4:09 pm , October 20, 2023
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ভরা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের ব্যাপক ঘাটতির পরে শরতের অস্বাভাবিক বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত করে বরিশাল অঞ্চল থেকে বর্ষা মাথায় করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বিদায় নিয়েছে গত সপ্তাহে। তবে বর্ষা বিদায়ের আগে আশি^নের শেষ দিন, ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বরিশালে পুরো অক্টোবরের স্বাভাবিক ১৫৮ মিলিমিটারের স্থলে ১শ’ মিলিমিটার বেশী, ২৫৬.৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এবার বর্ষা মৌসুমের মূল সময়ে বৃষ্টিপাতের ঘাটতিতে কৃষি ও জনস্বাস্থ্যে নানামুখী বিরুপ প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি বৃষ্টির অভাবে দুঃসহ তাপ প্রবাহে দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ডায়রিয়াও দীর্ঘস্থায়ী হয়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের সরকারি হাসপাতালেই প্রায় ৭০ হাজার ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এমনকি শরতের শেষ দিন পর্যন্ত বর্ষা প্রলম্বিত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ডেঙ্গুর দাপট অব্যাহত আছে।
ইতোমধ্যে বরিশাল অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ৩১ হাজারের কাছে। মৃত্যু হয়েছে ১৩৭ জনের। অপরদিকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পারদ এপ্রিলে যেখানে ৩৩.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসে ওঠার কথা তা গত মধ্য এপ্রিলে ৩৯.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে ওঠে। ফলে দুঃসহ তাপ প্রবাহে বরিশাল অঞ্চলের শিশু ও বয়োবৃদ্ধ সহ অনেকের মধ্যেই নানা শারীরিক বিরুপ প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
এবার বর্ষা মৌসুম বিদায়ের শেষ প্রান্তে ও শরতের শুরুতে আগস্ট মাসে বরিশালে স্বাভাবিক ৪৩৩ মিলিমিটারের স্থলে ৭৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে আবহাওয়া বিভাগ। যা ছিল স্বাভাবিকের ৮০% বেশী। এমনকি শরতের মূল সময়ে সেপ্টেম্বর মাসেও বরিশাল অঞ্চলে স্বাভাবিক ৩২৭ মিলিমিটারের স্থলে ২৮৫-৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয়া হলেও বাস্তবে প্রায় ১২% বেশী,৩৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে কোন বৃষ্টি হয়নি। এপ্রিলে স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য কিছু বেশী বৃষ্টি হলেও জুন-জুলাইতে তা ছিল অনেকটাই কম। এমনকি গত বছর ২০ অক্টোবর বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’এর বয়ে আনা গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার প্রবল বর্ষণের পরে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ছিল অনুপস্থিত। তবে চৈত্র-বৈশাখের দাবদাহের মধ্যে এপ্রিলে স্বাভাবিক ১৩২.৩ মিলির স্থলে সামান্য কিছু বেশী বৃষ্টি হলেও মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তা ছিল স্বাভাবিকের অনেক কম। এমনকি জুলাইতেও বরিশালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের ৫৮% কম।গত বছর বর্ষা মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের আরো কম। আবহাওয়া পর্যবেক্ষদের মতে, এ অঞ্চলে তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ ওপরে উঠছে। গত বছর এপ্রিলে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিকের ৮৫.৬% কম বৃষ্টি হয়েছে। মে মাসেও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের ৫.৬% কম। অথচ ঐ মাসেই ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’তে ভর করে ৭ থেকে ১১ মে পর্যন্ত অতি বর্ষণে তরমুজ সহ বিভিন্ন রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জুনে বরিশালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের ৪৪.৪৫% কম।
জুলাই মাসেও স্বাভাবিকের প্রায় ৬৫% কম বৃষ্টিপাতের পরে আগষ্টে বরিশালে স্বাভাবিকের ১৬.৪% কম বৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেপ্টেম্বরে স্বাভাবিক ৩১৬ মিলিমিটারের স্থলে ৩৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু গতবছর অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এ ভর করে স্বাভাবিক ১৭৬ মিলিমিটারের স্থলে বরিশালে ৪৪১ মিলি বৃষ্টিপাতের কথা জানিয়েছিল আবহাওয়া বিভাগ। অথচ দক্ষিণ উপকূল থেকে বর্ষা মাথায় করে গত বছর ২০ অক্টোবর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বিদায় নিলেও ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর বর্ষণে বরিশালে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৫০% বেশী বৃষ্টি হয়। তবে এর পরের নভেম্বর মাসেই বরিশালে স্বাভাবিকের ৯৮% কম বৃষ্টি হয়েছিল।এবার আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষা মৌসুমে নজিরবিহীন বৃষ্টির আকালের পরে আশি^নের শুরু থেকে লাগাতার বর্ষণে বরিশাল অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন সবজির বেশীরভাগই বিনষ্ট হবার সাথে শীতকালীন আগাম শাক-সবজির প্রায় পুরোটাই বিনষ্ট হয়েছে। ফলে বাজারে এখন ৮০ টাকা কেজির নিচে কোন সবজি নেই। এমনকি কোন কোন কোন সবজির কেজি ইতোমধ্যে ১২০ টাকার ওপরে। শুরু হতে যাওয়া রবি মৌসুমে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ১৫ লাখ ১৮ হাজার টন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কৃষকদের প্রস্তুতি শুরু হবার কথা থাকলেও শরতের বর্ষণে বেশীরভাগ জমিতে এখনো পানি। ফলে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের বেশীরভাগ এলাকাতেই এবার শীতকালীন সবজির আবাদ কিছুটা বিলম্বিত হবার সম্ভবনা তৈরী হয়েছে। এতে করে বাজারে সবজির সরবরাহ ও মূল্য সাধারনের নাগালে আসতে এবার আরো বেশী অপেক্ষায় থাকতে হতে পরে বলে মনে করছেন কৃষিবীদরা। প্রধান দানাদার খাদ্য ফসল আমনের রোপন শত ভাগেরও বেশী অর্জিত হলেও উপকূলভাগ সহ বরিশাল অঞ্চলে নভেম্বর মাসটি ঘূর্ণিঝড় প্রবন সময়। ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘হেরিকেন’ ও ২০০৭-এর ১৫ নভেম্বর ‘সিডর’এর ভয়াল রাতে উপকূলভাগ সহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে সোনালী আমন ধান সম্পূর্ণই বিনষ্ট হয়েছিল। এর আগে পরের কয়েকটি বছরেও ছোট বড় ঘূর্ণিঝড়, দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান দানাদার খাদ্য ফসল আমন’এর ‘পাকা ধানে মই’ দেয়ার মতই মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে গেছে। গত বছরও ২০ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’র ছোবলে বরিশাল অঞ্চলে আমন-এর উৎপাদনে ব্যাপক বিরুপ প্রভাব ফেলে। ফলে এবারো আমনের ভবিষ্যত নিয়ে নিশ্চিন্ত নন বরিশাল অঞ্চলের কৃষি যোদ্ধারা। প্রায় ১৫ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলে চলতি খরিপ-২ মৌসুমে ২২ লাখ ৮ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রায় ৮.৭০ লাখ হেক্টরেরও বেশী জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্য অতিক্রমে সক্ষম হয়েছেন কৃষকরা। তবে নদ-নদীর পানি বিপদ সীমার নিচে এবং সাগর ফুঁসে না ওঠায় আমন এখনো অনেকটাই নিরাপদ বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল মনে করলেও ‘প্রকৃতি নির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদরা।
