উঠে গেলো ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলো ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা - ajkerparibartan.com
উঠে গেলো ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা

3:26 pm , November 3, 2023

বিশেষ প্রতিবেদক ॥  নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে উপকূলের ৭ হাজার ৩৪২ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে ২২দিনের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। গত কয়েকদিন ধরে ট্রলার ও জাল মেরামত সহ জ¦ালানী ও জেলেদের রসদ মজুদ করে শুক্রবার রাতের প্রথম প্রহরেই মাছধরা ট্রলার সাগরে যেতে শুরু করে। পাশাপাশি বরিশাল সহ দক্ষিনাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ও অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতেও শুক্রবার শেষ রাত থেকে বিপুল সংখ্যক জেলে নৌকা ও ট্রলার মাছ ধরতে নেমে গেছে। প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসছে বরিশাল অঞ্চলের ইলিশের মোকামগুলোতেও। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকে নানামুখি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে দেশে ইলিশের সহনীয় আহরণ ১৯৯৮-৯৯ সালের ১.৯৮ লাখ টন থেকে গত অর্থ বছরে ৫.৬৬ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। যা চলতি অর্থ বছরে ৬ লাখ টনের কাছে পৌঁছার ব্যাপারে আশাবাদী মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল।
গত ১২ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে বরিশাল সহ উপকূলভাগের মত সারাদেশে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় মৎস্য অধিদপ্তর পুলিশ,কোষ্টগার্ড, র‌্যাব ও নৌ বাহিনী নজরদারী সহ অভিযান পরিচালনা করে। তবে এবার নিষিদ্ধকালীন সময়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারীর মধ্যেও এক শ্রেণীর জেলে ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে অবৈধভাবে ইলিশ আহরণে অধিকতর প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মতে এবারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে সারাদেশে ২ হাজারের বেশী মোবাইল কোর্টে আড়াই হাজারের মত মামলা হয়। এসময়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ছাড়াও ২ সহ¯্রাধিক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডাদেশ প্রদান করে ভ্রাম্যমান আদালত। এসময় মৎস্য আহরণে ব্যাবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী নিলামে বিক্রী করে সরকারের আয় হয়েছে  প্রায় ১৭ লাখ টাকা। অবৈধভাবে আহরণকৃত ৫০ টনেরও বেশী ইলিশ বাজেয়াপ্ত করে বিভিন্ন এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং-এ বিতরণ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাকালীন এ সময়ে মৎস্য অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন মৎস্য আড়ত ও বাজারে প্রায় ৮ হাজার অভিযান পরিচালনা করে। এ সময়ে বিভিন্ন অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৮ কোটি মিটার অবৈধ জাল আটক করে পুড়িয়ে ফেলেছে প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তর। আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ে বরিশাল সহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ১ হাজারেরও বেশী মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ও প্রায় ১০ হাজার মাছ ঘাট পরিদর্শন করে অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ বন্ধে নজরদারী করে প্রশাসন সহ মৎস্য অধিদপ্তর।
আশ্বিনের ভরা মৌসুমে ভোলার উত্তর তজুমদ্দিন থেকে পশ্চিম সৈয়দ আউলিয়া পয়েন্ট, কলাপাড়ার লতাচাপলি পয়েন্ট এবং লাতাচাপলী ইউনিয়নের লেবুর বাগান পয়েন্ট, মঠাবাড়ীয়ার সাপলেজা সংলগ্ন ভাইজোড়া পয়েন্ট, শরনখোলার পক্ষীর চর ও বগী  এলাকা, শাহেরখালী থেকে হাতিকন্দি ও উত্তর কুতবদিয়া থেকে গন্ডামারা পয়েন্টে মা ইলিশের অত্যাধীক প্রচুর্যের কারণে ৭ হাজার ৩৪২ বর্গ কিলোমিটারে ২২ দিনের জন্য  সবধরনের মৎস্য আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
নিরাপদ প্রজননে ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞার সময়ে মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী ইলিশের প্রজনন হার নির্ণয় সহ নানামুখি তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে গবেষণা জাহাজ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় এলাকায় ছিলেন। খুব শীঘ্রই এবারের প্রজনন মৌসুমে কতভাগ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে এবং তার কতভাগের প্রস্ফুটন সহ ইলিশ পরিবারে কত কোটি জাটকা যুক্ত হয়েছে সে সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা লাভ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর দায়িত্বশীল মহল।
গত বছরও ইলিশ আহরণে নিষিদ্ধ ২২ দিনের মূল প্রজনন সময়ে দক্ষিণ উপকূল সহ সংলগ্ন অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে প্রায় ৮৪% মা ইলিশ ডিম ছাড়ে বলে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে। যার ৫২% মা ইলিশ মূল প্রজননকালীন সময়ে এবং অপর ৩২% ডিম ছাড়ারত ছিল। এ হার আগের বছরের প্রজননকালের চেয়ে প্রায় ২.৪৫% বেশী ছিল বলে ইনস্টিটিউট-এর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়। ইনস্টিটিউট-এর গবেষকদের মতে, গত বছর মূল প্রজনন মৌসুমে প্রায় ৮ লাখ ৫ হাজার কেজি ডিম ছাড়ে মা ইলিশ। যার প্রস্ফুটনে দেশে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি জাটকা ইলিশ পরিবারে যুক্ত হয়েছিল।
প্রতিদিন ¯্রােতের বিপরীতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলা ‘অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ’ জীবনচক্রে স্বাদু পানি থেকে সমুদ্রের নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়াণ করে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের ইকোসিষ্টেমে সারা বছরই ৩০% ইলিশ ডিম বহন করে। বাকি ৭০% আশি^নের বড় পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার আগে পরে ডিম ছাড়ছে। ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ও মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘœ রাখা সহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুত ও জীব বৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করতে নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা মেরিন রিজার্ভ এরিয়া’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে ২২ দিনের প্রজননকালীন সময়ে নিষিক্ত ডিম থেকে ইলিশের সুষ্ঠু উৎপাদন নিশ্চিত করতে গত ১ নভেম্বর রাতের প্রথম প্রহর থেকে সারাদেশে ইলিশ পোনা-জাটকা আহরণে ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা আহরণে নিষিদ্ধকালীন এ সময়ে বরিশাল সহ দক্ষিণ উপকূলে ৬টি অভয়াশ্রমে ২-৩ মাস করে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, উপকূলের ৭ হাজার ৩৪২ বর্গ কিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মুক্ত ভাসমান অবস্থায় ডিম ছাড়ার পরে তা থেকে ফুটে বের হয়ে ইলিশের লার্ভা স্বাদু পানি ও নোনা পানির নার্সারী ক্ষেত্রসমূহে বিচরন করে খাবার খেয়ে নার্সারী ক্ষেত্রে ৭Ñ১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়ায়। এরা জাটকা হিসেব কিছুটা বড় হয়ে ১২-১৮ মাস বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসের পরে প্রজননক্ষম হয়ে আবার স্বাদু পানির নার্সারী ক্ষেত্রে ফিরে এসে ডিম ছাড়ে।
সমুদ্রে যাবার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় জাটকা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে মৎস্য বিজ্ঞানীদের গবেষনা অনুযায়ী সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারী ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহিৃত করে ‘অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়েছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT