আস্থার প্রতিফলন ঘটালেন মেজর হাফিজ আস্থার প্রতিফলন ঘটালেন মেজর হাফিজ - ajkerparibartan.com
আস্থার প্রতিফলন ঘটালেন মেজর হাফিজ

3:31 pm , February 16, 2026

মোঃ জসিম জনি, লালমোহন প্রতিবেদক ॥
ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বীরমুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা এবং স্থানীয় উন্নয়নকেন্দ্রিক কর্মকা–এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার জনপ্রিয়তা আরও একবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও বিজয়ের মূল কারণ। তিনি এবারের নির্বাচনে প্রতিটি জনসভায় বক্তব্যে বলেছেন, “শুধু আমাকে দেখে ভোট দেবেন, আমার অন্য কোন নেতাকর্মীর দিকে তাকিয়ে নয়। আমি ইনশাল্লাহ আপনাদের ভোটের প্রতিদান দিবো।” চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী কিছু কিছু নেতাকর্মীদের নিয়ে ভোটারদের মাঝে অনিহা আসে। তাদের নিয়ে যখন নির্বাচনে কিছুটা প্রভাব পড়তে শুরু করে তখন মেজর (অবঃ) হাফিজের এই বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার হয়। তার স্পষ্ট বক্তব্য, কারো প্রতি কোন জুলুম সহ্য করা হবে না।
নির্বাচনে জয়ী হয়েও তিনি কঠোরভাবে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, কেউ যেন আওয়ামী লীগ বা জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো দলীয় কোনো সমর্থকের সাথে রুঢ় ব্যবহার না করে। কারো প্রতি যেন কোনো অন্যায় আচরণ না করা হয়। কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করে দেন তিনি। নির্বাচন পরবর্তী গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘জনগণের উপর কোন শক্তি নেই সেটি প্রমাণিত হলো এই নির্বাচনে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, স্বাধীনতা-সার্বোভৌমত্বকে সুসংহত রাখতে পারি এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়ার আদর্শ এবং জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকে ধরে রাখতে পারি ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ অচিরেই একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত রাখা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রাখাই তার সাফল্যের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি তার রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও ব্যক্তিগত ইমেজ। হাফিজ উদ্দিন আহমদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। “বীর বিক্রম” উপাধি তাকে স্থানীয় জনগণের কাছে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী এই পরিচয় তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে শক্তিশালী করেছে। সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শেষে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকায় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও কেন্দ্রীয় যোগাযোগ-দুটিই তার শক্তির জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ক্রীড়াঙ্গণেরও একজন পরিচিত মুখ ছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা লীগে মোহামেডানের হয়ে এক ম্যাচে ৬ গোল করে (ডাবল হ্যাটট্রিক) ইতিহাস গড়েন। তিনি ১৯৬৬-১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন এবং মোহামেডানের হয়ে চারবার ঢাকা লীগ শিরোপা জিতেছেন। ১৯৭৬ সালে তাঁর অধিনায়কত্বে দলটি আবাহনীকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ফুটবলের পাশাপাশি ২০০ মিটার দৌঁড়েও তাঁর রেকর্ড দীর্ঘদিন অক্ষুণœ ছিল। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পান। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ও এএফসি’র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাফুফে সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়, বরং ক্রীড়া প্রশাসক হিসেবেও আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
তার বাবা ডাঃ আজাহার উদ্দিন আহমদও ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ)। তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর বাবার হাত ধরেই রাজনীতিতে পদার্পন করেন মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। এযাবৎ দশটি নির্বাচন করে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। এবার ভোট পেয়েছেন ১,৪৫,৯৯০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত মুহাঃ নিজামুল হক নাঈম (ফুলকপি) পেয়েছেন ৫৭,৩৫১ ভোট। ২০০১ সালে তিনি আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদের সাথেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ছিলেন সরকারের পাট, বাণিজ্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। লালমোহন ও তজুমদ্দিন এলাকায় সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে তার ভূমিকা স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তার অবস্থান ভোটারদের আস্থায় প্রভাব রেখেছে। এই অঞ্চলের প্রধান সমস্যা নদী ভাঙ্গন। তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রী থাকাকালীন নদী ভাঙ্গন রোধে দুই উপজেলাকে রক্ষার জন্য বড় ভূমিকা পালন করেন। এবারো তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পাচ্ছেন এমনটাই আশা করে আছেন এলাকার নেতাকর্মীরা।
এবার বয়সের কারণে নির্বাচনে আগের মতো মাঠ পর্যায়ে বেশি যেতে না পারলেও এলাকার ভোটাররা তার প্রতি আস্থা রেখে ভোট দিয়েছেন। এজন্য তিনি ভোটারদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই নির্বাচনে বয়সের কারণে অতীতের নির্বাচনের মতো পরিশ্রম করতে পারিনি। কারো বাড়িতে যেতে পারিনি। কোনো হাটবাজারে জনসংযোগ করতে পারিনি। তারপরও আমার প্রতি আস্থা রেখে আমাকে ভোট দিয়েছেন। আমি লালমোহন ও তজুমদ্দিন থেকে দুর্নীতির সকল শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা করবো। মাদকমুক্ত করার চেষ্টা করব। কোনো মানুষের উপর আমি অত্যাচার করতে দেব না। আমি এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আপনাদের সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ থাকবে। কারো কোনো অভিযোগ থাকলে আমাকে বা আমার প্রতিনিধিকে সরাসরি জানাবেন।’
সপ্তমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ আবারও প্রমাণ করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি জনসংযোগ ও আস্থার রাজনীতি এখনও উপকূলীয় এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে উন্নয়ন ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার ভূমিকা কীভাবে এগোয়, সেদিকে নজর থাকবে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT