রেমালের কবলে উপকুলের উৎকন্ঠিত মানুষ রেমালের কবলে উপকুলের উৎকন্ঠিত মানুষ - ajkerparibartan.com
রেমালের কবলে উপকুলের উৎকন্ঠিত মানুষ

3:43 pm , May 26, 2024

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘রিমেল’ রোববার সন্ধ্যা নাগাদ বরিশাল উপকুল হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলভাগে আছড়ে পড়ার কথা থাকলেও এ ঝড়ের অগ্রভাগ উপকুলে পৌছায় সকাল থেকেই বরিশাল অঞ্চলে ১০-২৫ কিলোমিটার বেগের ঝড়ো হাওয়া সহ থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারী বৃৃষ্টি ঝড়িয়েছে। রোববার সকাল থেকে রোদের ঝলকানী থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। বিকেল থেকে আবহাওয়া আরো দূর্যোগপূর্ণ হয়ে ওঠে। উপকুলের বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন মেঘনা, বিষখালী, তেতুলিয়া, বুড়িশ^র, বলেশ^র, গড়াই ও মধুমতি সহ সবগুলো নদ-নদীর পানি দুপুর ৩টা থেকে বিপদসীমা অতিক্রম করে। সন্ধ্য ৬টা নাগাদ এসব নদ-নদীর পানি দশমিক ১২ থেকে দশমিক ৭৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রোববার দিনভরই বরিশাল অঞ্চলের বেশীরভাগ নদীগুলো বিপদ সীমার নিচ প্রবাহিত হলেও পাথরঘাটা, আমতলী, বরগুনা সহ উপকুলীয় কয়েকটি এলাকার নদীগুলো সকাল থেকেই বিপদ সীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল।
রিমেল-এর মোকাবেলায় রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচী-সিপিপি’র প্রায় ৭৫ হাজার সেচ্ছাসেবক গোটা উপকুলভাগে মাইকিং সহ ৩টি করে লাল-কালো পতাকা উত্তোলন করে উপকুলবাসীকে সতর্ক করে। পাশাপাশি ঝুকিপূর্ণ এলাকার প্রায় ৮ লাখ মানুষকে সাড়ে ৮ হাজার নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছে। এরমধ্যে শুধু বরিশাল অঞ্চলেই ৩ হাজার ৮১৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় সোয়া ২ লাখ নারী-পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে রোববার সন্ধ্যা থেকে আশ্রিতদের খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ৫২টি মুজিব কেল্লাতে ২৩ হাজার গবাদীপশু আশ্রয় দেয়া সম্ভব হয়েছে বলে বরিশালের বিভাগীয় প্রশাসন জানিয়েছে। বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের সাথে পুলিশ ছাড়াও কোষ্ট গার্ড, টুরিষ্ট পুলিশ এবং র‌্যাব সহ আনসার-ভিডিপি’র সদস্যগনও উপকুলভাগে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছেন। কুয়াকাটা সৈকত থেকে সব পর্যটককে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে দিয়েছে টুরিষ্ট পুলিশ।
বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রন কক্ষ চালু করে সার্বক্ষনিকভাবে পরিস্থিতির ওপর নজরদারী করছে। তবে ঘূর্ণিঝড় রিমেল পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার মধ্যবর্তি সময়ে রোববার সন্ধ্যায় জোয়ার-ভাটার মাঝে উপকুলে আঘাত হানায় এর তীব্রতা ও জলোচ্ছ্বাস তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
রিমেল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ থেকে রায়মঙ্গল হয়ে বাংলাদেশের হিরন পয়েন্ট থেকে পূর্বে খেপুপাড়ার মধ্যে আছড়ে পড়ার কথা বলেছে আবহাওয়া বিভাগ। তবে সন্ধ্যা ৬টায় খেপুপাড়া রাডার স্টেশন জানায়, ঐ এলাকায় বায়ুচাপ নি¤œমুখী হওয়ায় সাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড়টি খুব সহসাই শক্তি সঞ্চার করে উপকুলে আঘাত হানতে পারে। তবে দিনভর মোটামুটি অনুকুল আবহাওয়া এবং মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টিপাতে খেপুপাড়া, আমতলী, বেতাগী সহ উপকুলের বেশীরভাগ এলাকার আবহাওয়া ছিল পরিচ্ছন্ন।
দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রোববার সকাল ৫টা থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বরিশাল নদী বন্দর সহ উপকুলভাগে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। খুলনা-বরিশাল-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের বরিশাল-ভোলা এবং ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেক্টরের দুটি ফেরি সার্ভিসও শণিবার মধ্যরাত থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বরিশাল সহ এ অঞ্চলের সবগুলো নদী বন্দরকে ৪ নম্বর নৌ মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হলেও পুরো বরিশাল অঞ্চল ‘১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে’ বলে আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে। বরিশাল সেক্টরে রোববার সকালে বিমান-এর একমাত্র ফ্লাইটটিও বাতিল করা হয় দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণেই।
বরিশাল-ফরিদপুর-ঢাকা, বরিশাল-মোংলা-খুলনা ও বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কগুলোতেও রোববার দিনভর স্বাভাবিকের অনেক কম যানবাহন চলাচল করছে।
বরিশালের বিভাগীয় প্রশাসন মাঠে থাকা পাকা বোরো ধান ছাড়াও আবাদরত আউশ এবং বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজী রক্ষায় কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরকে নিবিড় নজরদারীর নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে এ অঞ্চলের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টরের প্রতিও বিশেষ নজরদারীর নির্দেশ দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার। বরিশালের বিভাগীয় প্রশাসন প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করে ঘূর্ণিঝড় রিমেল মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সহ দূর্যোগ পরবর্তি সময়ে ত্রান ও উদ্ধার তৎপড়তার বিষয়ে দিকে নির্দেশনা প্রদান করছে। বিভাগীয় কমিশনার নিজেও দূর্যোগ কবলিত জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বলে জানিয়েছেন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বরিশাল সহ সংলগ্ন উপকুল ভাগ যুড়ে ২০-৩৫ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়ার সাথে হালকা থেকে মাঝারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। রাত ১২টার পরে পাথরঘাটা, কুয়াকাটা, হিরন পয়েন্ট ও রায়মঙ্গল সহ উপকুলভাগে দিনের প্রথম জোয়ার শুরুর আগেই ঘূর্ণিঝড় রিমেল উপকুল অতিক্র করলে এর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা খুব বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি নাও করতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তবে এ দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সোমবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। রোববার রাতটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলবাসীর জন্য ছিল চরম উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও ভয়াল রজনী ।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT