4:16 pm , July 14, 2025
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশালে জুলাই আন্দোলনে পুলিশের বেপরোয়া হামলার শিকার ফটো সাংবাদিক শামিম আহমেদের এখন চলতশক্তি বাধাগ্রস্ত। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম বয়স্ক এই সাংবাদিক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনায় এক পর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। এখনো তার জীবন কাটে ভয়াল আতংকে। চিকিৎসকরা এ অবস্থাকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন।
গত বছর ২৯ জুলাই গোটা বরিশাল নগরী ছিলো আন্দোলনে উত্থাল। ঠিক এই সময় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করে নগরীর ফকির বাড়ি এলাকায়। ছবি পিপাসু সাংবাদিক শামিম ছুটে যান সেখানে। অতর্কিত পুলিশ হামলা চালায়। শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের লাঠিপেটার ছবি তুলতে শামিম শেখানে অবস্থান নিলে শুরু হয় তার উপরও পুলিশি নির্যাতন। এক পর্যায় তিনি রাস্তায় পড়ে গেলে তখনো চলে নির্যাতন। শামিমের সারা শরীর ও মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। এই আঘাতের পর তিনি আর দাঁড়াতে পারেননি। নির্যাতনের কথা ভেবে এখনো তিনি শিউরে ওঠেন। তাকে নিয়মিত থেরাপি দেয়া হচ্ছে।
শামিমের চিকিৎসক ফিজিও থেরাপি বিশেষজ্ঞ ডা: সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রথম যখন সাংবাদিক শামিমকে হাতে পাই তখনই তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার এ অবস্থার পেছনে তার বয়স, হাইপারটেনশন এবং জুলাই আন্দোলনের হামলা সংযুক্ত ছিলো। পুলিশ তার শরীরের বিভিন্ন অংশ এবং মাথায়ও আঘাত করে। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি স্ট্রোক করেন। বর্তমানে তার যা অবস্থা তাতে শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ্য হলেও জুলাই হামলার কথা মনে পড়লে তিনি অস্থির হয়ে যান ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। এ কারনে তিনি আবার হৃদরোগ আক্রান্ত হতে পারেন।
শামিম বরিশালের মাঠে ঘাটে প্রান্তরে গত ৩০ বছর থেকে ফটো সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক যুগান্তরের বরিশালের ফটো সাংবাদিক হিসেবে চাকরিরত আছেন। এখন তার হাত চলেনা, কথাও স্পষ্টভাবে বলতে পারেননা। বরিশালের পলাশপুরে বসবাসকারি শামিম ও তার পরিবার প্রান্তিক জীবনের সাক্ষি। ছোট একটি কুড়েঘরে বাস করেন। তার সীমিত আয়ে এক কন্যাকে ঢাকা বিশ্ববিস্যালয়ে মাস্টার্স, অপর কন্যাকে বরিশাল কলেজে অনার্স ফাইনাল পড়াচ্ছেন। ছোট মেয়ে স্কুল পড়ুয়া। হামলার পর শামিমকে সঠিক চিকিৎসাও দেয়া সম্ভব হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি হাসপাতাল না ছাড়লে গ্রেপ্তার করা হতো।
সাংবাদিক শামিম আহমেদ বলেন, আমি গিয়েছিলাম শিশুদের উপর লাঠিচার্জের ছবি তুলতে। আমি লাঠিচার্জের এ ছবি ভালোভাবে তুলছিলাম। এটা চোখে পড়ে তৎকালীন উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) তানভির আরাফাতের। এরপর আমার উপর বুট জুতা ও লাঠি দিয়ে হামলা চলে। আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর পরই গোয়েন্দারা আমাকে চলে যেতে বলে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে। সঠিক চিকিৎসাও করাতে পারিনি। পরে আমি আহত যোদ্ধা হিসেবে সি গ্রেডে তালিকাভুক্ত হই। আমি সরকারিভাবে স্বাস্থ্য সেবার কার্ড পেয়েছি কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছি না। আমি প্রাইভেট চিকিৎসা নিচ্ছি। আমাকে এই চিকিৎসার খরচ দেয়া হোক।
শামিম কন্যা সাহারা আহমেদ বলেন. এখন প্রাইভেট চিকিৎসা চলছে। কিন্তু এই পরিবারে উপার্জন করার মতো লোক একমাত্র আমার বাবা। আমরা নিজেরাই তার উপর নির্ভরশীল। আমি বরিশাল কলেজে অনার্স ফাইনালে এবং অপর বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ফাইনালে লখাপড়া করছে। আব্বা অসুস্থ হবার পর থেকে আমরা অসহায় অবস্থায় আছি। বাবা অফিসে কবে যেতে পারবে তাও জানিনা। অফিসই বা বেতন কতদিন বহন করবে তাও জানি না। সরকারের সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।
স্থানীয় সংবাদ কর্মিরাও জুলাই যোদ্ধা আহত অসুস্থ এই সাংবাদিকের জন্য সহায়তার দাবি করছেন। প্রবীন এই সাংবাদিকের উপর হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন তারা।
বরিশাল প্রেসক্লাব সবাপতি আমিনুল ইসলাম খসরু বলেন, ছাত্র আন্দোলনে যথার্থ ভূমিকা নিয়েছিলো বলেই তৎকালীন পুলিশ তার উপর চরমভাবে আক্রমন করেছিলো। এখন সে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় আছে। তাকে সকল সহায়তা দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
জুলাই আন্দোলনে বরিশালের ৩০ জন দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ হন। আর বরিশালে আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন শ জন । প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং আরো করা হবে।
বিভাগীয় কমিশনার মো: রায়হান কাওছার বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদেরকে আমরা সঞ্চয়পত্র দিয়েছি। আহতদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। সরকারি এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও আমরা সহায়তার পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমরা তাদের চাকরিরও ব্যবস্থা করবো। একই সাথে সরকার আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে জুলাই যোদ্ধাদের জন্য।
