আকাশে ড্রোন ওড়ে ! জেলেদের সাথে যুদ্ধ হয় !! কিন্তু ইলিশ বাড়েনা !!! আকাশে ড্রোন ওড়ে ! জেলেদের সাথে যুদ্ধ হয় !! কিন্তু ইলিশ বাড়েনা !!! - ajkerparibartan.com
আকাশে ড্রোন ওড়ে ! জেলেদের সাথে যুদ্ধ হয় !! কিন্তু ইলিশ বাড়েনা !!!

3:43 pm , October 8, 2025

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ মা ইলিশ সংরক্ষন অভিযান চালাতে বরিশালে প্রশাসন এবার আকাশে ড্রোন উড়িয়েছে। এসব দেখে অনেকেই প্রানখুলে হেসে বলছে-আগামি বছর ইলিশ রক্ষা অভিযানে মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষন করা হবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পৃথিবীজুড়ে দেখানো হবে।
কথা হচ্ছে ইলিশ কেন্দ্রিক অভিযানের নামে মানুষ বেশ ক’বছর থেকে কমতো দেখছে না, কিন্তু লাভ কি হচ্ছে। এসব করে একটা ইলিশও বাড়ানো গেছে বলে মনে হয় না। বাজারে ইলিশ না থাকতে থাকতে ইলিশের ক্রেতাও হারিয়ে গেছে। সব পরিনত হয়েছে দর্শকে। মৎস্য বিভাগ কাগজে কলমে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে বলে মিথ্যে কথাগুলো বলেই চলছে।
বরিশালের পোর্টরোড, বেলতলা কিংবা চন্দ্রমোহন ইলিশ মোকামের কোথাও ইলিশের দেখা না থাকলেও মৎস্য অধিদপ্তর বলছে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। ইলিশ আড়তদার, পাইকার ও রপ্তানীকারকরা সবাই এ তথ্যকে অস্বীকার করে বলেছেন-বরিশালে ইলিশের উৎপাদন তলানিতে এসেছে। মাছ সংকটে ইতিমধ্যে বরিশালের ৬০% ইলিশ আড়ত বন্ধ হয়ে গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মতে বরিশালের ৯০টি নদীর সবগুলোতেই ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে। ইলিশের বড় ক্ষেত্র হিসেবে ইতিমধ্যেই হিজলা, ভোলা, হাইমচর, মেহেন্দিগঞ্জসহ মেঘনা থেকে কারখানা নদী পর্যন্ত ১৭টি স্থানকে নির্ধারিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে খাবার, উপযুক্ত পরিবেশ ও স্বাভাবিক স্রোতের প্রাপ্তি বেশি থাকায় বরিশালে ইলিশের উৎপাদন বেশি হচ্ছে।
বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারি পরিচালক জহিরুল ইসলাম জানান, বরিশাল অঞ্চলে ইলিশে ভরা স্পট ১৭টি। ইলিশের প্রজনন হয় সাগর নদীর মিলন স্থলে। সাথে রয়েছে ৫টি অভয়াশ্রম। এর পর ইলিশের বাচ্চাগুলো রক্ষার জন্য স্যালো ওয়াটার লাগবে, শিশু ইলিশের খাবার ও হালকা স্রোত দরকার হয়। এগুলোর সব কিছুই বরিশালের নদী ও মোহনায় রয়েছে বলে এখানে ইলিশের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ি গত ১০ বছরে বরিশালে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ২ হাজার টন। ১০ বছর আগে বরিশালে ইলিশের উৎপাদন যেখানে ছিলো ১ লাখ ৭০ হাজার টন সেখানে গত বছর উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন।
মৎস্য বিভাগের এমন তথ্যের সাথে সরাসরি বিরোধিতা করেছে বরিশালের পোর্টরোড, চন্দ্রমোহন ও বেলতলা ইলিশ মোকামের ব্যবসায়ি আড়তদার, পাইকার ও রপ্তানীকারকরা। তারা এমন তথ্যকে মৎস্য কর্মকর্তাদের চাকরি রক্ষাকারি মনগড়া তথ্য দাবি করে বলেছেন-ইলিশের উৎপাদন তলানীতে এসে ঠেকেছে। বরিশালের ১৬৩টি ইলিশ আড়তের মধ্যে মাছ সংকটে ১০৩টি আড়ত বন্ধ হয়ে গেছে। মহাজনরা জীবন বাঁচাতে ইলিশ ছেড়ে তরমুজসহ অন্য ব্যবসা শুরু করেছে। ইলিশ মোকামগুলোতে রীতিমত ইলিশের হাহাকার চলছে।
এক ব্যবসায়ি বলেন-৫০ বছর থেকে ইলিশের ব্যবসা করছি। ১০ হাজার টাকা যে ইলিশের মন ছিলো তা এখন এক লাখ ১০ হাজার টাকা। সেই হিসেবে দিন যত যাচ্ছে ইলিশের দাম বাড়ছে, মাছ কমছে। আগে এই মোকাম থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রাকে ইলিশ বিভিন্ন স্থানে যেতো, এখন দুই গাড়িও যায় না। এ অবস্থায় মৎস্য বিভাগের হিসেবের সাথে আমাদের বাস্তবতা মেলে না। কোথাওতো ইলিশ নেই। মৎস্য বিভাগ স্পটে না গিয়ে অফিসে বসে উৎপাদনের হিসেব কষে।অপরজন বলেন-আশির দশক থেকে মাছের আমদানি বেড়েছে। এই মোকামে প্রতিদিন ৫ হাজার মণ ইলিশ এসেছে। এখন দৈনিক ৩০-৪০ মণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে সব মোকাম মিলে। মৎস্য বিভাগ বাজারে ভীড় দেখে উৎপাদনের হিসাব করে। উনারা চাকরি বাঁচানোর জন্য মণ হিসেব দিচ্ছে।
এক আড়তদার বলেন- ‘ওরা বলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে, আমরাতো মাছ দেখছি না। আগে এই সময় আমরা এক কিংবা দেড় হাজার মণ মাছ পেতাম, এখন ৫০ মণও আসে না। ঋন নিয়ে ইলিশ ধরতে দুই কোটি টাকা দাদন দিয়েছি। বোট পাঠাই নদীতে, সাগরে, জাল ফেলে আবার টেনে শূন্য হাতে ফিরে আসে। গত একবছরে দুর্যোগের কারনে একটাও ইলিশ মৌসুম ধরতে পারিনি। এরপর আবার জাটকা , মা ইলিশের নিষেধাজ্ঞাতো আছেই।
অপরজন বলেন-এই ঘাটে তিন থেকে ৫ হাজার ইলিশ শ্রমিক ছিলো যারা ট্রলার থেকে ইলিশ নিয়ে ট্রাকে তুলতো। মাছ এতো বেশি হতো তে কাজের ভয়ে অনেক শ্রমিক পাওনা না নিয়েই পালিয়ে যেতো। যেখানে ইলিশ মোকামগুলোতে এখন কোন মাছই নেই, শ্রমিকও নেই। বরিশালের সব বাজার মিলিয়ে এখন ৫ মণ ইলিশও মিলবে না। আড়তদাররা ব্যবসা ছেড়ে বাড়িতে জমিজমার কাজ করছে, কেউ তরমুজ বিক্রি করছে। মৎস্য বিভাগের এক কর্তা বলেন-‘আমরা জানি যা একসময় বরশালে ইলিশের ছড়াছড়ি ছিলো। তখন চাহিদা ছিলো কম যার ফলে ইলিশ দৃশ্যমান ছিলো। সড়ক পথের উন্নয়ন ও সারা বিশ্বের সাথে বরিশালের যোগাযোগ ভালো হওয়ায় এই ইলিশ সারাদেশসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে। যারফলে বরিশালের ইলিশ বরিশালে দৃশ্যমান কম হচ্ছে। ইলিশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারনে গত দশ বছরে ইলিশের উৎপাদন ২ লাখ টন বেড়ে এখন বছরে ৩ লাখ ৭২ হাজার টনে এসে পৌছেছে। সবার আন্তরিকতায় এটা সম্ভব হয়েছে।
নিখুত বাস্তবতা হলো-নদীতে ইলিশ নেই। বরিশাল অঞ্চলে জাটকা সংরক্ষন হচ্ছে না। জাটকা মারলে ইলিশ বাঁচানো যায়না। বরিশাল অঞ্চলে জাটকা মারার সাথে সবাই জড়িত। জাটকা এবং ইলিশ রক্ষায় যে অভিযান চালানো হয় তা আরো একটা ব্যায়বহুল শো-ডাউন ছাড়া আর কিছুই নয়। দিনে ড্রোন শো আর রাতে মাছ মারার গপ্প নতুন সযোজন মাত্র। জেলেদের ধরে জেলে ভরেও এ সমস্যার সমাধান হবে না। মাত্র একটি বছর যদি জাটকা সংরক্ষন করা যায় তাহলে পরের বছর ইলিশ পাবার কথা চিন্তা করা যায়। এখন যে অবস্থা তাতে শিঘ্রই ইলিশ ক্যালেন্ডারে শোভা পাবে। প্রজন্মকে ক্যালেন্ডারের ইলিশ দেখিয়ে বলতে হবে, ‘অনেক অনেক দিন আগের কথা, তখন আমাদের নদীতে ইলিশ নামের খুব সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেতো যা দেখতে ঠিক ক্যালেন্ডারের এই মাছটার মতো ছিলো”।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT