বরিশালে ডায়রিয়া-নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বরিশালে ডায়রিয়া-নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে - ajkerparibartan.com
বরিশালে ডায়রিয়া-নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে

3:36 pm , January 17, 2024

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ শীতের আগমন থেকে মৌসুমের মধ্যভাগে এসে শৈত্য প্রবাহ মারাত্মক আকার ধারণ করায় বরিশালে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সুস্থ জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। তাপমাত্রার পারদ স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস নিচে নেমে যাবার মধ্যেই বুধবার বরিশালের আকাশে সূর্যের মুখ দেখা গেছে সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে।সাথে উত্তর-পশ্চিমের হিমেল হাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও শিশু-কিশোরদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলাই ছিল। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে বরিশাল অঞ্চলের শুধু সরকারি হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগাক্রান্ত প্রায় সড়ে ৭শ রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছেন। যাদের প্রায় সবাই শিশু ও বয়োবৃদ্ধ। এর বাইরে বিপুল সংখ্যক নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুও আসছে। গত এক সপ্তাহে এখানের সরকারি হাসপাতালেই ৪০৫ জন এবং একমাসে প্রায় সাড়ে ৯শ নিউমোনিয়া রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছে। এছাড়া প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক ডায়রিয়া রোগীও আসছে এসব হাসপাতালে। প্রতিদিন শতাধিক ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হচ্ছেন। এছাড়া গত কয়েকমাসে বরিশালে প্রায় ৩৮ হাজার ডেঙ্গু রোগী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি  ২১২  জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু রোগী কমে এলেও মৃত্যু থেমে নেই। গত মঙ্গলবারও শের ই  বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত বছরে প্রায় ৭৮ হাজার ডায়রিয়া আক্রান্ত নারী-পুরুষ ও শিশু সরকারি হাসপাতালে ভর্তি সহ চিকিৎসা নিয়েছেন।
চলতি মাসের প্রথম ১৬ দিনে বরিশালের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২ হাজার ১শ নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগী ভর্তি হয়েছেন বলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে। প্রতিদিনই বরিশাল সহ এ অঞ্চলের সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিপুল সংখ্যক নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগ সহ ডায়রিয়া আক্রান্তদের নিয়ে চরম বিরুপ পরিস্থিতির শিকার চিকৎসকরা। অনুমোদিত জনবলের অর্ধেকেরও কম চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মী থাকায় এ অঞ্চলের সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে সুষ্ঠু চিকিৎসা ব্যবস্থাও এখন বিপর্যস্ত। তবে সব সরকারি হাসপাতালেই পর্যাপ্ত ওষুধ সহ চিকিৎসা সামগ্রী মজুদের কথা জানিয়েছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল।
চলমান মৃদু শৈত্য প্রবাহ শুরু হওয়ার পরেই নিমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধির সাথে ডায়রিয়ার প্রকোপও বাড়ছে বলে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ সহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক জানিয়েছেন।
শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই নিউমোনিয়া আক্রান্ত প্রায় দেড় হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে। ২০২৩ সালে বরিশালে ঠান্ডাজনিত নানা রোগ নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় ৭৭ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন বলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের ঠান্ডা এড়িয়ে চলা সহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষে গায়ে প্রচুর রোদ লাগানোর পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছেন।
পৌষের শেষ ভাগ থেকেই দেশের অনেক এলাকার মত বরিশালেও শীত জেকে বসতে শুরু করে। তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ নিচে নেমে মাঘের প্রথম দিন ১৫ জানুয়ারী দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় বরিশালে ৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস। যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ ডিগ্রী কম। এমনকি মঙ্গলবার তাপমাত্রার পারদ আগের দিনের ৯ থেকে ১০.৫ ডিগ্রীতে বৃদ্ধি পেলেও বুধবার সকালে তা পুনরায় ৯.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসে হ্রাস পায়। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫.৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের স্থলে গত তিনদিন ধরে ২২.৫-২২.৬ ডিগ্রীর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এর আগে তা ১৭.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসেও নেমে গিয়েছিল । যা ছিল স্বাভাবিকের প্রায় ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস নীচে ।
শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি কৃষি ব্যবস্থায়ও মারাত্মক বিরুপ প্রভাব পড়ছে। শৈত্য প্রবাহ ও লাগাতর ঘন কুয়াশা সহ একের পর এক বৈরী আবহাওয়ায় মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক ও কৃষি অর্থনীতি। ঘন কুয়াশা ও শীতের বিরুপ প্রভাবে বোরো বীজতলা, গোল আলু, গম ও শীতকালীন সবজি মারাত্মক সংকটের মুখে। চলমান শৈত্য প্রবাহ বোরো বীজতলায় ‘কোল্ড ইনজুরী’, গোল আলুতে ‘লেট ব্লাইট ডিজিজ’ এবং গমের জন্য ছত্রাকবাহী ‘ব্লাস্ট’ সংক্রমন সহ সবজি ফসলে গুনগত মান বিনষ্ট হচ্ছে। গত অক্টোবরে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় হামুন এর  পরে নভেম্বরে আরেক ঝড় ‘মিধিলি’ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান দানাদার খাদ্য ফসল আমনের উৎপাদনে যথেষ্ট বিরুপ প্রভাব ফেলে। চলতি রবি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ১৭ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যে ৪ লাখ হেক্টরে আবাদের জন্য যে বীজতলা তৈরী হয়েছে, তা ‘কোল্ড ইনজুরী’র কবলে। অপরদিকে ১৫ লাখ টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যে যে প্রায় ৭৫ হাজার হেক্টরে শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে সেখানেও থাবা বসিয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতি। অপরদিকে, প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্যে চলতি রবি মৌসুমে যে প্রায় ৬০ হাজার হেক্টরে গম আবাদ হয়েছে তাও ঝুঁকির মুখে ছত্রাকবাহী ‘ব্লাস্ট’ রোগের শংকায়। বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতি সহ আগামী দু-একদিনের মধ্যে বৃষ্টির যে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ, তা ব্লাস্ট সংক্রমনের উপযোগী বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদরা। চলতি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার হেক্টরে ৩ লাখ টন গোল আলু উৎপাদনের লক্ষে বিলম্বিত আবাদ শেষ পর্যায়ে থাকলেও ঘন কুয়াশার সাথে নজিরবিহীন শৈত্য প্রবাহ অব্যাহত থাকায় সে ফসল ‘লেট ব্লাইট’ নামে এক ধরনের ছত্রাকবাহী রোগের সংক্রমন নিয়ে শংকিত কৃষিযোদ্ধারা। এমনকি অক্টোবর ও নভেম্বরে দু,দফার অকাল ও প্রবল বর্ষণে পেঁয়াজের আবাদও অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। চলতি মৌসুমে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের ১১ জেলার প্রায় ৯৩ হাজার হেক্টরে ১১ লাখ ৮২ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির রয়েছে। যা দেশে উৎপাদিত মোট পেঁয়াজের প্রায় ৩৩ শতাংশ। গত বছর দেশে উৎপাদিত ৩৪.১৬ লাখ টন পেঁয়াজের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলেই সাড়ে ১১ লাখ টনের বেশী উৎপাদন হয়েছিল বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-ডিএই সূত্রে বলা হয়েছে। কিন্তু চলমান শৈত্য প্রবাহ জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও কৃষি-অর্থনীতিতেও যে বিরুপ প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে শংকিত এ অঞ্চলের কৃষি যোদ্ধারা। ফলে এ অঞ্চলের সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার জন্যও নতুন দুর্যোগ বয়ে আনার আশংকা ক্রমশ প্রবল হচ্ছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT