3:49 pm , December 13, 2025
বধভূমির টর্চার সেলে অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারন মানুষ হত্যা করে খালে ফেলা হয়
সালেহ টিটু ॥ স্বাধীনতা ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বধ্যভূমির কথা শুনলে গাঁ শিউরে ওঠে। বধভূমির টর্চার সেলে অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারন মানুষ হত্যা করে খালে ফেলা হয়। পাক বাহিনীর হাতে ধর্ষিত হয়েছে অসংখ্য মা-বোন। হত্যাযজ্ঞ এবং নারী নির্যাতনের সাক্ষী হয়ে আছে টর্চার সেলের কাজে ব্যবহৃত দুটি দ্বিতল ভবন, ব্রিজ এবং সাগরদীর খালের একাংশ। এ জন্য বরিশাল নগরীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে ওয়াপদা কলোনীতে পাকিস্তানী বাহিনী গড়ে তোলে মিনি ক্যান্টনমেন্ট। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বধ্যভূমি সংষ্কার করা হলেও ৫ আগস্ট পরিবর্তী ভাংচুরের পর আজও সংষ্কারের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বধ্যভূমির একটি ভবনে ১৯দিন আটক থাকা বীরমুক্তিযোদ্ধা এএমজি কবির ভুলু বলেন, মুক্তিকামী মানুষদের বধ্যভূমির একটি ভবনে আটকে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। এদের মধ্যে যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তাদেরকে হত্যা করা হতো। এছাড়া অপর ভবনে নারীদের রেখে তাদের উপর চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। নির্যাতিত নারীরা যাতে আত্মহত্যা করতে না পারে এ জন্য তাদের কোন কাপড় দেয়া হতো না। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় রাখা হতো। বীরমুক্তিযোদ্ধা ভুলু বলেন, ওই সময় তিনি ছাত্র ছিলেন। তাকে আটক করে ওয়াপদা কলোনীর বধ্যভূমির একটি ভবনে নেয়া হয়। এরপর তার উপর চালানো হয় নির্যাতন। তার সাথে আরো দুইজন ছিলেন। তাদের মধ্যে একজনকে ব্রিজের উপর দাঁড় করিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলা হয় ব্রিজের নীচে সাগরদী খালে।
অপর একজন এবং ভুলুকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পরদিন মেজরের সামনে নেয়া হলে তিনি (ভুলু) তাকে বসতে বলেন। কিন্তু এর পূর্বে যারাই তার সামনে বসেছে তাদেরকে পিস্তলের বাটের আঘাতে নাক রক্তাক্ত করে মেজর। বিষয়টি তার জানা থাকায় তিনি মেজরের সামনে বসেননি। এক পর্যায়ে তাকে সেখান থেকে অপর একটি কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে খাবার থেকে শুরু করে মানসিক, শারীরিক সব ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনে তার একটি কানের পর্দা ফেটে যায়। সেখান থেকে রক্ত বের হওয়া শুরু করে। এ সময় অগনিত মুক্তিকামী মানুষকে এ ধররনের নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছেন।
তার সাথে আনোয়ার নামের এক ব্যক্তি ছিল। তাদের একটি কাপড়ের নীচে ঢেকে রাখা হয়। সেখান থেকে কোনভাবেই বের করা নিষেধ ছিল। পরবর্তীতে আনোয়ারকে না দেখে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পান আনোয়ারের দুই হাত ও দুই পা ধরে খালে ফেলে দেয়া হচ্ছে। দেখার সাথে সাথে চোখ দিয়ে অশ্রু বের হতে থাকে। কিন্তু কোন প্রতিবাদের ভাষা তার ছিলো না। এরপর পাকিস্তানী সৈন্যরা কাপড় তুলে বলে ‘ও তো মরে নাই’। এ বলে চলে যায়। এরপর যেই আসতো সেই হয় লাথি, না হয় ঘুষি, না হয় লাঠি দিয়ে শুরু হতো নির্যাতন। মনে হতো এটা তাদের একটা ডিউটির মধ্যে পড়েছে। সেখানে অবস্থানরত ১৯ দিন কমবেশী নির্যাতন চালানো হয়েছে তার উপর। সেখানে অবস্থানরত অবস্থায় তার কানে পুঁজ এসে যায়। এমনকি একটি চোখে কম দেখা শুরু করেন। ১৯দিন থাকাবস্থায় তিনি জানতে পারেন শুক্কুর নামের এক ব্যক্তিকে পাথরচাপায় হত্যা করা হয়। এ্যাডভোকেট সুজিত চক্রবর্তীসহ দুইজনকে বধ্যভূমি সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে নিয়ে গুলি করে। সুজিত হত্যাকান্ডের শিকার হলেও গৌরাঙ্গ গুলি করার পূর্বেই নদীতে ঝাপ দিলে এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ে পাকিস্তানী সেনারা। গৌরাঙ্গ সেখান থেকে বেঁচে যান। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ভুলু। বীরমুক্তিযোদ্ধা ভুলু বলেন, পাকিস্তানী বাহিনী ওয়াপদা কলোনী মিনি ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে গড়ে তোলে। বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিকামী মানুষদের ধরে আনা হতো। এরপর কলোনীর পিছনে সাগরদী খালের উপর থাকা ব্রিজের উপর দাঁড় করিয়ে এলোপাথাড়ি গুলিতে হত্যা করে লাশ ফেলা হতো খালে। তার দাবি-ওই ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়। যার সাক্ষী নির্যাতনে ব্যবহৃত দুইটি ভবন, ব্রিজ এবং সাগরদী খালের একাংশ। তিনি আরো বলেন, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার খাল সংলগ্ন দ্বিতল দুইটি ভবন ব্যবহার করতো পাকিস্তানী সৈন্যরা। সেখানে ৩টি বাঙ্কারও বানানো হয়। ভবনের একটিতে পুরুষ এবং অপরটিতে নারীদের রাখা হতো। তিনি অবস্থানকালে অগনিত নারীর আর্তনাদ তার কানে এসেছে। এ সময় বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন নারীদের পাশবিক নির্যাতন করে কাপড় ব্যবহার করতে দেয়া হতো না। এমনকি তাদেরকে যে কক্ষে রাখা হতো সেখানে কোন ধরনের কাপড় এবং দঁড়ি জাতীয় কিছুই রাখতো না। তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ থাকতো। বেশীরভাগ নারীদের হত্যা করে লাশ ফেলা হয় খালে। বীরমুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মানিক বলেন, বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলে ওয়াপদা কলোনির মতো এত বড় নির্যাতন ক্যাম্প ও বধ্যভূমি আর কোথাও ছিলো না। এই ক্যাম্প থেকেই ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও ভোলায় অপারেশন চালাত পাকিস্তানি বাহিনী। ওয়াপদা কলোনিতে নিয়ে কত মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। এদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সহযোগিতায় একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার স্মৃতিবহ এলাকা ওয়াপদা কলোনি। এরমধ্যে রয়েছে নির্যাতন ক্যাম্প, বাঙ্কার, বধ্যভূমি, সেতু ও লাশ ভাসিয়ে দেওয়া সাগরদী খাল। শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেতুর ওপর নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘৭১। দেড় একর জায়গার ওপর সংরক্ষিত পুরো প্রকল্পের সার্বিক নকশা প্রণয়ন করা হয়। প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বধ্যভূমি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় ওয়াকওয়ে, স্মৃতিস্তম্ভ, বসার স্থান, প্লাজা, স্বজনদের স্মৃতিকথার গ্যালারি এবং নির্যাতনের আবহ সৃষ্টিকারী সাউন্ড সিস্টেম। সংরক্ষণ করা হয় দুটি টর্চার সেল ও একটি বাঙ্কার। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মিত বাঙ্কার শুধু বরিশালেই আছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। একটি বাঙ্কারসহ দুটি টর্চার সেল ও সাগরদী খালে যে সেতুটির ওপর নিয়ে গণহত্যা চালানো হতো সেটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্মৃতি করিডোরে স্বজনদের বেদনার্ত বক্তব্য তুলে ধরা হয় এবং সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা যাতে নির্যাতন-গণহত্যার ভয়াল আবহ উপলব্ধি করতে পারেন তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টে পরবর্তী ভাংচুরের কারনে এখন অযতœ আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে বধ্যভূমিটির স্মৃতি। ২০২০ সালে ৮ ডিসেম্বর এ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছিল। বীরমুক্তিযোদ্ধা এবায়েদুল হক চাঁন, নুরুল আলম ফরিদ ও ইসরাইল পন্ডিত বাংলা বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তীতে সেখানে ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয়। সেই থেকে বধ্যভূমি অবহেলায় পড়ে রয়েছে। তারা দ্রুত সংষ্কার করে বর্তমান প্রজন্মকে-৭১ এর ইতিহাস জানার সুযোগ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এ ব্যাপারে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই ওয়াপদা কলোনীর বধ্যভূমির সংষ্কার কাজ শুরু করা হবে।
