ঝালকাঠিতে পেয়ারার ফলন আশানুরুপ না হওয়ায় চাষীদের মুখে হতাশার ছাপ ঝালকাঠিতে পেয়ারার ফলন আশানুরুপ না হওয়ায় চাষীদের মুখে হতাশার ছাপ - ajkerparibartan.com
ঝালকাঠিতে পেয়ারার ফলন আশানুরুপ না হওয়ায় চাষীদের মুখে হতাশার ছাপ

4:44 pm , July 19, 2023

রিয়াজুল ইসলাম বাচ্চু, ঝালকাঠি ॥ ঝালকাঠিতে পেয়ারার ফলন আশানুরুপ না হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে  চাষীরা। এ বছর  পেয়ারা মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় ঝড়ে গেছে ফুল ও ফল। তাই ফলনও অনেক হয়েছে কম। আবার বৃষ্টির অভাবে পরিপক্ব হওয়ার আগেই ঝড়ে গেছে অনেক পেয়ারা। ফলে ফলন বিপর্যয়ে চাষিদের পাশাপাশি ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরাও। তাদের চোখে মুখে এখন হতাশার ছাপ।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, ঝালকাঠি, বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠি উপজেলার ৫৫ গ্রামে ফলন হয় পেয়ারার। এই এলাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে ‘পেয়ারা’ অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও জীবিকার অবলম্বন। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এসব এলাকার নদী-খালজুড়ে পেয়ারার সমারোহ।
দেরীতে ফুল এলেও বৃষ্টি না হওয়ায় সেই ফুল অনেকটাই ঝড়ে গেছে। আষাঢ়ের শেষ সময়েও পেয়ারা পরিপক্ব হয়নি। বিক্রির জন্য এখনো পরিপক্ব হতে আরও ১৫ দিন সময় লাগবে। যে পরিমাণ অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়েছে তাতে আশানুরূপ ফলন না হওয়ায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষীরা।
ভিমরুলী, শতদশকাঠী, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়াকাঠী, জগদীশপুর এলাকা ঘুরে জানা যায়, বিভাগে কম-বেশি সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পেয়ারার চাষ হলেও বরিশাল জেলার বানারীপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি ঘিরেই মূলত পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ।
বানারীপাড়ার ১৬ গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠির ১৩ গ্রামে ৩৫০ হেক্টর, স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামে ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। স্থানীয় চাষিরা জানান, প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে বিচ্ছিন্ন আবাদ হলেও ১৯৪০ সাল থেকে শুরু হয়েছে পেয়ারার বাণিজ্যিক আবাদ।
এ আবাদ ক্রমশ বাড়ছে। ২০২২ সালে অন্তত ১৯৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক পেয়ারার আবাদ হয়েছে। এ সময় ফলন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারা। কিন্তু এবছর ফলন কম হওয়ায় ১০ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদন হবে কিনা তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন পেয়ারা চাষিরা।
কৃষকরা বলছেন, মাঘ-ফাল্গুন মাসে পেয়ারা গাছের গোঁড়া পরিষ্কারের পর সার প্রয়োগ করতে হয়েছে। কাঁদা মাটি দিয়ে গোঁড়া ঢেকে দিয়েছি। তাতে প্রতিটা গাছের গোঁড়ায় গড়ে ৩০০ টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। পেয়ারা গাছে যে পরিমাণ ফুল এসেছিল এবছর বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তা অনেকটাই ঝড়ে গেছে। লাভ তো দূরের কথা, আসল খরচের টাকাই ওঠে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
হতাশা প্রকাশ করে তারা আরও বলেন, সরকার কৃষকদের জন্য অনেক কিছুই দেয়। আমরা প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষক। সারাদিনই কৃষি নিয়ে পড়ে থাকি। তাই কারও কাছে যেতে না পারায় কৃষি সার ও বীজ কোনো কিছুই পাইনি। পেয়ারা আমাদের মৌসুমি আয়ের একমাত্র অবলম্বন। পেয়ারার ফলন ভালো হলে আমাদের স্বচ্ছলতা আসে। পানির ওপরেই ভাসমান হাটে বছরে কোটি টাকার লেনদেন হয়। অস্থায়ী কিছু দোকান পাট বসে পাইকার, পর্যটক/দর্শনার্থীদের আপ্যায়নের বা ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যমে ব্যবসা করে আর্থিকভাবে লাভবান হন বিক্রেতারা। কিন্তু পেয়ারার ফলন কম হওয়ায় পাইকার আগমনসহ সবকিছুতেই এর একটা খারাপ প্রভাব পড়বে।
কৃষকরা আরও বলেন, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসেই পেয়ারা গাছে ফুল আসতে শুরু করে। তবে বৃষ্টি শুরু না হলে পেয়ারা পরিপক্ব হয় না। জমি ভালো হলে হেক্টর প্রতি ১১-১২ টন পেয়ারার উৎপাদন হয়। কিন্তু এবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে অনাবৃষ্টির কারণে ফুল ঝরে যাওয়ায় পেয়ারার ফলন অনেক কম হয়েছে।
পর্যটক ব্যবসায়ী রনক হালদার বলেন, পেয়ারা মৌসুমকে ঘিরে দেশি-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক আসেন। আগে শুধুমাত্র নৌপথে আসতেন। এখন পদ্মা সেতুর সুবাদে সড়ক পথেও আসছেন। পর্যটকদের সংখ্যাও গতবছর থেকে বেড়েছে। পেয়ারা চাষিদের বাগানে ঢুকে ক্ষতি সাধন হওয়ায় আমরা পেয়ারা বাগানে নান্দনিক ভ্রমণের সুযোগ করেছি। কিন্তু এবছর যেভাবে পেয়ারার ফলন তাতে তেমন পর্যটক বা দর্শনার্থীরা আসবেন বলে মনে হয় না।
কারণ পর্যটক বা দর্শনার্থীরা ফেরার সময় কিছু পরিমাণ পেয়ারা কিনে নিয়ে যান। পেয়ারার ফলন কম হওয়ায় সবদিক থেকেই লোকসানের মুখে পড়বে এখানকার লোকজন। পেয়ারা চাষি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভবেন হালদার বলেন, কৃষির ফলনে সবচেয়ে সুবিধাজনক হলো স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টি। কিন্তু এবছর পেয়ারা গাছের পরিচর্যা সঠিকভাবে করা হলেও বৃষ্টি না থাকায় যে পরিমাণে ফুল এসেছিলো তার বেশিরভাগই ঝরে গেছে।
এখন পেয়ারা গাছে যে পরিমাণ ফল আছে তাতে খরচ পোষানোই দুঃসাধ্য ব্যাপার। ধারণা করছি সবমিলিয়ে এবছর পেয়ারা চাষিদের ৩ কোটি টাকারও বেশি লোকসান হবে। ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ১৩ গ্রামে ৩৫০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ হয়। পেয়ারা মৌসুমে এলাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে ‘পেয়ারা’ অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও জীবিকার অবলম্বন। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফুল বহুলাংশে ঝরে টরেছে।
ঝালকাঠির রমজানকাঠি কারিগরি কৃষি করেজের কৃষিবিদ ড. চিত্তরঞ্জন সরকার বলেন, ”তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খড়ায় এ বছর পেয়ারার ফলন ভালো হয় নাই। তাই চাষীরা লোকসানের মুখে পড়তে পারে।”

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT