4:21 pm , August 16, 2025
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বছরের প্রথমভাগে অব্যাহত অনাবৃষ্টির পরে আষাঢ়-শ্রাবনের অতিবর্ষণে দু’দফায় বীজতলার ক্ষতির পর প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলের মাঠে মাঠে এখন আমন রোপনে ব্যস্ত কৃষকরা। এবার চলতি খরিফ-২ মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ হেক্টরে আমন আবাদের মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল পাবার লক্ষ্যে মাঠে মাঠে কৃষকদের জমি তৈরী ও রোপন সহ নানামুখি পরিচর্যা এখন চোখে পড়ার মত। তবে ভরা বর্ষার আষাঢ়-শ্রাবনে অতি বৃষ্টির পরে ভাদ্রের বড় অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার বিষয়টি মাথায় রেখেইে সতর্কতার সাথে এগুচ্ছে বরিশালের কৃষিযোদ্ধারা। সারাদেশে বোরো একক প্রধান দানাদার খাদ্য ফসল হলেও বরিশাল অঞ্চলে এখনো আমন প্রধান ফসল। যদিও এ অঞ্চলে বোরো আবাদ ক্রমে সম্প্রসারিত হলেও আমনকে ঘিরেই কৃষক সহ দাদনদাতা এবং কৃষিঋন প্রদানকারী ব্যাংকগুলো সহ কৃষি-অর্থনীতির সব কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে থাকে।
তবে বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাই এখনো পরিপূর্ণভাবে প্রকৃতি নির্ভর। বৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, প্লাবন সহ তাপমাত্রার পারদ ওঠানামা এবং কুয়াশার সাথে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত বছর মূল বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক অনাবৃষ্টির পরে অক্টোবরের ঘূর্ণিঝড় দানায় ভর করে বরিশাল সহ উপকূলভাগে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের পরে গত এপ্রিল পর্যন্ত কোন বৃষ্টি হয়নি।
কিন্তু গত মে মাসে বরিশালে স্বাভাবিক ২৩৯ মিলিমিটারের স্থলে ২৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টিতে উঠতি আউশের ক্ষতি শুরু হয়। বৃষ্টি মাথায় করে এবার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু স্বাভাবিকভাবেই জুনের প্রথম সপ্তাহে সাগর উপকূল হয়ে বরিশাল অঞ্চলে প্রবেশ করে। কিন্তু জুন মাসেও বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল স্বাভাবিক ৪৬৫ মিলিমিটারের স্থলে ৫২৩ মিলিমিটার। যা স্বাভাবিকের ১২.৩% বেশী হলেও সে সময়ে সারাদেশে সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল স্বাভাবিকের ১৯.৩% কম। আর জুলাই মাসে আবহাওয়া অফিস হিসেব অনুযায়ী বরিশালে স্বাভাবিক ৪৩৫ মিলিমিটারের স্থলে ৮৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। যা ছিল স্বাভবিকের ৬৪.২% বেশী। অথচ গতমাসে সারাদেশে সামগ্রীক বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল স্বাভাবিকের ২৩.৫% বেশী। আষাঢ়ের মত শ্রাবনেও স্বাভাবিকের অনেক বেশী বৃষ্টিপাত ফসলের মাঠ থেকে সর্বত্রই মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত রেখেছে। অথচ গত বছর মে মাসে বরিশালে স্বাভাবিকের ৪২.১%, জুনে ৩৫.৮% এবং জুলাই মাসে ৫৮ % কম বৃষ্টি হয়েছিল।
ফলে গতবছর অনাবৃষ্টিতে আমন নিয়ে শংকা ছিল। এবার অতিবৃষ্টি নিয়ে কৃষিযোদ্ধাদের দু:শ্চিন্তার মধ্যেই প্রায় ১৫ ভাগ জমিনে আমন রোপন সম্পন্ন হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগ পর্যন্তই আমন রোপন অব্যাহত থাকবে। তবে এবার অতিবর্ষণ ও জোয়ারের প্লাবনের কারণে আমন কিছুটা বিলম্বিত হওয়ার আশংকা রয়েছে।
চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে প্রায় ৫৫ হাজর হেক্টরে আমন বীজতলা তৈরী হলেও তার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর ইতোমধ্যে কয়েকদফা প্লাবনের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি যে প্রায় দেড় লাখ হেক্টরে রোপন সম্পন্ন হয়েছে তারও অন্তত ৩০-৩৫ হাজার হেক্টর অতিবর্ষণ ও জোয়ারের প্লাবনের কবলে পড়েছে দু’দফায়। গত ৫দিন ধরেই বরিশাল অঞ্চলের বেশীরভাগ নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর প্রবাহিত হচ্ছে। শ্রাবনের পূর্নিমার মরা কাটালেও সাগর কিছুটা ফুসে থাকার মধ্যেই উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী উজানের প্রবল ¯্রােত সহ অতিবর্ষণে দু-কুল ছাপিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর প্রবাহ আবারো কিছুটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পার করছে।
গত বছর খরিপ-২ মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলের কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ৮ লাখ ৮২ হাজার ৩১০ হেক্টরে আবাদের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২৩ হাজার টন আমন চাল ঘরে তোলেন। এর আগের বছর ৮ লাখ ৮১ হাজার হেক্টরে রোপা ও বোনা আমন আবাদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার ৭৩ হাজার টন অতিরিক্ত প্রায় ২২ লাখ ৮১ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছিল বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-ডিএই সূত্রে জানা গেছে।
চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় ৮ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টরে অবাদ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে হাইব্রীড এর লক্ষ্য রয়েছে মাত্র ২৫ হাজার হেক্টরের মত। যার ফলন লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়েছে হেক্টর প্রতি ৩.৭০ থেকে ৩.৯০ টন চাল। অপরদিকে এখনো বরিশাল অঞ্চলে স্থানীয় সনাতন জাতের আমনের আবাদ হচ্ছে প্রায় পৌনে ৩ লাখ হেক্টরে । যার গড় ফলন হেক্টর প্রতি মাত্র ১.৭৭ টন চাল। তবে গত দুই দশকে এ অঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল-উফশী জাতের বেশকিছু জাতের ধানের আবাদ পর্যায়ক্রমে বাড়ছে।
বরিশাল অঞ্চলের কৃষকরা এখনো বিরুপ প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেই আউশ,আমন ও বোরা ধান সহ সব ফসলের আবাদ ও উৎপাদন করছেন। এমনকি এ অঞ্চলের কৃষকরা অনাদিকাল থেকে ঘূর্ণিঝড় ‘হেরিকেন’, ‘সিডর’, ‘মহাসেন, ‘আইলা’, ‘ইয়াশ’, ‘অশণি’, ‘সিত্রাং’, ‘রিমাল’ ও ‘হামুন’এর মত ভয়াবহ প্রকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করেই ফসল আবাদ ও উৎপাদন সহ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন।
কৃষিবীদদের মতে, ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তন এ অঞ্চলের ফসলের জন্য নানামুখি হুমকি সৃষ্টি করছে। তার পরেও এ অঞ্চলের কৃষিযোদ্ধারা আজীবন লড়াই করেই ফসল ঘরে তুলছেন। ২০২৩ সালের ২৪ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’এর মাঝারী বর্ষণে বড় কোন ক্ষতি না হলেও ১৭ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘মিধিলি’ প্রায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে বরিশাল উপকূল হয়ে মূল ভ
ভূ-খন্ডে আছড়ে পড়ায় আমনের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। ঐ ঝড়ের প্রভাবে মাত্র ১২ ঘন্টায় বরিশালে ২শ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এর ২২ দিনের মাথায় ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরেক ঘূর্ণিঝড় ‘মিগজাউম’ বরিশাল উপকূল থেকে সাড়ে ১২শ কিলোমিটার দূরে ভারতের অন্ধ্র উপকূলে আঘাত হানলেও তার প্রভাবে টানা ৫ দিনের মেঘলা আবহাওয়ার সাথে অগ্রহায়নের মাঝারী বৃষ্টিপাত আমনের আগের ক্ষতিকে আরো তড়ান্বিত করে।
ডিএই’র মতে, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে দেশে ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার ৪শ হেক্টরে ১ কোটি ৮১ হাজার ৭৫ হাজার ৪শ টন আমন চাল ঘরে তোলার লক্ষ্য নির্ধারন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আবাদ ও উৎপাদন। এরমধ্যে বরিশাল অঞ্চলে ৮ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টরে উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল।
