বরিশালের মাঠে বোরো ধানের হাসি সবার চোখ জুড়ায়! বরিশালের মাঠে বোরো ধানের হাসি সবার চোখ জুড়ায়! - ajkerparibartan.com
বরিশালের মাঠে বোরো ধানের হাসি সবার চোখ জুড়ায়!

4:08 pm , May 11, 2024

শৈত্য প্রবাহ আর বৃষ্টিবিহীন লাগাতার তাপ প্রবাহের পরেও

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ শীতে দফায় দফায় ‘কোল্ড ইনজুরী’ আর গ্রীষ্মের শুরুতে লাগাতার তাপ প্রবাহ সহ বৃষ্টির সংকটের দুর্যোগ অতিক্রম করে বরিশালের মাঠে মাঠে থোকা থোকা বোরো ধানে কৃষিযোদ্ধাদের মুখে হাসি ফুটেছে। পাশাপাশি এমাসে কয়েকটি লঘুচাপ সহ নি¤œচাপের খবরে দুঃশ্চিন্তাও বাড়ছে। গত শনিবার বরিশাল অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টি সহ কালবৈশাখীর খবরে উদ্বিগ্ন বোরো চাষিরা। সমাপ্ত প্রায় রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৫ হেক্টরে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে এযাবতকালের সর্বাধিক প্রায় ৩ লাখ ৯১ হাজার হেক্টরে বোরা আবাদ সম্পন্ন করেছেন কৃষকরা। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪ ভাগ বেশী। ফলে এবার বরিশাল অঞ্চলে ১৭ লাখ ৬৮ হাজার টন বোরো উৎপাদন লক্ষ্য অতিক্রম করে প্রায় ১৮ লাখ টনে পৌঁছবে বলে আশাবাদী মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদরা।
ভাটি ও নিচু এলাকার বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বিলম্বিত আবাদের কারণে কর্তনও শুরু হয়েছে কিছুটা শেষের দিকে। শনিবার পর্যন্ত এ অঞ্চলে বোরো কর্তনের হার ৫ ভাগেরও কম। এখনো বেশীরভাগ জমির বোরো ধান ফুল ও দুধ পর্যায়ে। এমনকি কিছু জমির ধান এখনো থোর পর্যায়ে রয়েছে।
ফলে আবহাওয়া নিয়ে কৃষকদের কিছুটা দুঃশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে । সমাপ্তপ্রায় রবি মৌসুমের শুরুতে দফায় দফায় মৃদু থেকে মাঝারী শৈত্য প্রবাহে বোরো বীজতলা ‘কোল্ড ইনজুরীর শিকার হলেও কৃষকরা নানা লাগসই প্রযুক্তি অনুসরণ করে তা রক্ষা করতে সক্ষম হন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী বীজতলা তৈরীর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে ১৫ মার্চের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত বোরো আবাদ সম্পন্ন হয়।
এখনো বরিশাল অঞ্চলে যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবার আগে বিপর্যয়ের শিকার হয় কৃষি সহ খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি। অথচ কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে কৃষিই মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু  প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলে সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষক ও কৃষি অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট নাজুক পরিস্থিতি তৈরী করেছে। সাথে প্রকৃতির বিরুপ আচরন কৃষি ও কৃষি অর্থনীতির জন্য বড় দুর্যোগ সৃষ্টি করছে। দুবছর আগে রবি মৌসুমেই ডিজেলের দাম প্রায় ৩০ ভাগ বৃদ্ধি বোরো আবাদ ও উৎপাদনে নতুন সংকট তৈরী করে। এরপরে দু দফায় সারের মূল্যবৃদ্ধিও সংকটের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
বরিশাল অঞ্চলে ৩.৯১ লাখ হেক্টরে সেচাবাদকৃত বোরো ধানের অন্তত ৮৫ ভাগ জমির সেচ ব্যবস্থাই ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সারা দেশের তুলনায় বরিশাল অঞ্চলে বোরো উৎপাদন ব্যায় অন্তত ২৫ ভাগ বেশী।
দেশে সেচাবাদে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ওপর ২০০২ সাল থেকে সরকার ২০ ভাগ ভর্তুকি  দিলেও ডিজেলের ক্ষেত্রে তা এখনো অনুপস্থিত।
চলতি রবি মৌসুমে ডিজেলের দাম সামান্য হ্রাস করা হলেও তা বোরো সেচাবাদে তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলছেনা। কারণ এবার লাগাতার বৃষ্টির সংকটে বোরোর জমিতে বাড়তি সেচের প্রয়োজন হয়। ফলে সার,বীজ, সেচব্যায় ও কৃষি শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধির ফলে এবার বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বোরো উৎপাদন ব্যায় মণপ্রতি হাজার টাকা অতিক্রম করেছে ইতোমধ্যে। গত নভেম্বরের শেষে বোরো বীজতলা তৈরী ও রোপন শুরুর পর থেকেই এঅঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টি হয়নি। এমনকি গতমাসে বরিশালে স্বাভাবিকের ৮৬% এবং মার্চ মাসে ৩০% কম বৃষ্টি হয়েছে।
বিগত মৌসুমে ধান বিক্রী করে উৎপাদন ব্যায় তুলতে পারেননি বরিশালের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক। কারণ দেনার দায়ে এঅঞ্চলের বেশীরভাগ কৃষকদের মাঠে মাড়াই করে ধান বিক্রী করতে হয়েছে। ফলে মাঠে ধান বিক্রিতে ফড়িয়াদের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়ার কোন বিকল্প ছিলনা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান সম্প্রতি ব্যাংকটির বরিশাল বিভাগীয় সম্মেলনে তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘সরকার এসডিজি অর্জনে ‘ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছে। তার মতে, ‘জিডিপি’তে কৃষি সেক্টরের অবদান ১২-১৩% এবং কর্মসংস্থানে ৪১%। কিন্তু এখনো কৃষকের ঋন চাহিদার মাত্র ২৪% ব্যাংক পূরণ করে। অবশিষ্ট ৭৪%-ই মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে কৃষকদের সংগ্রহ করতে হয়। ফলে দারিদ্রতা আরো বেড়ে যায়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উৎপাদন ব্যায়ের তুলনায় ধানের দাম এবং সেচব্যায় বেশী হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের জীবনমানের কোন উন্নতি হচ্ছেনা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশে সেচ ব্যায় এখনো ধান উৎপদন ব্যায়ের প্রায় ২৮-৩০%। অপরদিকে প্রতিবছরই খরিপ-১, খরিপ-২ ও রবি মৌসুমে একাধিক ঘূর্ণিঝড়ের মত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করেই ধান সহ সব ফসল উৎপাদন করতে হচ্ছে কৃষিযোদ্ধাদের।
বিগত খরিপ-২ মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৫৯৩ হেক্টরে আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কৃষি যোদ্ধারা ৮ লাখ ৮০ হাজার ৮৪৫ হেক্টরে আমন আবাদ সম্পন্ন করে। তবে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় বারবারই বিপর্যয় ডেকে আনলেও সব বাঁধা অতিক্রম করে বিগত মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় ২৩ লাখ টন আমন চাল ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন বরিশালের কৃষকরা। যা ছিল লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭০ হাজার টন অতিরিক্ত।
সমাপ্ত প্রায় রবি মৌসুমে দেশে ৫০ লাখ ৪০ হাজার ৪শ হেক্টরে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করায় ২ কোটি ২২ লাখ ৬৭ হাজার টন চাল উৎপাদনে আশাবাদী কৃষি মন্ত্রণালয়।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT