বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শাহাদাত বার্ষিকী আজ বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শাহাদাত বার্ষিকী আজ - ajkerparibartan.com
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শাহাদাত বার্ষিকী আজ

3:49 pm , December 13, 2025

বিশেষ প্রতিবেদক ॥  মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী বীরশ্রেষ্ঠ ক্যপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শাহাদাত বার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এইদিনে মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের চাপাইনবাবগঞ্জ দখল করতে গিয়ে পাক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের সাথে সম্মুখ সমরে কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। বরিশালের বাবুগঞ্জের আগরপুর ইউনিয়নের রহিমগঞ্জ গ্রামে ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। মা মোসাম্মাৎ সাফিয়া  বেগম আর পিতা আবদুল মোতালেব হাওলাদারের ৩ ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে মহিউদ্দিন মেজ। এলাকার প্রভাবশালী ও সম্মানিত আবদুর রহিমের নামেই রহিমগঞ্জ গ্রাম। যার সন্তান আবদুল মোতালেব, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পিতা।
তবে মাত্র সাড়ে ৩ বছর বয়সেই মহিউদ্দিন মুলাদীর পাতারচরে মামা বাড়ীতে গিয়ে ১৯৫৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে মুলাদী মাহমুদজান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ৫ম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি লাভ করে ১৯৬৪ সালে কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্ক সহ বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
এরপরে বিমান বাহিনীতে যোগ দেয়ার চেষ্টা করেও চোখের সমস্যার কারণে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে পড়াশোনারত অবস্থায়ই মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালের ২ জুন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন।
মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর রিসালপুরের পাকিস্তান মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে অফিসার্স বেসিক কোর্স-২৯ এবং ইনফ্যান্ট্রি স্কুল অব টেকটিক্স থেকে আফিসার উইপন কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৭০-এর ৩০ আগষ্ট ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি লাভ করেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানের কারাকোরামে সোয়াত সাইদুর শরীফে পাকিস্তান-চীন মহাসড়ক নির্মানে ১৭৩ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটেলিয়নে কর্মরত ছিলেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাক সেনাবাহিনী বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকদের চোখে চোখে রাখত। এ বিশেষ নজরদারীর কারণে কোন বাঙালি সৈনিকের পক্ষে নিজেদের মধ্যে  কুশল বিনিময়ও ছিল কষ্টকর।
কিন্ত ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে নিরীহ মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছে এবং নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে’ খবরটি জানার পরে ক্যপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। মনে মনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার পথ খুঁজছিলেন তিনি। এ অবস্থায় প্রায় ৩ মাস পরে ক্যাপ্টেন আবদুল আজিজ পাশা, ক্যাপ্টেন আনাম, ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার রশিদ খানের সাথে তার যোগাযোযোগ হয়।
সবাই মিলে পাকিস্তান থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে ১৯৭১-এর ৩ জুলাই শিয়ালকোট থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরে মুনওয়ার তাবী নদীর ওপর ‘মারালা হেডওয়ার্ক’ নামের বাঁধ পেরিয়ে শহরের একটি হোটেলে ওঠেন। সেখান একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে টিলার ওপর এক দরগায় যান জিয়ারতের উদ্দেশ্যে।
সেখানে ট্যাক্সি ছেড়ে দিলেও তারা টিলার ওপর না উঠে নিচে মাগরিব এর নামাজ আদায় করে মিলিশিয়াদের কালো পোশাক ও সালোয়ার-কামিজ পরে নিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে অনিশ্চয়তার পথে নেমে পড়েন। পুরো শিয়ালকোটজুড়ে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে যাত্রাপথে পাক রেঞ্জারদের একটি ক্যাম্পের কাছে এসে এক জলাশয়ে শুধু নাক বের করে ঘাপটি মেরে থাকেন। রাত ১টার দিকে মুনওয়ার তাবী নদীর ধারে পৌঁছলেও সে নদী অতিক্রম করে ওপারের ভারতে পৌঁছা ছিল কঠিন। কারন প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে প্রশস্ত  ও তীব্র খর¯্রােতা ঐ নদী পার হবার কোন উপায় ছিলনা।
কিন্তু নদী-খালের দেশের মানুষ হয়ে তারা এ বধিা মানবেন কেন। নদীর কিনারা ধরে উজানে হাটতে শুরু করলেন।  কিছুদুর যেতেই অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ ও অনেকটা কম প্রশস্ত জায়গা পেয়ে প্রবল ¯্রােতের মধ্যেই ঝাপিয়ে পড়েন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সহ অপর ৪ জন। প্রবল বর্ষণ আর নদীর তীব্র ¯্রােতের সাথে লড়াই করে রাত ৩টার দিকে নদী পার হয়ে ভারতের মাটিতে পা রেখে কাছাকাছি বিএসএফ’র একটি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে এসে হাজির হন ৫ ক্যাপ্টেন। সেখান থেকে দিল্লী হয়ে পরে কোলকাতা চলে আসেন সবাই।
মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সহ ৫ ক্যাপ্টেন কোলকাতায় পৌঁছার পরে মুক্তিযোদ্ধা সহ প্রবাসী সরকারের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। খোদ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসামানী রনাঙ্গন থেকে কোলকাতায় ফিরে এসে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
কোলকাতা থেকেই এ ৫ ক্যাপ্টেনকে পাঁচটি সেক্টরে পাঠান হয়। ক্যপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে ৭ নম্বর সেক্টরের মেহেদিপুর ক্যাম্পে পাঠান হয়। চাপাই নবাবগঞ্জ জেলার পাশে মহানন্দা নদীর পশ্চিমপাড়ে ভারতের মালদহ জেলার মেহেদিপুর ক্যাম্পের দায়িত্ব নিয়ে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ৭ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার লে.কর্ণেল নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব পেয়ে খুবই দক্ষতা ও অধ্যবসায়য়ের পরিচয় দেন। এমনকি অনেক ভারতীয় জেনারেলও সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করেছেন।
১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সব ফ্রন্টে দখলদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে ৭ নম্বর সেক্টরের মেহেদিপুর ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর দায়িত্ব আসে চাপাইনবাবগঞ্জ দখলের। লে: কাইয়ুম ও আউয়াল সহ ৫০ জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ডিসেম্বরের ১০ তারিখে চাপাইনবাবগঞ্জের পশ্চিমে বারঘরিয়ায় অবস্থান নেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী ১১ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর ওপর আর্টিলারী গোলাবর্ষণের কথা ছিল। যাতে পাক বাহিনী অপ্রস্তুত ও বিভ্রান্ত হয়ে ভীত হয়। ভারতীয় এরিয়া কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার প্রেম সিং’র সাথে ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডের আগে থেকেই এ সংক্রান্ত সব পরিকল্পনা চুড়ান্ত ছিল।
কিন্তু পরিকল্পনা মাফিক ১১ ডিসেম্বরর ভোরে ভারতীয় বাহিনী কোন গোলাবর্ষণ করেনি। উপায় না দেখে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন বার বার বারই ভারতীয় বাহিনীর সাথে ওয়ারলেসে যোগোযোগের চেষ্টা করতে থাকেন। ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত যোগাযোগের সর্বাত্মক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন জাহাঙ্গীর। ভারতীয় পক্ষ থেকে কোন সাড়াই মেলেনি।
কিন্তু ফিরে যাবারও কোন উপায় ছিলনা। তিনি দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতীয় বাহিনীর সহায়তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধারাই আক্রমন শুরু করবে। তিনি সঙ্গী সব যোদ্ধাকে ডেকে কে কে তার সাথে সম্মুখ সমরে যেতে রাজী আছে জানতে চাইলেন। ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা তার সাথে যেতে রাজী হলেন। তাদের নিয়েই ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মহান্দার ওপারে বারঘরিয়া থেকে অভিযানে নামলেন। কনকনে ঠান্ডায় রেহাইরচর থেকে পায়ে হেটেই মহানন্দা নদী পার হয়ে উত্তর দিক থেকে একটি একটি করে পাক বাঙ্কারে হামলা চালিয়ে গুলির পরিবর্তে বেয়ানট দিয়ে শত্রু খতম করে দক্ষিণে এগুতে লাগলেন। যাতে দক্ষিণের বাঙ্কারের পাক সেনারা টের না পায়, তাই তিনি গুলির পরিবর্তে বেয়ানট দিয়েই শত্রু শেষ করে দক্ষিণে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
সম্মুখ ও হাতাহাতি যুদ্ধ তীব্র আকার ধারন করলেও শেষ রাতের এ অতর্কিত হামলার ব্যাপারে পাক বাহিনী মোটেই প্রস্তুত ছিলনা। ফলে সফলতাও আসছিল। মাত্র কয়েকটি বাঙ্কার দখল তখন বাকি। কিন্তু বাঁধের ওপর অবস্থান নেয়া পাক সিভিল আর্মড ফোর্সের কয়েকজন সেনা ও রাজাকাররা বিষয়টি টের পেয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ প্রতি আক্রমনেও তিনি বিচলিত হননি। দমে যাননি একটুকুও।
কিন্তু বিজয় যখন চুড়ান্ত পর্যায়ে, তখনই আকষ্মিক একটি গুলি এসে বিধল বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কপালে। সাথে সাথে তিনি লুটিয়ে পড়লেন বাঙ্কারের মধ্যেই।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT