নিম্নচাপ নিয়ে শংকিত উপকূলের মানুষ নিম্নচাপ নিয়ে শংকিত উপকূলের মানুষ - ajkerparibartan.com
নিম্নচাপ নিয়ে শংকিত উপকূলের মানুষ

3:48 pm , May 24, 2024

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নি¤œচাপ নিয়ে দু.শ্চিন্তায় বরিশালের কৃষককুল। মে মাসের নি¤œচাপ থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলো সাধারনত ১০-১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাস নিয়ে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকুলে আঘাত হেনে থাকে। অতীত ইতিহাস অনুযায়ী মে মাসের ঘূর্ণিঝড় সমুহ মাঠের ফসল থেকে শুরু করে কাঁচা ও আধাপাকা ঘর বাড়ী সহ উপকুলভাগকে লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। মাঠে থাকা পাকা ও আধা পাকা বিপুল বোরো ধানের সাথে বীজতলা সহ সদ্য রোপনকৃত আউশ ধান নিয়ে কৃষকের দু.শ্চিন্তা ক্রমশ বাড়ছে। সাথে বিভিন্ন ধরনের শাক সবজি সহ শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন ফসল নিয়ে চরম উৎকন্ঠায় বরিশালের কৃষি যোদ্ধাগন। তবে অভিজ্ঞ আবহাওয়া পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এখন অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার কাটাল না থাকায় ঝড়ের তীব্রতা নিয়ে খুব বড় ধরনের শংকা তৈরী নাও হতে পারে। শণিবারের মধ্যে নি¤œচাপটির তীব্রতা এবং গতি প্রকৃতি সহ তা ঘূর্ণিঝড় বা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিনত হবার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারনা তৈরী হতে পারে বলেও মনে করছেন মহলটি।
ইতোপূর্বে অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার ভরা কোটালে ভর করে বঙ্গোপাসাগর থেকে ধেয়ে আসা মে মাসের ঘূণিঝড়গুলো বরিশাল সহ উপকুলের জনজীবন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে বার বার। ১৯৬১ সালের ৯ মে ও ৩০ মে দক্ষিণ-পূর্ব উপকুলে ৬ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সহ ১৬০ কিলোমিটার বেগে দুটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ১৯৬৩ সালের ২৮ মে দুশতাধিক কিলোমিটার বেগের আরেকটি ঘূর্ণিঝড় ৮-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সহ দক্ষিণ-পূর্ব উপকুলে আঘাত হানে। ’৬৫ সালের ১১ মে ৮-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সহ ১৬০ কিলোমিটার বেগের একটি ঘূর্ণিঝড় বরিশাল ও চট্টগ্রাম উপকুলে আঘাত হেনেছিল। ১৯৮৫ সালের ২ মে রাতে দেড় শতাধিক কিলোমিটার বেগের আরেক ঝড় ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সহ উপকুলে আঘাত হানে। ১৯৯৪ সালের ২ মে ২২০ কিলোমিটার বেগের একটি ঘূর্ণিঝড় ৫-৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সহ দক্ষিণ উপকুলকে লন্ডভন্ড করে দেয়। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে ২৩২ কিলোমিটার বেগের একটি ঘূর্ণিঝড় ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাস নিয়ে দক্ষিণ উপকুলে আঘাত হানে। ’৯৮ সালের ২০ মে প্রায় পৌনে ২শ কিলোমিটার বেগের ঝড়ের সাথে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ৩-৫ ফুটের মত। ২০০৪ সালের ১৯ মে প্রায় ৯০ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড়টি উপকুলে আঘাত হানার সময় প্রায় ৬ ফুট জলোচ্ছ্বাসে ফসলী জমি সহ ঘরবাড়ীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২০০৯ সালের ২ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ প্রায় ৯০ কিলোমিটার বেগে ৬ ফুট জলোচ্ছ্বাস সহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলে আঘাত হানে। ২০১৩ সালের ১৬ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ ১শ কিলোমিটার বেগে দক্ষিণ উপকুলে আছড়ে পরে। ২০২৬ সালের ২ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ ১২৮ কিলোমিটার বেগের তীব্রতার সাথে ৬-৭ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে উপকুলে আছড়ে পড়ে। এরপরে ২০১৭ সালে ৩০ মে আরেক ঘূর্ণিঝড় ‘মোড়া’ প্রায় দেড়শ কিলোমিটার বেগে দেশের উপকুলকে লন্ডভন্ড করে দেয়। আবহাওয়া বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইতোপূর্বে প্রতি ৩-৪ বছর পরেই মে মাসে বঙ্গোপসাগরে নি¤œচাপ সৃষ্টি হত। পরবর্তিতে তা ঘূর্ণিঝড়েরর রূপ নিয়ে জলোচ্ছ্বাস সহ উপকুলভাগে আছড়ে পড়তো। কিন্তু ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের মে মাসগুলোতে খুব ঘন ঘন একের পর এক ঘূর্ণিঝড় উপকুলে আছড়ে পড়ছে। এসব ঘূর্ণিঝড়েই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানী ছাড়াও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে । বিশেষ করে প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ই দক্ষিণ উপকুলের কৃষি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে বার বার। পাশাপাশি মে মাসের ঘূর্ণিঝড় গুলোতে মাঝারী থেকে বড় ধরনের জলোচ্ছাসে জানমালের ক্ষতির পরিমানও ক্রমশ বাড়ছে। এমনকি ১৯৯১ সালে মে মাস শুরুর প্রাক্কালে ২৯ এপ্রিল ভয়াল রাতে সোয়া ২শ কিলোমিটার বেগের প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় ২২ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস মাথায় করে দক্ষিণ উপকুলে আঘাত হেনেছিল। কালো রাতের সে ভয়াল ঝড়ে শুধু লক্ষাধিক আদম সন্তানের প্রাণহানী ঘটেছিল। সম্পদের ক্ষতির পরিমান ছিল সে সময়ের হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশী। আবার সেই মে মাসেই আরেকটি লঘুচাপ সুস্পষ্ট লঘুচাপ থেকে ইতিমধ্যে নি¤œচাপে পরিনত হয়ে উপকুলের দিকে এগুচ্ছে। আবহাওয়া বিভাগের পর্যবেক্ষন অনুযায়ী নি¤œচাপটি শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় বরিশালের পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে প্রায় ৭শ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। নি¤œচাপ কেন্দ্রের ৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ একটানা ৪০ কিলোমিটার থেকে দমকা আকারে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নি¤œচাপ কেন্দ্রের নিকটবর্তী সাগর মাঝারী মাত্রায় উত্তাল রয়েছে। এদিকে সমাপ্ত প্রায় রবি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে ১৮ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যে যে প্রায় ৪ লাখ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে, তার প্রায় দেড় লাখ হেক্টরের ধান এখনো মাঠে। অপরদিকে সদ্য শুরু হওয়া ‘খরিফ-১’ মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে এবার ২.১০ লাখ হেক্টরে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যে মাঠে মাঠে আউশ আবাদে কৃষকের ব্যস্ততাও চলছে। কিন্ত বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট দূর্যোগের দু.সংবাদে শংকিত কৃষককুল। এছাড়াও বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বিপুল পরিমোন পাট ছাড়াও সমাপ্ত প্রায় রবি মৌসুমের শাক-সবজি সহ আরো বিপুল পরিমান ফসল মাঠে রয়েছে। ফলে কৃষকের উদ্বেগ উৎকন্ঠা বাড়ছেই। তবে বরিশাল সহ সন্নিহিত এলাকায় শুক্রবার দিনভরই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী তাপ প্রবাহের সাথে আকাশ পরিস্কার ছিল। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বরিশাল সহ দক্ষিণ উপকূলের নদী বন্দরগুলোর জন্য কোন সতর্কবার্তা জারী না করা হলেও পায়রা সমুদ্র বন্দরে ১ নম্বর দুরবর্তী সতর্ক সংকেত দেখিয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছধরা নৌকা ও ট্রলারসমুহকে পরবর্তি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকুলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলেছে আবহাওয়া বিভাগ। বরিশালে শুক্রবার দুপুরে সর্বোচ্চ তদাপমাত্রার পারদ ৩৭.৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে উঠে যায়। যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৭ ডিগ্রী বেশী।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT