চলে গেলেন বরিশাল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয়মুখ মুকুল দাস চলে গেলেন বরিশাল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয়মুখ মুকুল দাস - ajkerparibartan.com
চলে গেলেন বরিশাল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয়মুখ মুকুল দাস

5:16 pm , March 3, 2026

পরিবর্তন ডেস্ক ॥ চলে গেলেন বরিশাল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয়মুখ, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, ”নদীমেখলা এই বরিশাল … ” গানের শিল্পী মুকুল দাস। সোমবার (২ মার্চ) দিবাগত রাত ৩ টায় পরলোকগমন করেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় তার মরদেহ উদীচী সংগীত বিদ্যালয়ে নেয়া হলে সেখানে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করা হয়। পরে বরিশাল মহা শ্মশানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়।সৃষ্টিশীলতার পথে বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুকুল দাস। আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনের রাজপথ থেকে মুক্তিসংগ্রামের গৌরব গাঁথায় আবার নাটকের মঞ্চ থেকে সঙ্গীতের আসরে কিংবা সমৃদ্ধ লেখনী ও শিক্ষকতায় মুকুল দাসের নাম নিজস্ব গতিতে ছড়িয়ে আছে জনারণ্যে-নগর থেকে প্রান্তরে।সংস্কৃতির আসরে তার এই তুমুল জনপ্রিয়তা অনেক ক্ষেত্রেই ঢেকে ফেলে তাঁর মূল পেশা শিক্ষকতার পরিচয়।তবে সব পরিচয়ের পর্দা সরিয়ে তাঁর কণ্ঠ যেন সদামুখর রাবীন্দ্রিক বয়ানে ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/আমি তোমাদেরই লোক।’তাঁর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১০ জানুয়ারি বরিশালের দপ্তরখানা এলাকার এক সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিবান পরিবারে। মা সরযু দাস ভজনগানের শিল্পী এবং ঐতিহ্যবাহী প্রগতি পাঠাগার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। বাবা মণীন্দ্র কুমার দাস, তৎকালীন কংগ্রেস সমর্থক এবং সমাজসেবক। ৫ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে মুকুল দাস সবার বড়। মা-বাবার দেয়া নাম দুলু। ’৫৩ সালে প্রভাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (বর্তমান উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়) ভর্তি। ৩য় শ্রেণিতে ওঠার পর ’৫৪ সালে বিশেষ কারণে স্কুল পরিবর্তন করে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের মধ্যে ক্যাথলিক ব্রাদার ডুবোর পরিচালনায় ইংলিশ মিডিয়াম কেমব্রিজ স্কুলে ভর্তি। কিন্তু সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে ভর্তি। সত্য-প্রেম-পবিত্রতার আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়ে ৬৫ সালে সেখান থেকে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ। তার পড়াশোনাকালীন সময়ের তিনজন চিরকুমার প্রধান শিক্ষক ছিলেন আচার্য জগদীশ মুখোপাধ্যায়ের ভাগ্নে যোগেশ চট্টোপাধ্যায়, সতীপদ ঘোষ এবং জয়ন্ত কুমার দাশগুপ্ত। তবে আবৃত্তি ও অভিনয়ে সদা ঋণ যাঁর কাছে, তিনি সহকারি প্রধান শিক্ষক চন্দ্রশেখর দাশগুপ্ত। সেখানে রমেশ চক্রবর্তী, অনিল ঘোষ, নরেন্দ্র নাথ দত্ত, জগজ্জীবন স্যার, ভরত স্যার, সুখরঞ্জন চক্রবর্তী, পি কে সেন স্যারদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা। ’৬৫ তে ব্রজমোহন কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি। অধ্যক্ষ মেজবাহুল বারী চৌধুরী, আর পি সেন, আ: সাত্তার, মনোরমা গুহ, আসাদুজ্জামান, সৈয়দ আমিনুল হক ও মকবুলউদ্দিন আহমেদ এ সময়ের শিক্ষক। ’৬৭ সালে একই কলেজে সাহিত্যে স্নাতকের ছাত্র হিসেবে সামসুল হক, সামসুল ইসলাম, লুৎফুল হায়দার চৌধুরী, প্রফেসর মো: হানিফ, অধ্যাপক নূর মো: আকন, প্রফেসর সিরাজুল হক, প্রফেসর এম মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমূখ শিক্ষকদের সংস্পর্শে আসেন। ’৭০ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলায় শিক্ষকতা করেন। ঐ বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়াকালীন জগন্নাথ হলের ওয়েস্ট হাউজের টিনশেডে অবস্থান। এসময় হাউজ টিউটর অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং বাম ঘরানার বিদগ্ধ প-িত ড: আহমদ শরীফের সঙ্গ লাভ করেন। ’৭১ সালের ৬ জানুয়ারি হল খালি করে দিতে বলা হলে বরিশাল চলে আসেন। এসময় স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে পাড়ায় পাড়ায় গণসংগীত এবং প্রতিবাদী নাটকে অভিনয় করেন। যুবসংঘ করতে গিয়ে ২৫ মার্চ- ২৫ এপ্রিল মেয়াদের মুক্ত বরিশালে বাংলাদেশ নামে একটি বুলেটিন প্রকাশ করেন। স্বাধীনতার পরে ৯নং সেক্টরের মুখপত্র সাপ্তাহিক বিপ্লবী বাংলাদেশে সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। এখানে থাকাকালীন চরবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলীপ বসুর দ্বারা বাঙলার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ। কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকা হয়নি তাঁর। অগত্যা ভবঘুরে  হয়ে ঢাকায় মামুনুর রশীদের আরণ্যক নাট্যদলের সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ কাউন্সিল মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করেন তিনি। সেটা ১৯৭৭ সাল। একই সময় বংশাল রোডের দৈনিক সংবাদের শিল্প ও সংস্কৃতি পাতায় লেখালেখি এবং শাহবাগের ঢাকা রেডিওতে কেজুয়াল তবলা বাদক হিসেবে কাজ করেন। ’৮০ সালে ঢাকা ছেড়ে বরিশাল প্রত্যাগমন।ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকেই মুকুল দাসের সঙ্গীত শেখা হয়। তবে গ্রামোফোন শুনে শুনে যেকোন গান তিনি তুলতে পারতেন- তখনকার সময়য়ের বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীদের অনুকরণ করে গাইতে পারতেন। রবীন্দ্র অনুরাগী মুকুল দাসই গাইতেন চারণ কবি মুকুন্দ দাসের গান ‘ভয় কী মরণে…’। গাইতেন হেমন্ত মুখপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, রাহুলদেব বর্মন, অনুপ ঘোষালসহ বিখ্যাত শিল্পীদের জনপ্রিয় গান। তিনি মান্না দে’র কণ্ঠে গান গেয়ে সকলের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। ষাটের দশকে বরিশালে কোন সঙ্গীতানুষ্ঠান হলেই ডাক পরতো মুকুল দাসের। তখন তিনি হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় একজন কণ্ঠশিল্পী। এরপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে গণসংগীত পরিবেশন করেন। গাইতেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীর গান। একইভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ও তার আগে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেও সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। কোন এক সময় তিনি প্যারডি গান গেয়েও মঞ্চ মাতিয়ে রাখতেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিখিল সেন এবং শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক বদিউর রহমানের অনুরোধে বরিশাল উদীচীতে কোরাস গানে নেতৃত্ব দেন এবং বরিশাল নাটকে অভিনয় করেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদেরও সদস্য তিনি। মহাবাজ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহ-প্রধান শিক্ষক তরুণ চন্দ একরকম জোর করেই ঐ বিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক হিসেবে তাঁকে নিয়োগপত্র দেন। শিক্ষকতা জীবনে তিনি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির ব্যনারে শিক্ষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বেসরকারি শিক্ষকদের নায্য প্রাপ্যতার দাবিতে ’৮৬ সালে বঙ্গভবনে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি, ’৯৪ সালে শিক্ষকদের সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি, ’০১ সালে বরিশাল বোর্ড আন্দোলনসহ নানা আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল।৩০ বছর ঐ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে ২০০৯ সালের ৯ জানুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন। অবসরে একটি স্থানীয় দৈনিকের সহকারি সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া অমৃত লাল দে সংগীত একাডেমির সংগীত বিভাগের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।পরে সেখানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস, অরবিন্দ বিশ্বাস, ধীরেন বসু, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, কলিম শরাফী, ওয়াহিদুল হক, সানজীদা খাতুন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসি মজুমদার, আসাদ চৌধুরীসহ অসংখ্য গুণী মানুষের সাহচর্য পেয়েছেন।মুকুল দাস তাঁর শিল্পী জীবনে অনবদ্য ও বিশেষ অবদানের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্মাননা প্রাপ্ত হন। এর মধ্যে ১৯৯২ সালে অমৃত পদক, ’৯৪ সালে কাউখালি উত্তরায়ন খেলাঘর আসর সম্বর্ধনা, ’৯৯ সালে কীর্তনখোলা থিয়েটারের রবীন্দ্র-নজরুল-মুকুন্দ উৎসবে গুণিজন সম্মাননা, ’১০ সালে বরিশাল আঞ্চলিক শিক্ষক সমিতির ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা, ও দৈনিক কালের কন্ঠের পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা, ’১৫ সালে বরিশাল জেলা প্রশাসন প্রবর্তিত জীবনানন্দ স্মারক সম্মাননা, বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ প্রবর্তিত শহীদ আলতাফ মাহামুদ স্মৃতি পদক ও মহান স্বাধীনতা দিবসে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি স্মারক সম্মাননা, ’১৬ সালে বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা স্মারক সম্মাননা, ’১৭ সালে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সত্যেন সেন গণসঙ্গীত উৎসবে সত্যেন সেন স্মারক সম্মাননা, ’১৮ সালে বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বর পরিষদের বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে স্মারক সম্মাননা ও বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি পদক, ’২০ সালে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বরিশাল টাইমস এর স্মারক সম্মাননা ও শুকতারা খেলাঘর আসরের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে স্মারক সম্মাননা, ’২২ সালে সাহিত্য বাজার এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বরিশাল জেলা সংসদ থেকে গুণিজন সম্মননা তাঁর কীর্তির স্বীকৃতি। তাঁর সম্মানে ঢাকাস্থ বরিশালবাসীরা ২০১৪ সালের নভেম্বরে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে আয়োজন করে ‘মুকুল সন্ধ্যা ’।জীবনের প্রান্তিক সময়ে তাঁর স্মৃতিচর্চা ছিলো বিস্ময়কর। কি গানে, কি আড্ডায় বা কি রসাত্মক লেখায় তার তুলনা ছিলেন তিনি নিজে! সকলের প্রিয় মুকুল দাস জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঝাউতলা প্রথম গলির একটি ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী তাপসী দাসকে নিয়ে বসবাস করেছেন । তার মৃত্যুতে বরিশালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকেববর ছায়া নেমে এসেছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT