3:41 pm , December 6, 2025
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ গ্রামীণ জনপদ থেকে সুস্থ হতে বরিশাল নগরীতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে এসে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন সাধারন রোগীরা। একটি দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে ওই সকল রোগীদের জিম্মি করে দালাল সর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে নামমাত্র চিকিৎসা দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই দালাল চক্রটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকেই এ ধরনের কর্মকান্ড পরিচালনা করায় তারা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিএনপির এক নেতার ছত্রছায়ায় নগরীর রুপাতলীর দালাল শহিদ এ কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে। আর শহিদের নেতৃত্বে রয়েছে ১০ থেকে ১২ জনের দালাল চক্র। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অসহায় রোগীদের পাঠিয়ে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হলেও কোনভাবেই তাদের দমানো যাচ্ছে না। কারন পিছনে কলকাঠী নাড়ছে এক বিএনপি নেতা। দালাল চক্রের হোতা
শহিদের হুশিয়ারী ওই নেতাকে মাসে দেড় লাখ টাকার বেশী দিয়ে এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছে। হিজলার বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুদ অভিযোগ করেন, তার বৃদ্ধ বাবা-মা দুজনেই খুব অসুস্থ্। কোনভাবে টাকার জোগার করতে না পেরে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নগরীতে আসেন তাদের চিকিৎসার জন্য। এমনকি এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ জন্য নগরীতে এসে একটি ভ্যান নিয়ে বাংলাবাজার এলাকার একটি নামিদামি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হন। পথিমধ্যে এক রিকশাচালক তাদের গতিরোধ করেন। এরপর মিষ্টি কথার জালে তাদের ফাঁসিয়ে ফেলেন। ওই রিকশাচালকের কথা শুনে সদর রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে আসেন। সেখানে আসার সাথে পর পরীক্ষা-নীরিক্ষার নাম করে তাদের কাছ থেকে ১২ হাজার ৬শ’ টাকা নেয়া হয়। এরপর সেখানে বসিয়ে রেখে বিকালে ওষুধ লিখে ছেড়ে দেন। এ সময় চিকিৎসকের ব্যবহারেও তিনি মুগ্ধ হন। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে সকল ঘটনা যখন তার স্বজনদের জানান তারা বুঝতে পারেন তিনি দালালের খপ্পড়ে পড়েছেন। এরপর তাদের দেয়া ওষুধ খেতেও নিষেধ করেন। পরবর্তীতে যে আবার টাকা নিয়ে নগরীতে যাবেন বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য সেই টাকা তার কাছে ছিল না। এ জন্য ওই ঋণ পরিশোধ করে আবার ঋণ উত্তোলন করে তারপর আসতে হবে। ওই সময় পর্যন্ত তার বাবা-মা বাঁচবে কিনা তা আল্লাহ ভালো জানেন বলে দীর্ঘনি:শ্বাস ছাড়েন অভিযোগকারী। এ ধরনের অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে সরেজমিন ঘুরে।
পটুয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা আব্দুস সালাম বলেন, তার মেয়ের চিকিৎসার জন্য একটি ছাগল বিক্রি করে বরিশাল নগরীতে আসেন চিকিৎসার জন্য। রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডে আসার সাথে সাথে তিনি দালাল চক্রের হাতে পড়েন। সেখান থেকে তাকে সদর রোডস্থ একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পরীক্ষা-নীরিক্ষার নাম করে তার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা নেয়া হয়। এ সময় কম নেয়ার জন্য অনুনয়বিনয় করলেও কাজ হয়নি। তার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বাড়িতে ফেরার পর তিনি বুঝতে পারেন দালালের খপ্পড়ে পড়েছেন। দ্বিতীয়বার টাকার জোগার করে একজন ভালো চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। ওই সময়ও দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়েছিলেন। পুলিশের ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে রক্ষা পান তিনি।
কুয়াকাটা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আশারাফ বলেন, তিনিও দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়েছিলেন। এরপর কোতোয়ালী থানায় গিয়ে অভিযোগ দেয়ার পর পুলিশ দালাল চক্রের কাছ থেকে টাকা আদায় করে দেন। ওই টাকা নিয়ে ভালো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এ ধরনের অভিযোগের যেন শেষ নেই।
দালালের মূল হোতা শহিদের সদস্যরা নগরীর লঞ্চঘাট থেকে শুরু করে স্পিডবোটঘাট এবং নগরীর নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডে রয়েছে। আবার এসব সদস্যদের মাধ্যমে রিকশাচালক, সিএনজিচালক এবং ছোট যানবাহনের চালকরা অসহায় রোগীদের দালালদের কাছে এনে দেয়ার কাজ করে। এ জন্য রোগী বাবদ তাদের টাকা দেয়া হয়। যাত্রী টানার চেয়ে বেশী টাকা আয় হওয়ায় অনেকেই এ দালাল চক্রের ফাঁদে পা দিয়েছে। দালাল চক্রে রয়েছে মহিলা সদস্যও। এমনকি নামিদামী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মচারীরাও এ দালাল চক্রের সাথে জড়িত।
গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ওই দালাল চক্র বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে উপজেলা হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারী এবং গ্রাম্য চিকিৎসকরা এর সদস্য। তারা রোগী পাঠিয়ে তাদের হিস্যা বুঝে নেন। অনেক দালাল আবার গ্রাম থেকে রোগীর সাথে চলে আসেন। এরপর টাকার ভাগ নিয়ে চলে যান।
এদিকে দালাল শহিদ দম্ভোক্তি নিয়ে তার সদস্যদের জানিয়েছে, ‘প্রতিদিন ৬ হাজার টাকা করে দিতে হয় এক বিএনপি নেতার অফিস সহকারীকে। এতে তাকে মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা গুনতে হয়। মাস ৩১ দিনে হলে আরো ছয় হাজার টাকা যোগ করতে হয়। একদিনের টাকা বকেয়া থাকলে ওই রাতে নেতা মোবাইল করে টাকা না দেয়ার কারন জিজ্ঞাসা করে বলেন ‘কোন কিছু শোনার সময় নেই দ্রুত টাকা দিয়ে আয়’। সে বলার সাথে সাথে ধার করে হলেও ওই টাকা দিয়ে আসতে হয়। শহিদ ওই সময় বিএনপি নেতা এবং তার অফিস সহকারি নামও উচ্চারন করেছে। যার রেকর্ড এ প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন সূত্র থেকে জানা গেছে, অসহায় রোগীদের ওই সকল দালাল চক্রের কাছ থেকে রক্ষায় অভিযান পরিচালিত হয়। তাদের আটক করে জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের দন্ড দেয়া হয়। এমনকি নাম সর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা পর্যন্ত করে দেয়া হয়।
কোতোয়ালী থানা সূত্র থেকে জানা গেছে, ওই দালাল চক্রের কারনে প্রায়ই অসহায় রোগীর স্বজনরা আসেন তাদের কাছে বিচার দিতে। ওই সকল দালাল চক্র নির্ভর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লোকজন ধরে এনে তাদের টাকা উদ্ধার করে দেয়া হয়। তবে এর জন্য কঠোর আইন না থাকায় দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তেমন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। একমাত্র প্রতারণার মামলা ছাড়া অন্য কোন মামলায় তাদের দেয়া যায় না বলে জানান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেন ‘এর সাথে তাদের সদস্যরাও জড়িত।
এ ব্যাপারে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল ও সিভিল সার্জন ডা. এসএম মনজুর ই এলাহী বলেন, দালাল চক্রটি ভাইরাসের মত আকড়ে ধরেছে। এর মূল উৎপাটনের চেষ্টা চলছে। এ জন্য প্রয়োজন বেশী বেশী অভিযান পরিচালনার। কিন্তু জেলা প্রশাসনে ম্যাজিস্ট্রেট স্বল্পতার কারনে এ অভিযান পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হয়। জেলা প্রশাসনের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। সেখান থেকে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়ার পর অভিযান চালানো হয়। প্রয়োজন ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনায় স্ব-স্ব দপ্তরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া।
