3:51 pm , December 18, 2025
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল নগরীতে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছে রুবেল শরীফ (৪০) ওরফে নাক কাটা রুবেল ও তার বাহিনী। মাদক, চাঁদাবাজি সহ নানা অপরাধের কারণে থানা ও আদালতে মামলা চলমান থাকলেও জেলহাজত থেকে বেরিয়ে ফের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করেছে। সর্বশেষ ১৭ ডিসেম্বর রাতে নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা খালেদাবাদ কলোনির বাসিন্দা মো. মোফাজ্জেল কাজীর ছেলে মো. সুজন কাজী ৪ জনকে অভিযুক্ত করে বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত ৪ জন হলেন- একই কলোনির বাসিন্দা মৃত. আলতাফ শরীফের ছেলে রুবেল ওরফে নাক কাটা রুবেল ও তার ভাই রাজন, আক্তার কসাইয়ের ছেলে তুহিন ও সালামের ছেলে সোহেল।
সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ এপ্রিল রাত ৯টার ওই কলোনির সামনে রুবেলের মুদির দোকানে বসে নাক কাটা রুবেল ও তার ভাই রাজন (৪২), ভুলু মিয়ার ছেলে হৃদয় (২৫), ছান্না মিয়ার ছেলে ছানি (২৬) ও আ. রহিমের ছেলে আসিফ (১৮) ফার্নিচার ব্যবসায়ী সোহাগ কাজীর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। দাবীকৃত চাঁদার টাকা দিতে অপারগতা সোহাগ প্রকাশ করায় তারা তাকে বেদম মারধর করে। হামলার খবর শুনতে পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে সোহাগের গর্ভবতী স্ত্রী শিউলি। এ সময় নাক কাটা রুবেল গর্ভবতী শিউলির পেটে লাথি দেয়।
স্থানীয়রা প্রথমে আহত শিউলি কে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করে। পরবর্তীতে কর্মরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা প্রেরণ করলে শিউলির আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক জানায়- গর্ভের শিশু মাথায় প্রচ- আঘাত লাগার কারণে মারা গেছে। পরে সিজারিয়ান ডেলিভারি করে শিউলির মৃত সন্তান বের করা হয়। এমন অভিযোগে এনে চলতি বছরের ৩০ জুন বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিউলির বোন শিম্মি বাদী হয়ে ওই ৪ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বটতলা আমির কুটির হরিজন কলোনি নামক স্থানে নগরীর ১৫ নং ওয়ার্ড মুনসুর কোয়ার্টার এর বাসিন্দা মো. সবুজ (২৯) ওরফে ভাগিনা মিলনকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে জখম করে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় রুবেল, অলি, তুহিন, সোহেলের নেতৃত্বে প্রায় ১০/১২ জন। পরে আহত মিলনকে প্রথমে শেবাচিম হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগে ভর্তি করা হয়।
নাক কাটা রুবেল ও তার বড় ভাই আবুল বাসার (৪২) ওরফে রাজন হলেন পটুয়াখালী দুমকি উপজেলার পূর্ব কার্ত্তিকপাশা গ্রামের মৃত. আলতাফ শরীফের ছেলে। এলাকায় নানা অপকর্মে অভিযুক্ত থাকায় এলাকাবাসী নাক কাটা রুবেলের এক পা ভেঙে দেয়। এলাকা ছেড়ে বরিশাল নগরীর বাংলাবাজার ‘শহীদ আলতাফ স্কুল’ সংলগ্ন এলাকায় এসে নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে সে। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় নাক কাটা রুবেলের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। ২০১৩ সালের ১০ জুন দায়েরকৃত ৮ নং, ২০২৩ সালের ৫ জুন দায়েরকৃত ৯ নং ও ২০০৯ সালের ১৬ অক্টোবর দায়েরকৃত ৫১ নং মামলার আসামি রুবেল। নাক কাটা রুবেলের ভাই রাজনের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। ২০২৩ সালের ৫ জুন দায়েরকৃত ৯ নং ও ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ দায়েরকৃত ৬০ নং মামলার আসামি রাজন।
এই দুই ভাইয়ের ছত্রছায়ায় মাদক ক্রয়-বিক্রয় করছে বাংলাবাজার সংলগ্ন আরশেদ আলী কন্টাক্টর গলির ভাড়াটিয়া বাসিন্দা রিকশাচালক আনোয়ারের ছোট ছেলে অলি (১৯) চলমান বছর ৩/৪ বার ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিল।
রিফিউজি কলোনির স্থায়ী বাসিন্দা মৃত আকতার কসাইয়ের ছেলে শাহিন (৩৫) ও তুহিন (৩০)। এ দুই ভাই ইয়াবা শাহিন-তুহিন নামে পরিচিত। বড় ভাই নাক কাটা রুবেল ইয়াবা আনে আর ছোট ভাই বিক্রি করে। ইয়াবাসহ একাধিকবার ডিবি পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল তুহিন। রয়েছে একাধিক মামলা।
নাক কাটা রুবেলের আপন মামাতো ভাই মো. সোহেল (২৮) ওরফে বাবা সোহেল। নগরীর ১৩ নং ওয়ার্ড কাজিপাড়া এলাকায় সোহেল ভাড়া থাকলেও আড্ডা জমায় রিফিউজি কলোনীতে। তার বাবা সালাম ওরফে ফেন্সি সালাম স্ত্রীকে নিয়ে চরকাউয়া হিরণ নগর এলাকায় বসবাস করে। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় ২০২৩ সালের ৫ জুন দায়েরকৃত ৯ নং মামলার আসামি সোহেল।
নাক কাটা রুবেলের অপর এক ভয়ংকর সহযোগী হলেন রিফিউজি কলোনির স্থানীয় মো. জব্বার কসাইয়ের ছেলে আব্দুল হামিদ ( ৩০) ওরফে বাপ্পী। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় ২০১৫ সালের ১৭ মে দায়েরকৃত ৩৪ নং, ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর দায়েরকৃত ৮ নং ও ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দায়েরকৃত ১৩ নং মামলার আসামি বাপ্পী।
নাককাটা রুবেলের প্রধান ইয়াবা সরবরাহকারী হলেন- রিফিউজি কলোনির রাজবাড়ির ভাড়াটিয়া মৃত. আব্দুল ছত্তারের ছেলে মো. জাহাঙ্গির আলম (৫০) ওরফে হাড্ডি জাহাঙ্গির। ২০১৫ সালের ১৭ মে দায়েরকৃত ৩৪ নং, ২০২২০ সালের ২৮ মার্চ দায়েরকৃত ৮৮ নং ও ২০১০ সালের ৭ জানুয়ারি দায়েরকৃত ১১ নং মামলার আসামি। সর্বশেষ চলিত বছরের ৩১ জানুয়ারি ডিবির এসআই রাহাতুল ২শ পিস ইয়াবা সহ হাড্ডি জাহাঙ্গীরকে তার বাসভবন থেকে আটক করে।
এ সকল ভয়ংকর অপরাধীদের সাঙ্গপাঙ্গ হলেন- নগরীর ১৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি তানভীর হোসেন হীরা (৩০)। এই হীরার সহযোগিতায় নাক কাটা রুবেল বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক রইজ আহম্মেদ মান্নার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলো।
রিফিউজি কলোনির ভাড়াটিয়া বাসিন্দা রাকিব ওরফে সবজি রাকিব, আলামিন ওরফে বুলেট আলামিন, কাজীপাড়ার শাহ আলম (৪০) ওরফে গোল আলু, নগরীর সার্কুলার রোডের বাসিন্দা মো. হানিফ ওরফে টোকাই হানিফ। এ সকল অপরাধীরা প্রতিদিন রিফিউজি কলোনির সামনে রহিমের হোটেল ও মিঠুর চায়ের দোকানে আড্ডা জমায়।
