বিসিসিতে আতংকের আরেক নাম অটোরিকশা! বিসিসিতে আতংকের আরেক নাম অটোরিকশা! - ajkerparibartan.com
বিসিসিতে আতংকের আরেক নাম অটোরিকশা!

3:50 pm , September 21, 2023

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) সূত্রে জানা গেছে, গত তিনমাসে কমপক্ষে শতাধিক যাত্রী এই অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশালের জিলাস্কুলের সামনে ঘটলো দুর্ঘটনাটি। অটোরিকশার আরোহী এক মহিলা ও পুরুষ ছিটকে পড়ে আছেন রাস্তায়। তাদের ঘিরে অনেক লোকের ভীড়। মহিলার মাথা ও হাতে রক্ত। পুরুষটি পা চেপে ধরে চিৎকার করছেন যন্ত্রণায়। শরীরের সাথে ডান পায়ের সম্পর্ক নেই আর। হাড় ভেঙে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানালেন ‘দোষ সম্পূর্ণ অটোরিকশা চালকের। পুলিশ লাইনের দিক থেকে এসে নিয়মনীতি না বুঝেই ডানদিকে মোড় নিয়েছে। বরিশাল ক্লাবের দিক থেকে আসা ইজিবাইক হর্ণ দিলেও অটোরিকশা আর ব্রেক সামলাতে না পেরে ইজিবাইকের ধাক্কা খেয়েছে। মাত্র দু’দিনের আগের এ ঘটনায় পঙ্গু হলেন একজন যাত্রী। কিছুদিন আগে এভাবেই দ্রুত গতির  অটোরিকশার আঘাতে হাত ভেঙে দুর্বিষহ কষ্টে আছেন জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক কৃষকলীগ নেতা এ্যাডভোকেট খান আলতাফ হোসেন ভুলু। তার ডান হাত আর এখন ব্যবহার করতে পারেন না তিনি। তার সাথে আহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা তরুণ চন্দ্র। তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সোনালী ব্যাংক বরিশালের কর্মকর্তা নুশান্তা বেগম মাথায় আঘাত পেয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। এদিকে শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) সূত্রে জানা গেছে, গত তিনমাসে কম হলেও শতাধিক যাত্রী এই অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। তারপরও নগরীতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অটোরিকশা।
বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার আওতাধীন ৫৯৩ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। কাঁচাপাকা এই সড়কে প্রতিদিন শব্দহীন দাবড়ে বেড়ায় প্রায় ১০ হাজার অবৈধ অটোরিকশা। সাথে আছে প্রায় ১২ হাজার হলুদ ইজিবাইক। সবমিলিয়ে নগরীতে প্রায় ২৫ হাজার অবৈধ যানবাহন চলছে কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। এ হিসাব বরিশালের ট্রাফিক বিভাগের। আর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের হিসাবে অনুমোদিত গাড়ির সংখ্যা মাত্র আড়াই হাজার। যদিও বর্তমানে পাঁচ হাজার ইজিবাইকের রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা।
এদিকে বরিশালে ব্যাটারিচালিত রিক্সা-ভ্যান-ইজিবাইক চালক সংগ্রাম পরিষদ থেকে বৈধ লাইসেন্স, রুপাতলীসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য পার্কিং স্ট্যান্ড নির্ধারণ, অযৌক্তিক মামলা ও হয়রানি – নির্যাতন বন্ধ, ট্রাফিক মামলার জরিমানা অনধিক ৫০০ টাকা নির্ধারনের দাবীতে বাসদ সদস্য সচিব ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী এবং সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি কবির হোসেনের নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী বলেন, এসব যানবাহনের বৈধতা চেয়ে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সারাদেশে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। এই আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা অর্জিত হয়েছে। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আপীলের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ মহাসড়ক ব্যতিত সর্বত্র ইজিবাইক চলাচলে বৈধতার রায় প্রদান করে। তাই রিকশা, ইজিবাইক ও ভ্যানগুলো বৈধতা পাওয়া উচিত। তবে নগরীর একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন নগরীতে লাইসেন্স বিহীন যানবাহন বন্ধ অথবা এগুলোকে একটি সংখ্যার মধ্যে সীমিত করা উচিত। না হলে সড়কে অবৈধ যানবাহন যেমন বাড়বে সেই সাথে রাস্তা ঘাটে বিশৃঙ্খলা ও অবস্থাপনা রোধ করা ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে আরো কষ্ট সাধ্য হবে।
বাসদ নেত্রী মনীষা বলেন, একদিকে স্ট্যান্ড দখলের নামে চলছে চাঁদাবাজি। অন্যদিকে প্রকৃত চালকদের জিম্মি করে লাইসেন্স বাণিজ্য শুরু করছে। এই প্রক্রিয়ায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে দুর্নীতি, লাইসেন্স বাণিজ্যের কারণে বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে জানান ডাঃ মনীষা।
তবে নগরবাসীর চিন্তা ইজিবাইক নয়। এগুলো বরং উপকারী দাবী করে আমতলা মোড়ের দক্ষিণ আলেকান্দার বাসিন্দা এবং একজন উচ্চশিক্ষিতা কর্মজীবী নারী সুলতানা নাজ বলেন, ইজিবাইকগুলোর ভাড়া য়েমন সহনীয় তেমনি ওদের গতিও নিয়ন্ত্রিত। একসাথে চার-পাঁচ জন মানুষ নিয়ে ওদের চলাচল। কিন্তু তিন চাকার রিকশাগুলো ইঞ্জিন লাগিয়ে যেভাবে ছুটে চলে তা রীতিমতো আতংকের।  ডাঃ মনীষা চক্রবর্তীর উচিৎ তার আন্দোলনের তালিকা থেকে অটোরিকশাগুলো বাদ দেয়া, তা না হলে নগরবাসী তাকেই বাদ দেবে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। কেননা, অটোরিকশার কারণে একটুর জন্য মরতে মরতে বেঁচেছেন তিনি, তবে তার কাপড় ছিঁড়ে দিয়েছে অটোরিকশা।
এই অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ইতিমধ্যেই নগরীর প্রায় ৫০০ এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানান বরিশালের পরিবেশ আন্দোলনের নেতা এনায়েত হোসেন শিবলু। তিনি বলেন, নগরীর বিষফোঁড়া এখন এই অটোরিকশা। সিটি করপোরেশনের কোনো তদারকি না থাকার কারণে প্রতিদিন সড়কে অসংখ্য থ্রি হুইলার যুক্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এই অটোরিকশা। এখনতো বলা যায় পিপড়ার মতো অটোরিকশা বাড়ছে।
পরিবেশ আন্দোলনের আরেক নেতা ও বরিশাল সাহিত্য সংসদ এর সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, মহাসড়কে ফোরলেন তৈরির কাজ চলছে। সেখানে ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি বেশি হবার সুযোগে শহরে অবৈধ যানবাহন বাড়ছে। এদের মধ্যে এই অটোরিকশাগুলো এখন আতঙ্কের নাম।
তিনি আরো বলেন,  লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন, ওরা ব্রেক দিলে হয় উল্টে যাচ্ছে, নয়তো দশ হাত দূরে যেয়ে তবে থামতে পারে। জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ার সাধ্য ওদের সিস্টেমেই নেই। এর উপর প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে ওদের জন্য বলে জানান কাজী মিজান।
এদিকে রুপাতলী থেকে গড়িয়ারপাড় ১১ কিলোমিটার সড়কে ফোরলেন নির্মাণের জন্য মাটি খনন ও ভরাট কাজ চলছে। যদিও অধিগ্রহণকৃত এ জমিতে ফোরলেন দূরের কথা আড়াই লেনও ঠিকমতো হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ নগর চিন্তাবিদদের। এর উপর বাইপাস সড়ক না করেই ফোরলেনের কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। ফলে সড়কের মোড়ে মোড়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। নগরীর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট চৌমাথা নবগ্রাম রোডে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, এখানে রয়েছে একটি লেক। লেকের চারপাশে দুইশতাধিক ভ্যান স্থায়ী ভাবে দাড়িয়ে আছে বছরের পর বছর। চৌমাথায় যানজটে সাধারণ মানুষ নাকাল হলেও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ লেকের চারদিকে এসব ভ্যান গাড়ি সরানোর কোন উদ্যোগ গত ৫ বছরেও নেয়নি। ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের এই স্থানটিকে ঘীরে আছে চারটি সড়ক। এমনকি পাশের জেলা ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের অভ্যন্তরীণ সড়ক এখানের এই নবগ্রাম রোড। এখান থেকে নবগ্রাম ও আটঘর কুড়িয়ানার যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য রয়েছে মাহেন্দ্র ও চার চাকার ম্যাজিক পরিবহন। যাদের চলাচলে ঈদের পর থেকে নিষেধাজ্ঞা জারীর কথা বলছিলেন বরিশাল বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। অথচ এখনো সেগুলো চলছে এবং বরিশাল বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত মাসোহারা দিচ্ছে বলে দাবি এসব চালকদের। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে ম্যানেজ করা হয় প্রশাসনকে। এমনটাই দাবী প্রতিটি চালক ও ট্রাফিক কনস্টেবলেরও।ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকাটিতে রাস্তায় ফুটপাত দখল করা ছাড়াও লেকের চারপাশে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য খাবারের দোকান। রয়েছে ইজিবাইক, সিএনজি অটোরিকশার যত্রতত্র পার্কিং। দিনের বেলা লেকের পাড়ে জনসমাগম কম হলেও বিকেল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হয় এই চৌমাথা এলাকা। সারাটা দিন এখানে যানজট লেগেই আছে। অটোরিকশার বেপরোয়া গতিতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানালেন  ট্রাফিক কনস্টেবল সেলিম।
ট্রাফিক ও বিআরটিসির খামখেয়ালিতে নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না বলে দাবী করেন রুপাতলী বাস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও ২৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান মাহমুদ। তিনি নিজেও এই অটোরিকশা ও সিএনজিগুলো নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ করেছেন জানিয়ে বলেন, নথুল্লাবাদ থেকে  রুপাতলী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং কালিজিরা পয়েন্ট পর্যন্ত পুরোটাই মহাসড়ক। এই মহাসড়কে ওদের পার্কিং কি প্রশ্নবিদ্ধ নয়? রুপাতলী গোলচত্বর থেকে মাহেন্দ্র, সিএনজি, অটোরিকশা  ও ইজিবাইক স্ট্যান্ড সরিয়ে নেয়া এবং যানজট নিরসনের জন্য প্রয়োজনে রুপাতলী বাসস্ট্যান্ডও সরিয়ে ফেলার দাবী জানান এই কাউন্সিলর। তিনি আরো বলেন, আমাদের এখন ফোরলেন সড়ক খুবই জরুরী। বিগত জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার তো বলেছিলেন আগে বাইপাস সড়ক হবে গড়িয়ারপাড় থেকে রুপাতলী, তারপর ফোরলেন সড়কের কাজ শুরু হবে। এখন তাহলে এটা কি হচ্ছে? জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জসীম উদ্দীন হায়দার চলে যাওয়ার পরপরই তার প্রস্তাবিত অনেক কিছুই ফাইলচাপা পড়েছে। তাছাড়া ফোরলেন অতি জরুরী হওয়ার কারণে যা পাওয়া গেছে তার মধ্যেই সড়ক বর্ধিতকরণ চলছে বলে জানান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সোহেল মারুফ। যানজট ও ফুটপাত দখল বিষয়ে বরিশাল ট্রাফিক বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার তানভীর আরাফাত বলেন, কি করবো বলুন, অবৈধ যানবাহন এখন প্রায় চারগুণ। আমাদের লোকবল সংকট এখনো কাটেনি। চৌমাথা লেকের পাড়ের দোকানগুলো নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই। ওটা কোতোয়ালি থানা ও সিটি করপোরেশনের অধীনে। আমরা যানজট নিরসনের জন্য অবৈধ পার্কিংগুলো প্রতিদিনই সরিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পেলে আমাদের দ্বারা এটা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব বলে জানান ট্রাফিক বিভাগের এই কর্মকর্তা।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT