4:33 pm , July 17, 2025
আরিফুর রহমান, ববি প্রতিবেদক ॥ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সাবেক রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের পিআরএল (পোস্ট রিটায়ারমেন্ট লিভ) সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে তা কোনো সিন্ডিকেট ছাড়াই বাতিল করে বর্তমান প্রশাসন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে ‘বিধিসম্মত নয়’ বলে দাবি করেছেন সাবেক রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম ।
জানা যায়, গত ৩ মে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৮তম বিশেষ জরুরি সিন্ডিকেট সভায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, তাকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরের পিআরএল ছুটি মঞ্জুর করা হবে এবং তার যাবতীয় আর্থিক পাওনা বিধি মোতাবেক পরিশোধ করা হবে। একইসঙ্গে, পূর্বের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের পাওনাও প্রদানপূর্বক তার দায়িত্ব ৪ মে ২০২৫ থেকে কার্যকর থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে পিআরএল মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, উপাচার্য হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বক্ষণিক প্রধান একাডেমিক ও প্রশাসনিক নির্বাহী কর্মকর্তা (ধারা ১১), এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখেন (ধারা ১০)। এই আইনানুযায়ী সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত সিদ্ধান্ত এবং উপাচার্যের স্বাক্ষরিত পিআরএল সংক্রান্ত পত্রকে প্রশাসনিকভাবে বৈধ বলেই ধরে নেওয়া হয়।
তবে ২৫ মে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার (অ.দা.) ড. মুহসিন উদ্দীনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, পিআরএল অনুমোদনের পত্রটি কোনোরূপ নথিগত অনুমোদন ব্যতিরেকে জারি করা হয়েছে এবং বিইউ/উপা/পত্রপ্রদান/২০২৪/০৭ স্মারক নম্বরে বিবৃত শিরোনামের কোনো নথির অস্তিত্ব বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকায় পত্রটি অনিয়মপ্রসূত এবং আমল-অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিল করা হয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অ.দা.) ড. মুহসিন উদ্দীন বলেন, সাবেক রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামের পিআরএল অনুমোদনের জন্য যেভাবে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আবেদন ফাইল হয়ে উপাচার্যের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা অনুসরণ করা হয়নি। আমি শুনেছি সিন্ডিকেট সভার মূল এজেন্ডা ছিল তাকে অপসারণ, সেখানে সরাসরি পিআরএল অনুমোদনের কোনো প্রস্তাব ছিল না।
তার দাবি, তৎকালীন উপাচার্য সরাসরি অপসারণের বদলে নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সরকারি নিয়োজিত এক সিন্ডিকেট সদস্যের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাকে তৎক্ষণিকভাবে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে তাৎক্ষণিকভাবে পিআরএল অনুমোদনের একটি চিঠি ইস্যু করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে কোনো নথি বা অনুমোদন ছাড়া দেওয়া হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, পিআরএল সংক্রান্ত যে চিঠিটি দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনো দাপ্তরিক ফাইল বা অনুমোদনের ভিত্তিতে ইস্যু হয়নি। ওই স্মারক নম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডে কোনো ফাইল বা চিঠি নেই। এমনকি রেজিস্টারেও তা রেকর্ডভুক্ত হয়নি। ফলে এটিকে ‘ভুয়া স্মারক ও রেফারেন্স’ বিবেচনায় বাতিল করা হয়েছে।” তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এটি পিআরএল আবেদন বাতিল নয়,অনুমোদন পত্রটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া পিআরএল অনুমোদনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে বলে জানান।
ড. মুহসিন উদ্দীন আরও বলেন, “পিআরএল অনুমোদনের জন্য প্রথমত দেখতে হবে তার অর্জিত ছুটি আছে কি না। যদি তা না থাকে, তাহলে অর্ধগড় বেতনে ছুটির প্রয়োজন হবে। গড় বেতনে ছুটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মে নেই, তবে আগের কিছু সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তে পরোক্ষ অনুমোদনের নজির রয়েছে। কিন্তু অর্ধগড় বেতনে ছুটির অনুমোদন এখনো হয়নি। এটি না হলে পিআরএল অনুমোদনও সম্ভব নয়। তাই সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে।”
অন্যদিকে, পিআরএল অনুমোদন বাতিলকে বিধিবহির্ভূত বলে গত ৭ জুলাই অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য বরাবর এক লিখিত আবেদন জমা দেন সাবেক রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, তৎকালীন উপাচার্যের পত্রটি বাতিল করা বিধি সম্মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের আলোকে উপাচার্য নিজের স্বাক্ষরিত যে পত্র প্রদান করেন, উক্ত পত্র নথিতে অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী উপাচার্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং তিনি সিন্ডিকেটের সভাপতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পত্র এবং কার্যাদির অনুমোদন দাতা তিনি নিজে এবং সেন্ডিকেট। যদি রেজিস্ট্রার বা অন্য কোন কর্মকর্তা দ্বারা আমার পিআরএল এর পত্রটি দেয়া হতো তাহলে তা নথিতে উপস্থাপন করে উপাচার্যের অনুমোদন প্রয়োজন হতো, সুতরাং সাবেক উপাচার্যের পত্রটি বাতিল আইন অনুযায়ী বিধি সম্মত হয়নি বলে প্রতিয়মান হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. তৌফিক আলম বলেন, সাবেক রেজিস্ট্রারকে যে পিআরএল (প্রি-রিটায়ারমেন্ট লিভ) প্রদান করা হয়েছিল এ সংক্রান্ত চিঠিতে উল্লেখিত রেফারেন্সগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইল বা দাপ্তরিক নথিপত্র পাওয়া যায়নি। অফিসে সংরক্ষিত রেফারেন্স ফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, উক্ত রেফারেন্স ব্যবহার করে ভিন্ন একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছে, যা এই পিআরএল সংক্রান্ত নয়। তাই আমরা নতুন করে, যথাযথ নিয়ম মেনে, পিআরএল বিষয়টি প্রসেস করবো এবং ওনার পাওনাদি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আইনের আওতার মধ্য থেকেই আমরা একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান চাই।
