4:07 pm , July 8, 2025
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে বরিশাল অঞ্চলজুড়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। সাধারন মানুষ সহসা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। সরকারি-বেসরকারী অফিসগুলো ছিলো কিছুটা ফাঁকা। বঙ্গোপসাগরে ঘনিভূত গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা ধেয়ে এসে বরিশাল সহ উপকূলভাগজুড়ে বৃষ্টি ঝড়াচ্ছে। গত তিনদিন ধরে লাগাতার মাঝারী থেকে ভারী বর্ষণে জনজীবনে স্বস্তি নেই। আবহাওয়া বিভাগ থেকে মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে পরবর্তি ২৪ ঘন্টায় বরিশাল সহ উপকূলজুড়ে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারী রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টার পূর্ববর্তি ৪৮ ঘন্টায় বরিশালে প্রায় ১শ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে নগরীর বেশকিছু রাস্তাঘাট বিশেষ করে কালুশাহ সড়ক হাটুপানিতে তলিয়ে গেছে। এ অঞ্চলের অন্য এলাকাতে বৃষ্টিপাতের পরিমান প্রায় দ্বিগুন। উপকূল সংলগ্ন খেপুপাড়াতে রোববার সকালে ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার পরে সোমবার সকালের পূর্ববর্তি ২৪ ঘন্টায় আরো ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টার পূর্ববর্তি ২৪ ঘন্টায় এ এলাকায় আরো ১২১ মিলি বৃষ্টি হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরারত সব নৌকা ও ট্রলারসমূহকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলেছে আবহাওয়া বিভাগ।
বরিশাল সহ এ অঞ্চলের সবগুলো নদী বন্দরে ১নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূল সহ বন্দর এলাকার ওপর দিয়ে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাবার আশংকায় পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারী রাখা হয়েছে। লাগাতার বর্ষণে বরিশাল মহানগরী সহ এ অঞ্চলের অনেকগুলো শহর ও বন্দরে বৃষ্টির পানি জমে নগরজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত।
এদিকে টানা প্রায় ৫মাস অনাবৃষ্টির পরে সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে বরিশালে স্বাভাবিক ৪৬৫ মিলিমিটারের স্থলে ৫২৩ মিলি বৃষ্টি হয়েছে। যা স্বাভাবিকের ১২.৩% বেশী হলেও সারাদেশে সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল স্বাভাবিকের ১৯.৩% কম। চলতি মাসেও বরিশালে স্বাভাবিক ৪৩৫ মিলিমিটারের স্থলে বরিশালে ৪৯০ থেকে ৫৭০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া বিভাগ। তবে মাসের প্রথম ৮দিনেই বরিশালে প্রায় ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত দু’দিনেই বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল প্রায় ১০০ মিলি। অপরদিকে জুনমাসের প্রথম পক্ষে জৈষ্ঠের শেষ ১৫ দিনে বরিশালে ১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও শেষ পক্ষে আষাঢ়ের প্রথম ১৫ দিনে বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল ৩২২ মিলি।
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বর্তমানে বরিশাল সহ দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় মাঝারী অবস্থায় থাকলেও সংলগ্ন উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা প্রবল অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ আগামী ২৪ ঘন্টায় বরিশাল সহ উপকূলীয় এলাকায় মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়ে রাখলেও আরো অন্তত ৫দিন মাঝারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তিতে বৃষ্টিপাতের প্রবনতা কিছুটা প্রশমিত হবার সম্ভাবনার কথাও বলছে আবহাওয়া বিভাগ।
গতবছর মূল বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের অনেক কম বৃষ্টিপাতের পরে ২২ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারতের ভুবেনশ^র ও কোলকাতার মধ্যবর্তি এলাকা অতিক্রমকালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল যুড়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাপক ঘাটতির পরে মে মাসে বরিশালে স্বাভাবিক ২৩৯ মিলিমিটারের স্থলে ২৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। পাশাপাশি জুনের প্রথম সপ্তাহেই উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ থেকে সুস্পষ্ট লঘুচাপ নি¤œচাপের রূপ নিলে মাঝারী বর্ষণ প্রত্যক্ষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।
তবে নদ-নদীর পানি এখনো বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হওয়ায় আমনের ভরা মৌসুমে বীজতলা তৈরী, উত্তোলন ও রোপনের এ সময়ে মাঠে মাঠে কৃষকের এখন যথেষ্ঠ ব্যস্ততা । চলতি খরিপ-২ মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল ঘরে তোলার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বীজতলা তৈরীর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিছু কিছু এলাকায় রোপনও শুরু হয়েছে। আগষ্টের মধ্যভাগ পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলের প্রধান দানাদার খাদ্য ফসল আমন রোপন অব্যাহত থাকবে।
সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বৃষ্টি এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্য যথেষ্ঠ অনুকুল পরিবেশ তৈরী করবে বলে মনে করছেন কৃষিবীদরা। তবে এখনো সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর পানি ও প্রবাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলেও আসন্ন পূর্ণিমার ভরা কাটালে সাগর ফুসে উঠে উজানের পানি গ্রহণ না করলে আমন বীজতলা ও রোপা আমন সহ বশিাল অঞ্চলের মাঠে থাকা সব ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশংকা রয়েছে।
