3:39 pm , October 12, 2025
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে বরিশাল উপকূলের ৭ হাজার ৩৪৩ বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজননক্ষেত্র সহ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে ইলিশ সহ সব ধরনের মৎস্য আহরণে ২২দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এবার আইন ভাঙার উৎসব শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলেদের হামলায় একাধিক কোষ্টগার্ড ও পুলিশ সদস্য ছাড়াও মৎস্য অধিদপ্তরেরও অন্তত ১০জন কর্মী আহত হয়েছেন। অপরদিকে বরিশালেরই কালাবদর নদীতে জালফেলা নিয়ে দুই জেলে গ্রুপের সংঘর্ষে এক জেলে নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার পর রোববার সকালে তার মরদেরহ ভেসে উঠে। জেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পুলিশ সহ কোষ্টগার্ডের অভিযান চলমান থাকার মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদ-নদীতে জাল ফেলা সহ আইন না মানার প্রতিযোগীতা চলছে।
বরিশালের হিজলা,মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী সহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধে আইনশৃঙ্খরা বাহিনীর কঠোর নজরদারীর মধ্যেই আইন ভাঙার প্রবনতাও অব্যাহত রয়েছে।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে নিরাপদ প্রজনন নির্বিঘœ করতে ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে বরিশাল উপকূলের ৭ হাজার ৩৪৩ বর্গ কিলোমিটারে সব ধরনের মৎস্য আহরণ সহ সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ২৫ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞাকালে দেশের কোন নদ-নদীতে ইলিশ জাল ফেলতে পারবেন না জেলেরা। আর উপকূলের মূল প্রজনন এলাকায় সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ ।
আর এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পুলিশ, নৌ পুলিশ, র্যাব, কোষ্টগার্ড এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনী অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নদ-নদী এবং উপকূলভাগে নজরদারী সহ অভিযান পরিচালনা করছে। এলক্ষ্যে বিভাগ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করছে। ২২ দিন আহরণ ও বিপণন নিষিদ্ধকালীন সময়ে প্রশাসনের সহায়তায় সব ইলিশ মোকাম ছাড়াও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, বাজার এবং আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী অব্যাহত রয়েছে ।
মৎস্য অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ৪ অক্টোবর থেকে ১১ অক্টোবর রাত পর্যন্ত বরিশাল উপকূলে প্রায় ৪শটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় পৌনে ৪শ জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও সহশ্রাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ইলিশ আহরন বন্ধে। এসময়ে অবৈধভাবে ইলিশ আহরনের দায়ে প্রায় ৫শ মামলা দায়ের ছাড়াও প্রায় ১১ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করেছে ভ্রাম্যমান আদালত।
পাশাপাশি মৎস্য অধিধপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও গঠিত টাস্কফোর্স প্রায় ৫শ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, প্রায় ২ হাজার মাছঘাট, তিনহাজার আড়ত ও ২ হাজারের মত বাজার পরিদর্শন করেছে । এসময়ে দেড় সহ¯্রাধিক টন ইলিশ মাছ আটক করে বিভিন্ন মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৩০ হাজার মিটার জাল আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অভিযানকালে আটককৃত জেলে নৌকা সহ অন্যান্য মৎস্য আহরণ, উপকরন বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রী করে দেয়া হয়েছে।
কিন্তু এর পরেও অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ বন্ধ হচ্ছেনা। এবার ইলিশ আহরণে মরিয়া একশ্রেণীর জেলে। কারণ হিসেবে ইলিশের অত্যাধিক দামকে দুষছেন অনেকে। এক কেজি সাইজের একটি ইলিশ ধরতে পারলেই ২ হাজার থেকে ২৫শ টাকা ঘরে উঠবে।
অথচ এবারো ২২ দিন ইলিশ আহরণে বিরত বিশাল জেলে সম্প্রদায়ের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকার ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০টি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে ১৫ হাজার টন চাল দিয়েছে। এরমধ্যে শুধু বরিশাল উপকূলের ৩.৪০ লাখ জেলে পরিবারের জন্য সাড়ে ৮ হাজার টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জাতীয় মাছ ইলিশের একক অবদান এখন ১%-এর বেশী। আর মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২%। দেশে আহরিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০%-ই বরিশাল বিভাগের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় এলাকায় আহরিত হচ্ছে।
‘হিলশা ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্লান’এর আওতায় ২০০৫ সালে প্রথম প্রধান প্রজনন মৌসুমে উপকুলে ১০ দিন ইলিশের আহরণ বন্ধ রাখা হয়। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে ২০১১ সালে তা ১১ দিন এবং ২০১৫ সালে ১৫ দিন ও ২০১৬ সালে থেকে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়েছে।
