বরিশালের আমড়া দেশ ছাড়িয়ে উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে বরিশালের আমড়া দেশ ছাড়িয়ে উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে - ajkerparibartan.com
বরিশালের আমড়া দেশ ছাড়িয়ে উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে

3:22 pm , October 9, 2025

বিশেষ প্রতিবেদক ॥  রোগ প্রতিরোধ ও প্রচুর ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল আমড়া বরিশাল অঞ্চলের কৃষি ও কৃষিযোদ্ধাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে সমৃদ্ধ করছে। টক-মিষ্টি মিশ্রনে ভিন্ন স্বাদের বরিশালের আমড়ার খ্যাতি দেশে ছাড়িয়ে এ উপমহাদেশজুড়ে। সম্প্রতি সরকার আমড়াকে ‘জিআই পণ্য’ হিসেবেও স্বিকৃতি দিয়েছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী ভারতের আগরতলা, কোলকাতা এবং আসাম ও মেঘালয়ের বিভিন্ন এলাকায়ও বরিশালের আমড়ার যথেষ্ঠ কদর রয়েছে। এসব এলাকায় রপ্তানী পণ্য হিসেবে না হলেও নানুষ্ঠানিকভাবে বরিশালের আমড়ার বাজার তৈরী হয়েছে। এমনকি সেসব এলাকার মানুষের কাছে আমড়াই বরিশালকে ভিন্নভাবে পরিচিত করেছে। তবে এখনো  বরিশাল অঞ্চলে আমড়ার আবাদ সম্প্রসারণের সুযোগকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া যায়নি  বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়েরে কৃষিবীদরা। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বরিশাল অঞ্চলের প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে  সমাপ্ত প্রায় মৌসুমে প্রায় ২৫ হাজার টন আমড়া উৎপাদন হয়েছে। কৃষিবীদদের মতে, শুধু বরিশাল অঞ্চলেই আমড়ার আবাদ ১০ হাজার হেক্টরে উন্নীত করার মাধ্যমে এর উৎপাদনও লাখ টনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে এলক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে উদ্যোগে নেয়া হচ্ছে বলে ডিএই’র বরিশাল কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার জানিয়েছেন।
বরিশালের মাটি ও পানির জন্য এখানের আমড়া সুমিষ্ট। তাই এর কদর দেশজুড়ে। উপরিভাগ দেখলে খুব ভাল না লাগলেও এর ভেতরের অংশ যেন শিল্পীর কারুকাজ। বরিশালের রহমতপুরে ডিএই’র নার্সারী সহ এ অঞ্চলের সরকারি ও বেসরকারী নার্সারীতে এখন উন্নতমানের আমড়া চারা পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি নার্সারীর রাজধানী’ খ্যাত নেছারাবাদ ও বানারীপাড়াতেও প্রতিবছর যে কয়েক লাখ বিভিন্ন  ফলজ ও বনজ গাছের চারা ও কলম বিক্রী হচ্ছে,তারমধ্যে অন্তত ২৫ হাজার আমড়া কলম বিক্রী হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ল্যাটিন আমেরিকার স্থাণীয় ফল হলেও আমরা বাংলাদেশেও জায়গা করে নিয়েছে সুদূর অতীতকাল থেকে। রোগবালাই কম থাকায় এর উৎপাদন ব্যায়ও কিছুটা কম। ফলে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে আমড়ার দামও ভাল।  এবার বরিশালের বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি আমড়া ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকায় বিক্রী হচ্ছে। উৎপাদকরা মাঠ পর্যায়ে তা ২৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রী করছেন। দক্ষিণাঞ্চলের বৃহৎ ভাসমান হাট ভিমরুলীতে পেয়ারার মত আমড়ার পাইকারী বাজার থেকেই সারা দেশে আমড়ার চালান যাচ্ছে সড়ক ও নৌপথে।
স্থানীয় কৃষিবীদরা বরিশালকে আমড়া ও ইলিশের রাজধানী বলে থাকেন। তবে বরিশালের সন্নিহিত পিরোজপুর,ঝালকাঠী, বরগুনা এবং পটুয়ালীরও কিছু অংশজুড়ে এখন আমড়ার আবাদ হচ্ছে।
দেশে দুটি প্রজাতির আমড়া গাছের আবাদ হচ্ছে। দেশী এবং বিলাতী। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে ‘বারি আমড়া-১’ এবং বারি আমড়া-২’ নামে উচ্চ ফলনশীল ও উন্নতমানের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। নেছারাবাদের চাষীদের কাছ থেকে আদি আমড়ার জাতকে উন্নত প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে বারি আমড়া-২ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ও ‘বাউ আমড়া-১’ নামে আরেকটি জাত উদ্ভাবন করেছে।
ভিটামিন-সি এর  পাশাপাশি প্রচুর লৌহ বা আয়রন সমৃদ্ধ বরিশালের আমড়া মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রক্ত স্বল্পতা দুর করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। রক্ত স্বল্পতায় মানবদেহে নানা উপসর্গ দেখা দিয়ে থাকে। শারীরিক দুর্বলতা, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হওয়া, ঘন ঘন অসুস্থতা শরীরে রক্ত স্বল্পতার বহি:প্রকাশ ঘটায়। এমনকি রক্তের ঘাটতি শিশুদের সঠিক বৃদ্ধি সহ সুষ্ঠু মানসিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে থাকে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এসব উপসর্গ থেকে রেহাই মিলতে মানবদেহ প্রয়োজনীয় রক্তের কোন বিকল্প নেই। আর আমড়াতে যেসব খনিজ পদার্থ রয়েছে তা মানুষের শরীর ও মনের বিকাশে সহায়ক।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, আহারোপযোগী প্রতি ১শ গ্রাম অমড়ায় শর্করা ১৫ গ্রাম, আমিষ ১.১ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, খনিজ পদার্থ ০.৬ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫৫ মিলিগ্রাম, লৌহ ৩.৯ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ৮শ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি.১-১০.২৮ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ২ ০.০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি-৯২ মিলিগ্রাম এবং খাদ্যশক্তি রয়েছে ৬৬ কিলোক্যালরী। আমড়া কফ ও পিত্ত নিবারক ছাড়াও মুখে রুচি তৈরী করা এবং কন্ঠস্বরকে পরিস্কার রাখতে সাহায্য করে বলে জানিয়েছেন কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্র্তা নাহিদ বিন রফিক। জ¦র,সর্দি কাশি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার জীবানুকেও প্রতিরোধ করতে আমড়া অত্যন্ত কার্যকরি বলে জানান তিনি। এছাড়া দাঁতের  গোড়া থেকে রক্ত ও পুঁজ পড়াকেও বাঁধাগ্রস্ত করে এ ফল। পাশাপাশি ব্রেন স্ট্রোক ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রনেও আমড়া যথেষ্ঠ কার্যকরি বলে ভেষজ বিজ্ঞানীরা মত প্রকাশ করেছেন।
বরিশাল অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী আমড়ার আবাদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে তা একটি রপ্তানীপণ্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদরা। আমড়া প্রক্রিয়াজাত করে সুমিষ্ট আঁচার ছাড়াও জুস  জেলী তৈরীও সম্ভব। আমড়াকে অনেকেই ‘গোল্ডেন এ্যাপেল’ বলেও ডাকেন। এ ব্যাপারে ডিএই’র বরিশাল অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, আমড়ার আবাদ সম্প্রসারণে সম্ভব সব কিছু করছি। আগামীতে এ উদ্যোগ আরো সম্প্রসারণ করারও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT