কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙ্গন রোধ প্রকল্প আটকে আছে ॥ থেমে নেই সাগরের ছোবল কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙ্গন রোধ প্রকল্প আটকে আছে ॥ থেমে নেই সাগরের ছোবল - ajkerparibartan.com
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙ্গন রোধ প্রকল্প আটকে আছে ॥ থেমে নেই সাগরের ছোবল

3:49 pm , October 16, 2023

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ একাধিকবার সংশোধনের পরেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙ্গন রোধ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছেনা। ফলে বিশাল সম্ভাবনার কুয়াকাটা সাগর সৈকত বঙ্গোপসাগরের ছোবলে ক্রমাগত ছোট হয়ে আসছে। এখানে ভ্রমণে গিয়ে পর্যটকরা অনেক সময়ই নিরাপত্তাহীনতা সহ নানা অজানা আতংকে ভোগেন। বঙ্গোপসাগরের ক্রমাগত আঘাতে আঘাতে হতশ্রী হয়ে পড়ছে উপমহাদেশের একমাত্র সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগের কুয়াকাটা। অথচ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী তিন দফায় পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনের পরে কুয়াকাটার প্রায় ১২ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ-এর ছোবল থেকে রক্ষায় ১ হাজার ২১১ কোটি ১৩ লাখ টাকার ‘উন্নয়ন প্রকল্প-প্রস্তাবনা-ডিপিপি’ গত বছর প্রথমদিকে পরিকল্পনা কমিশনে পেশ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ কালক্ষেপণের পরে পরিকল্পনা কমিশনের ‘প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি’ এবং ‘কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি’ বেশ কিছু বিষয় প্রকল্পটি থেকে বাদ দেয়া সহ ব্যয় সংকোচন করে পুনরায় সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয় এ বছরের শুরুতে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়া পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ ও বরিশাল জোনের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে গত মার্চে ৭৫৯ কোটি টাকার সংশোধিত ডিপিপি বোর্ডের সদর দপ্তরে দাখিল করার পরে সেখান থেকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও আর কোন অগ্রগতি হয়নি। তবে অতি সম্প্রতিও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক সরেজমিনে আরো একবার ভাঙ্গন কবলিত এলাকা সহ সেখানে চলমান একটি প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের সাথে আলাপকালে কুয়াকাটার ভাঙ্গন রোধে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি আগামী অর্থ বছরে অন্তর্ভূক্তির আশ^াস দিয়েছেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রকল্প প্রস্তাবনাটি পরিকল্পনা কমিশনে পুনরায় প্রেরণের লক্ষ্যে এখনো পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোন সভায় উপস্থাপিত হয়নি। অথচ পরিকল্পনা কমিশনের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প-প্রস্তাবনা’ ডিপিপি গত মার্চে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তা কবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে যাবে তা বলতে পারছেন না কেউ। বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরিশাল জোন ও পটুয়াখালী সার্কেলের দায়িত্বশীল মহলে আলাপ করা হলে ‘প্রকল্প প্রস্তাবনাটি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন আছে’ বলে জানান ছাড়া আর কিছু বলতে পারেননি। এদিকে বঙ্গোপসাগরের ভাঙ্গন কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রটিকে ইতোমধ্যে বিপন্ন করে তুলেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী সব সময়ই কুয়াকাটার সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখেন বলেও জানা গেছে। পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইতোমধ্যে কয়েক দফায় কুয়াকাটা ভাঙ্গন পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন। মন্ত্রীর নির্দেশেই ‘কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প’টি কয়েক দফা সংশোধনের পরে ২০২১-এর অক্টোবরে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে ঐ বছরই ১ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত এক সভায় একটি শিশু বিনোদন পার্ক এবং গঙ্গামতির চর ও জিরো পয়েন্টে দুটি সিকিউরিট স্টেশন সহ আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভূক্ত করতে ডিপিটি ফেরত দেয়া হয়েছিল। পরে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পুনরায় সংশোধিত ডিপিপি পানি উন্নয়ন বোর্ডে দাখিল করা হয়। কিন্তু ১ হাজার ২০৬ কোটি টাকার এ সংক্রান্ত ডিপিপি’টি আরো দুফায় সংশোধনের নির্দেশ দেয়ায় সর্বশেষ গত বছর জানুয়ারী মাসে তা বোর্ড হয়ে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হলেও পরিকল্পনা কমিশনে দীর্ঘ কালক্ষেপণের পরে ব্যয় সংকোচন সহ সংশোধনের নির্দেশিকা সহ ফেরত দেয়া হয়েছিল।
সে আলোকে চলতি বছরের মার্চের প্রথমভাগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদন সহ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হলেও বিষয়টি নিয়ে আর কোন অগ্রগতি নেই। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কোন সভাও আহবান করেনি গত ৬ মাসেরও বেশী সময়ে। পুরো প্রকল্প প্রস্তাবনাটি এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার কবলে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। অথচ পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইডব্লিউএম’ সরেজমিনে এবং নেদারল্যান্ডের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে কুয়াকাটার ভাঙ্গন রোধে ব্যাপক সমীক্ষা সম্পাদনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ নকশা প্রনয়ন করেছিল। আইডব্লিউএম-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী কুয়াকাটা উপকূলীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে সী বীচ পর্যন্ত প্রায় ৭০টি গ্রোয়েনের মাধ্যমে ভাঙ্গন রোধের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে মূল সী-বীচ রক্ষায় দু প্রান্তের রাবনাবাদ ও আন্দারমানিক চ্যানেল পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার এলাকায় সিসি ব্লকের সাহায্যে গ্রোয়েনগুলোতে জিও টেক্সটাইল-এর ওপর ৪৫ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার সাইজের সিসি ব্লক সন্নিবেশের মাধ্যমে ভাঙ্গন রোধে আশাবাদী পানি উন্নয়ন বোর্ড। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রকল্পের আওতায় পর্যটন আকর্ষণ গড়ে তুলতে কুয়াকাটা সৈকতে ‘ওয়াকিং বে’ ছাড়াও পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য ‘লাইফ গার্ড স্টেশন’, বসার স্থান, ট্রেইল, পার্কিং ল্যান্ডস্কেপ ও টয়লেট নির্মাণের প্রস্তাবনা ছিল। মূল প্রকল্প প্রস্তাবনায় কুয়াকাটায় ভাঙ্গন রোধের পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রটিকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ফলে প্রকল্প ব্যয়ও ১ হাজার ২০৬ কোটিতে উন্নীত হয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সেখানে আরো একটি শিশু বিনোদন কেন্দ্র ও সিকিউরিটি গার্ড স্টেশন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে প্রকল্প ব্যয়ও এক হাজার ২১১ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। এমনকি পুনর্গঠনকৃত প্রকল্প-প্রস্তাবনায় কুয়াকাটা সৈকত সংলগ্ন উপকূলীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের উপরিস্থিত ১২ কিলোমিটার এলাকা বিটুমিনাস কার্পেটিং করে মেরিন ড্রাইভ রোডের আদলে সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা ছিল। পাশাপাশি বন বিভাগের ইকোপার্কের অভ্যন্তরে ৯শ’ মিটার ওয়াকিং সেল সহ ২.৬ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে এবং সন্নিহিত গঙ্গামতির কাছে মেরিন ড্রাইভ রোডে একটি ঝুলন্ত ও ১টি পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের প্রস্তাবনা ছিল। প্রস্তাবিত নান্দনিক এসব সেতু সহ অন্যান্য বিনোদন স্থাপনা পর্যটন কেন্দ্রটির আকর্ষণ বৃদ্ধিতেও যথেষ্ট সহায়ক হবে বলে মনে করছেন একাধিক ট্যুর অপারেটরগণও। কিন্তু সর্বশেষ সংশোধিত ডিপিপি’তে শুধুমাত্র ভাঙন রোধ কার্যক্রম ছাড়া অন্যসব কিছুই বাদ দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের দিক নির্দেশনায়। তবে ভাঙ্গন রোধ প্রকল্পটির সাথে কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রটির মূল সৈকতের নান্দনিক সৌন্দর্যের রূপ দিতে কয়েক দফা সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধি সহ পুণঃ সংশোধনে দীর্ঘ কালক্ষেপণের পরেও এখন অর্থ সাশ্রয় করতে গিয়ে সব কিছু বাদ দিয়ে ডিপিপি সংশোধন করা হলেও তার অনুমোদন অনিশ্চিত।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT