স্থাপন করা হয়।
ইতোমধ্যে বরিশাল সদরের জাতীয় পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন শুরু হয়ে গেছে। ২৬ মার্চ সকালে জেলা পুলিশ লাইন্স-এর অস্ত্রাগার থেকে মঞ্জুরের নেতৃত্বে সব অস্ত্র নিয়ে আসা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।
বরিশাল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি খুলনা বেতার কেন্দ্রে হামলা চালান। সুন্দরবন হয়ে ভারতের কেলকাতায় গিয়েছিলেন অস্ত্র সংগ্রহ করতে। কিন্তু ফেরার পথে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ইছামতি নদীতে পাক গানবোটের গোলায় তার নৌযানটি ভষ্মিভূত হয়। সাথী যোদ্ধাদের নিয়ে প্রাণপন লড়াই করে এক সময়ে বেঁচে ফেরেন। ইতোমধ্যে পাক সেনাদের হাতে বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের পতন হয়।
এরপর থেকে কোলকাতায় জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে মেজর জলিলকে বৃহত্তর খুলনা বিভাগ সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলা নিয়ে গঠিত ৯ম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়। তার নেতৃত্বে প্রাণপন লড়াই করে ১৪ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা প্রবেশ করে ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা খুলনা পৌছলেও পাক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করে ঢাকার একদিন পরে ১৭ ডিসেম্বর।
১৭ ডিসম্বের খুলনায় পাক সেনারা আত্মসমর্পনের পরে ২০ ডিসেম্বর রাতে খুলনা থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র একটি জাহাজযোগে  রওয়ানা হয়ে পরদিন বরিশালে পৌছেছিলেন মেজর জলিল। বীরের বেশে মেজর জলিল তার প্রিয় বরিশালে ফিরে এলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। কিন্তু বরিশালে পৌছার আগেই খুলনা-যশোরে মিত্র বাহিনীর নির্বিচারে লুটপাটের প্রতিবাদ করেছিলেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। বরিশালের সংবর্ধনা ও নিজের জেলার মানুষের আনন্দ উল্লাসের মাঝেও দেশপ্রেমিক বীরযোদ্ধার মন তখন এক অপ্রত্যাশিত বেদনায় ভারাক্রান্ত। তিনি বরিশালে বসেই খবর পাচ্ছিলেন খুলনা-যশোরে পাক বাহিনীর সব অস্ত্র গোলাবারুদ ও সমরযানগুলো ভারতীয় বাহিনী নিজেদের কব্জায় নিয়ে তা সীমান্ত পার করছিল। এমনকি খুলনা-যশোর শিল্পাঞ্চলের একাধিক পাটকল সহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিনারী খুলে ভারতে পাচার করা হচ্ছিল। যশোর সেনাবিাসের প্রতিটি ভবনে পরিকল্পিতভাবে লুটপাট চালাচ্ছিল ভারতীয় বাহিনী।
কোনভাবেই একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে তিনি তা মেনে নিতে পারছিলেন না। দীর্ঘদিন পরে মায়ের কাছে ফিরেও এসব ঘটনায় তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। জনগনের সংবর্ধনা তার মনে যে রেখাপাত করছিল, তারচেয়ে বিষিয়ে উঠছিল ভারতীয় বাহিনীর এসব অনৈতিক কর্মকান্ডে।
মেজর জলিল কোনভাবে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত ছুটে গেলেন খুলনা-যশোরে। ভারতীয় বাহিনীর লুটপাট বন্ধে সব শিল্প কবারখানা থেকে শুরু করে খুলনা-যশোর হয়ে বেনাপোল সড়ক অবরোধ করে খুলে নেয়া মেশিনারী বোঝাই গাড়ীর বহর আটকে দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ৯ম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল। এমনকি ভারতীয় বাহিনীর খুলনা অঞ্চলের অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিং’কে তিনি সেদিন কঠোরভাবে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘লুটেরাদের দেখামাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনা বাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন’। কিন্তু তার সে কথায় কর্ণপাত করেনি বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় মিত্রবাহিনী।
এমনকি ভারতীয় বাহিনীর এ পরিকল্পিত ও ন্যাক্কারজনক লুটপাটের বিষয়টি সেদিন মেজর জলিল তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা’কে জানিয়ে জরুরী চিঠিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন কিছুতেই কাজ হয়নি। বরং ৩১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনী এম্বুশ করে মুক্তিযুদ্ধোর ৯ম সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল’কে আটক করে। গ্রেপ্তারের কিছুদিন পরে মেজর জলিলকে ঢাকায় নিয়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পাশে একটি অস্থায়ী সেনা ছাউনিতে আটক রাখা হয়। সেখানে সামরিক আদালতে বিচারে মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানী নির্দোষ প্রমানিত হয়ে ১৯৭২ সালের ৭ জুলাই মুক্তি লাভ করলেও তিনি আর সামরিক ছাউনিতে ফেরত যাননি।
জীবনের অবশিষ্ট সময় তিনি জাসদের সভাপতি হিসেবে কয়েকবার কারাবাস করেছেন। ৭ নভেম্বর পরবর্তি সময়ে সামরিক আদালতের বিচারে কর্ণেল তাহেরের সাথে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাধারন ক্ষমা প্রদান করেন। পরবর্তিকালে তিনি মাওলানা হাফেজী হুজুরের দলে যোগ দেন।  ১৯৮৮ সালের ১৬ নভেম্বর মেজর জলিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে হৃদরোগ আক্রান্ত হলে তাকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ১৯ নভেম্বর রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ২২ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানীর লাশ ঢাকায় আনার পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় মীরপুর বুদ্ধিজীবী  গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।
কিন্তু স্বাধিনতার ৫৪ বছর পরে তাকে স্বাধিনতা পদকে ভুষিত করা হলেও মুক্তিযুদ্ধের এ বীর সেনানীকে সেক্টর কমান্ডার হিসেব প্রাপ্য সম্মান আজো দেয়া হয়নি।  শুধুমাত্র ২০০৪ সালে তার স্বপ্নের বরিশাল মহানগরীর নবগ্রাম রোডটির নাম ‘মেজর জলিল সড়ক’ নামে নামকরণ ছাড়াও ২০০২ সালে তার জন্মস্থান উজিরপুরের শিকারপুর এলাকায় সুগন্ধা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি ‘মেজর জলিল সেতু’ নামে নামকরণ করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বরিশাল বিমানবন্দরটি মেজর জলিলের নামে নামকরণের দাবীটি আজো পূরণ হয়নি।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT