বাজার দরে অস্থির ক্রেতা ॥ শহর-গ্রামে একই চিত্র বাজার দরে অস্থির ক্রেতা ॥ শহর-গ্রামে একই চিত্র - ajkerparibartan.com
বাজার দরে অস্থির ক্রেতা ॥ শহর-গ্রামে একই চিত্র

3:33 pm , October 27, 2023

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥
আবার বাড়ালো দাম
আলু পটল ডিম
আকাশ ছোঁয়া শিম
মাছ বাজারে আগুন
কপালে জোটেনা আর
মাংস কিংবা পোড়া বেগুন।।
বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর বাজারে এভাবেই কবিতার ছন্দে এক বৃদ্ধের প্রতিবাদ দৃষ্টি কাড়ে। বাজার সংলগ্ন নাটু বাবু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি চিৎকার করে কৃষকদের ডাকছিলেন আর বলছিলেন, ‘তোরা কয় টাকা পাইছো? আমার ক্ষেতের বেগুনতো ১০ টাকা দরে গেছে। মোটা তাজা, বড় বড় কালো বেগুন, লম্বা লাউ কিনে নিলো ২০ টাকা করে, তোরা কয় টাকা পাইছো। এহন এতো দাম ক্যা বাজারে? এই বৃদ্ধ প্রতি সোম ও শুক্রবার হাটে এসে বাজারের দর যাচাই করেন। এরপর এভাবে চিৎকার চেচামেচি করে বলে জানান শ্যামপুর বাজারের মুদি দোকানি শিমুল বাবু। তিনি বলেন, গ্রামে সবজিটা তাজা কিন্তু আর সবকিছুই তো ভেজাল। এই ভেজাল খেয়ে সবাই অসুস্থ হচ্ছি আমরা।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার গ্রামগুলোতে এখনো কৃষির উৎপাদন নজর কাড়ার মতো। তবে গ্রামবাসীর দাবী, উৎপাদন খরচ অনুযায়ী দাম পায়না কৃষক। এদিকে প্রতিটি পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। বাজার করতে আসা বরিশাল বিএম কলেজের এক ছাত্র বললেন, এই যে চাষের মাছগুলো কতটা খাবার উপযোগী তার কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যবস্থা নেই কোনো বাজারে। অতিশয় দুর্গন্ধময় মাছগুলো বিক্রি হচ্ছে এখন চড়া দামে। এই মাছগুলো রান্নার পর বাজে গন্ধ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
২২০ টাকা পাঙ্গাশ, ৩৬০ টাকায় তেলাপিয়া ও কইমাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা কেজিতে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের এটাই এখন চাহিদা। রুই-কাতলা ও ইলিশ এখন বড়লোকদের ফ্যাশন বলে জানান বাকেরগঞ্জের বড় বাজারের কয়েকজন ক্রেতা। শহর কিংবা গ্রামের বাজারে কোনো পার্থক্য নেই দামে। গ্রামেও ব্রয়লার মুরগীর কেজি ১৮০ টাকা, লেয়ার ৩২০, সোনালি ৩২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেল ২৭ অক্টোবর শুক্রবার সকালে।
বরিশালে ফেরার পথে সড়কে একটি মোটরসাইকেল ও তার চালককে দেখে বিস্মিত হতে হলো। সুমন নামে ওই ব্যক্তি পটুয়াখালী থেকে ঢাকা যাচ্ছেন ছেলের কাছে । তার মোটরসাইকেলের পিছনে বিশাল বস্তায় চাল, ডাল, তরকারি রয়েছে। আর দু’পাশে বাঁধা বস্তা থেকে রাজহাঁস, ও মোরগ-মুরগী উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। সুমন বললেন, বাজারের যে অবস্থা তাতে শহরে আমার ছেলে না খেয়ে মরবে। তাই বাজারের আগুন থেকে সন্তানকে বাঁচাতে ক্ষেতের ফসল, গৃহপালিত হাঁস-মুরগী নিয়ে ঢাকায় ছেলেকে দিতে  যাচ্ছেন। এদিকে বরিশালের বাংলা বাজার, নতুন বাজার, চৌমাথা বাজার ইতিমধ্যেই বড়লোক বা অবস্থাপন্ন পরিবারের বাজার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেছে। নগরীর পোর্ট রোড বাজারের তুলনায় সবকিছু এই বাজারগুলোতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে এমনটাই অভিযোগ ক্রেতাদের। পোর্ট রোড বাজারেও আলু ৬০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, শিম ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এখানকার মাছ বাজারে রুই কাতলার কেজিও ৩৫০ টাকা।  টাকা থেকে ৬০০ টাকা কেজি। গৃহিণী সুলতানা জানালেন, আবারও বেড়েছে আলু, পটল ও  বেগুনের দাম। পিয়াজ আর কাঁচামরিচ নিয়েও অভিযোগ অনেক। এই বাজারে দেখা হলো কয়েকজন অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকের। শ্রমিক শ্রেণির এই ক্রেতাদের দাবি, আলু, ডিম ও ডালের দাম না কমালে, না খেয়েই মরতে হবে আমাদের। মাছতো কিনে খেতে পারিনা, ডিমটা তাই খুব জরুরী।  এখন সেই ডিমের দামও বাড়তি। তাহলে কি খামু আমরা? বাজারে এখন ডিমের হালি ৫০ থেকে ৫২ টাকা চলছে। সুলতানা, আলমগীর হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম সহ কয়েকজন মধ্যবিত্ত ক্রেতা বললেন, মাছ মাংস খাওয়ার উপায় নেই। সবজির দামও যদি এভাবে প্রতিদিন বাড়তে থাকে তাহলে আমাদের বাচ্চাদের কি খাওয়াবো বলুন। ছোট্ট ছোট্ট ফুলকপি ও বাধাকপি ৪০-৬০ টাকা দাম চাচ্ছে। এদিকে গত দুই মাসে সরকার টিসিবিতে যে ডাল দিয়েছে তা নি¤œমানের। ঘরে রাখতেই পোকা ভেসে উঠছে বলে অভিযোগ অনেকের। বরিশালের সিটি মার্কেট কাঁচা বাজারের এক ক্রেতা ব্যাগভর্তি কাঁচা পেঁপে কিনেছেন ৩০ টাকা কেজি দরে। বললেন, এটাই এখন গরীব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধান খাবার। এখানে পাইকারী বাজারে অকারনে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ অনেকের। তবে আড়ৎদার সোলেমান, পিন্টু ও মান্নান বিশ্বাস  বলেন, বাজারদর কমাতে হলে পরিবহন খরচ কমান। ট্রলার বা ট্রাক, সড়ক বা নৌ পথে ভাড়া এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। আগে যেখানে এক ট্রাক সবজিতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তা পনের হাজার হয়েছে। ফলে মালের উপর দাম পড়ছে। কৃষকের থেকে ২০ টাকায় কেনা বেগুনে কত খরচ পরে হিসেব করে দেখুন বলে উল্টো ভাবনায় ফেলে দেন পাইকাররা। সবশেষে দায়টা চলে যায় সরকারের দপ্তরে। তেল, গ্যাস বিদ্যুৎ এবং কৃষি খাতে ভর্তুকি না দিলে বাজার দর নামানো যাবেনা বলে মনে করেন বরিশালের নাগরিক আন্দোলনের নেতা বসাস সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কেএসএ মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক, কাজী মিজানুর রহমান, এনায়েত হোসেন শিবলু সহ আরো অনেকে। তাদের পরামর্শ বাজার দর নিয়ন্ত্রণে এনে অবিলম্বে এসব খাতে ভর্তুকি দিয়ে দাম কমানো সম্ভব। সরকারের অনেক টাকা অনেক অপ্রয়োজনীয় খাতে  অপচয় হয়েছে, হচ্ছেও। তাই অতি প্রয়োজনীয় খাতে ভর্তুকি ক্ষতিকর নয় বরং উপকারী বলে দাবী বরিশালের সুশীল সমাজ প্রতিনিধিদের।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT