4:15 pm , July 22, 2025
শোকে স্তব্ধ নিহত স্কুলছাত্র সামিউলের পরিবার
জসিম জিয়া, মেহেন্দিগঞ্জ থেকে ফিরে ও কবির হোসেন, মেহেন্দিগঞ্জ ॥ আমার থেকে মাত্র তিন থেকে চারহাত দূরে ছিলো। ও আসতেছে, আমিও সামনে আগাচ্ছি। ঠিক এমন সময় দেখলাম কি যেন একটা এসে ওকে ফেলে দিলো। আমি ধরলাম কিন্তু জীবিত পেলাম না। আমার সামনেই করুন মৃত্যু হয় একমাত্র আদরের ধন সামিউলের। আমি এক হতভাগা পিতা কিছুই করতে পারিনি। এ কষ্ট সহ্য করার মত নারে ভাই। ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন নিহত মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সামিউল করিমের বাবা রেজাউল করিম শামীম। সোমবার দিবাগত রাত ২টায় বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চাঁনপুর গ্রামে সামিউলের লাশ নিয়ে আসা হয়। এ সময় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সামিউলের মা। শোকে স্তব্ধ বাবা। শান্তনা দেওয়ার ভাষা যেনো কারো কাছেই নেই।
নিহতের নামাজে জানাজা মঙ্গলবার সকাল ১০টায় স্থানীয় মোস্তফা কামাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নানার কবরের পাশে দাফন করা হয় সামিউলকে। নিহত স্কুলছাত্রের বাবা রেজাউল করিমের বাড়ী বরিশাল নগরীতে। তার স্ত্রী মোস্তফা কামাল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। দীর্ঘবছর পর সামিউল তার নানা বাড়ী মেহেন্দিগঞ্জে বেড়াতে আসে। গত শনিবার ২০ জুলাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়। এই যাওয়াই ছিলো তার শেষ যাওয়া।
রেজাউল করিম শামীম ঢাকায় ব্যবসা করেন। তার দুই সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে একই স্কুল থেকে এ বছর মাধ্যমিক পাস করেছে। ছেলে ইংরেজী ভার্সনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো। স্ত্রী গ্রামের বাড়ীতে থাকায় দুই সন্তানের পড়াশুনা থেকে শুরু করে সবই দেখভাল করতেন রেজাউল করিম। প্রতিদিনই ছেলেকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে আনা-নেওয়া করতেন। ঘটনার দিন সকাল ৮টায় ছেলেকে স্কুলে দিয়ে দুপুর একটার দিকে নিতে আসেন। স্কুল ছুটি শেষে সামিউল যখন বের হচ্ছিলো ঠিক তখনই বিমানটি আছড়ে পড়ে। বাবার কাছে যখন এগিয়ে আসতে ছিলো ঠিক তখনই একটি স্পিøন্টার এসে পড়ে সামিউলের শরীরে। সন্তানকে কোলে নিয়ে দ্রুত ছুটে যান হাসপাতালে কিন্তু তৎক্ষণে সব শেষ। রেজাউল করিম বলেন, সন্তানদের মানুষ করার জন্য আমি চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। আশা ছিলো ছেলে সামিউল বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু আমার সেই আশা আর পূরণ হলো না। বাবা হয়ে এ কষ্ট আমি কিভাবে সহ্য করবো। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন ওকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। এছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই।
কান্নাজড়িত কন্ঠে সামিউলের বাবা রেজাউল করিম শামীম বলেন, আমার সন্তান গেছে আমি চাইনা আর কারো সন্তান যেনো এভাবে স্কুল থেকে লাশ হয়ে না বের হয়। তিনি সরকারের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবী করেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন ধরণের সহায়তা পাইনি। এটা খুবই দু:খজনক।
সামিউলের মামা জাকির হোসেন বলেন, আমার ভাইগ্নার যে অবস্থা হয়েছে তা বলার মত না। গলা গলা মাংস। এসব দেখার পর কেউ কি সহ্য করতে পারে। যারা সন্তান হারিয়েছে তারাই কেবল এর কষ্ট বুঝবে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আজকে ঢাকার বাইরে যদি খোলা জায়গায় এ ধরণের প্রশিক্ষন হতো তাহলে এতগুলো তাজা প্রানতো ঝড়ে যেতো না। তিনি পুরনো বিমান দিয়ে প্রশিক্ষণ না দেওয়ানোর জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেন। জাকির হোসেন বলেন, এ ধরণের একটা ঘটনা ঘটালো বিমান বাহিনী অথচ তাদের পক্ষ থেকে আমাদের কোন সহযোগীতা করা হয়নি।
