4:20 pm , November 18, 2025
জসিম জিয়া ॥ ৬ষ্ঠ বারের মত বরিশাল সদর আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক হুইপ ও বিএনপি চেয়ারপার্সন এর উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নামেননি মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, এবায়েদুল হক চাঁন ও আফরোজা খানম নাসরিন। এ প্রসঙ্গে চাঁনের ভাষ্য-এই তালিকা প্রথমিক। এখনো চূড়ান্ত তালিকা আসেনি। সুতরাং তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে এখনো আশাবাদী। তবে শেষ পর্যন্ত যদি সরোয়ারকেই প্রার্থী করা হয় তাহলে তিনি (চাঁন) সবার আগে থাকবেন। অর্থ্যাৎ দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে মাঠে কাজ করবেন। প্রায় একই কথা বলেছেন অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে তাদের এমন অবস্থান কে খুব ভালভাবে দেখছেন না নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তারা বলছেন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া মানেই ধানের শীষের বারোটা বাজানো। বিএনপির দুর্গে এভাবে অনৈক্য থাকলে এ সুযোগটা নেবে জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন।
এমন অবস্থা যে শুধু বরিশাল সদর আসনে তা কিন্তু নয়। বিভাগের অধিকাংশ আসনেই প্রার্থী ঘোষনার পর থেকেই বিভেদ শুরু হয়েছে। ৩ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর কর্তৃক ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষনার পর শুরু হয়েছে নিজেদের মধ্যে কোন্দল। অনেক এলাকায় হয়েছে দফায় দফায় সংঘর্ষ। বরিশালের ২১ আসনে সংঘাত না হলেও থেমে নেই বাগযুদ্ধ। একে অপরের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট দেওয়ার পাশাপাশি সমর্থকরা প্রার্থীতা বাতিলের আবেদন জানিয়ে বিক্ষোভ এবং সংবাদ সম্মেলন করছেন। মিডিয়ায় দিচ্ছেন বিভিন্ন ধরণের বিবৃতি। হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৪ আসে মনোনয়ন পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান। এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সাবেক এমপি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদ। কিন্তু তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অথচ ফরহাদ বিএনপির দুর্দীনের কান্ডারী। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথমবার মনোনয়ন পেয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ২৯টি আসনে জয়ী হয়েছিলো। এরমধ্যে বরিশালের ২১ আসনের মধ্যে দুটিতে জিতেছিলো বিএনপি। এর একটি উপহার দিয়েছিলেন মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদ। সবার ধারণা ছিলো তিনি যেহেতু ভরাডুবির আমলে আসনটি উপহার দিয়েছেন সেক্ষেত্রে এবার সবার আগে অগ্রাধিকার পাবেন মনোনয়নের ক্ষেত্রে। দলীয় টিকিট না পাওয়ায় মেজবাহ ফরহাদের পাশাপাশি তার সমর্থকরাও হতাশ। প্রার্থী ঘোষণার পর তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন-চূড়ান্ত তালিকা আসার পরে তিনি নির্র্বাচনে মাঠে নামবেন। এ ক্ষেত্রে যদি শেষ পর্যন্ত রাজীব আহসানকে রাখা হয় তাহলে তার পক্ষেই তিনি কাজ করবেন, এর আগে না।
গৌরনদী-আগৈলঝাড়া নিয়ে গঠিত বরিশাল-১ আসনেও বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি জহির উদ্দীন স্বপন। কিন্তু তাকে মানেন না অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। প্রার্থী ঘোষনার পর জহির উদ্দীন স্বপন অপর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাথে ওইভাবে যোগাযোগ করেননি যেমনটা নির্দেশনা ছিলো দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানে। এ প্রসঙ্গে আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন- জহির উদ্দীন স্বপন আমাকে ফোন করলো কি করলো না সেটা বিবেচ্য বিষয় না। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেই নির্দেশনা আমার কাছে মুখ্য বিষয়। ধানের শীষকে বিজয়ী করতে যা যা করা দরকার সবই আমি করবো। এদিকে গত সোমবার ইঞ্জিনিয়ার সোবাহানপন্থিরা সংবাদ সম্মেলন করে জহির উদ্দীন স্বপনকে বাদ দেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। এ সময় তারা জহির উদ্দীন স্বপনকে সংষ্কারপন্থি আখ্যা দিয়ে তার প্রার্থীতা বাতিলের দাবী জানান তারেক রহমানের কাছে।
সদর ও নলছিটি উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝালকাঠী-২ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। কিন্তু তাকে মানেন না অপর তিন মনোনয়ন প্রত্যাশী। এরা হলেন : বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ভিপি মাহবুবুল হক নান্নু, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য জিবা আমিনা আল গাজী এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাহাদাৎ হোসেন। মনোনয়ন প্রশ্নে বঞ্চিত তিন প্রার্থী একাট্টা হয়েছেন। তারা নিজেদের মত করে প্রচার-প্রচারনা চালাচ্ছেন সংসদীয় এলাকায়। তাদের দাবী-যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি ২০০৮ সালের পর এলাকায় ভেড়েননি। খোঁজ নেননি নেতাকর্মীদের।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু বলেন- আসলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ইলেন ভুট্টোকে মানতে পারছেন না। কারণ তিনি দলের সাথে বেঈমানী করেছেন। ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে তিনি এমপি হয়েছিলেন। এরপর তাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ওয়ান ইলেভেনের সময় সংষ্কারপন্থিদের কাতারে যাওয়ার পরও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি জিততে পারেননি। নেতাকর্মীদের আশা ছিলো সাবেক এমপি হিসেবে তিনি দুর্দীনে পাশে থাকবেন। অথচ ১৭ বছরে দলীয় কোন কর্মকান্ডে তার অংশগ্রহণ ছিলো না। মূলত তিনি এলাকায় জাতীয় পার্টিকে পুনর্বাসন করেছেন। এ জন্য নেতাকর্মীদের ক্ষোভ আছে।
চরফ্যাশন-মনপুরা নিয়ে গঠিত ভোলা-৪ আসনেও প্রার্থী নিয়ে দুই ধারায় বিভক্ত স্থানীয় বিএনপি। এ আসনে সাবেক তিনবারের এমপি নাজিম উদ্দীন আলমকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নকে। মনোনয়ন পাওয়ার পর নয়ন আলমের বাসায় গেলেও দেখা পাননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাজিম উদ্দীন আলম বলেছেন ‘চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণার পরে তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামবেন।
এ সব বিষয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, তফশিল ঘোষণার আগে আশা করি বিভেদ ভুলে ধানের শীষের পক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হবেন এবং বিভাগের ২১ আসনেই বিএনপি জয়লাভ করবে।
