নৌকার প্রার্থী ঘোষনার পর পরই ব্যাপক পরিবর্তন বরিশালের রাজনীতিতে নৌকার প্রার্থী ঘোষনার পর পরই ব্যাপক পরিবর্তন বরিশালের রাজনীতিতে - ajkerparibartan.com
নৌকার প্রার্থী ঘোষনার পর পরই ব্যাপক পরিবর্তন বরিশালের রাজনীতিতে

3:56 pm , April 16, 2023

বিসিসি নির্বাচন
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়া মাত্রই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে বরিশালের রাজনৈতিক মাঠে। এতোদিন চুপ করে থাকা নগরবাসী মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদের মুখে প্রথমেই যে দুটি নাম উচ্চারণ হলো তারা হচ্ছেন আওয়ামী লীগের মাহমুদুল হক খান মামুন ও জাতীয় পার্টির প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস। যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবেনা তাই এই দুজনের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুঁজছিলেন নগরবাসী। তাদের এই চিন্তায় ছেদ পড়েছে বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এর চাচা খোকন সেরনিয়াবাত আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায়। তবে মাহমুদুল হক খান মামুন নির্বাচন করছেন না।
আগামী ১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে বরিশালে আলোচনা ছিলো কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন। সরাসরি এ নিয়ে কেউ কোনো মন্তব্য না করলেও ১৫ এপ্রিল শনিবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়া মাত্রই বরিশালে আনন্দ মিছিল বের করেছে অনেকে। বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানে হয়েছে ইফতার বিতরণ। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে দেখা গেছে স্বস্তির ছাপ। নগরবাসীর প্রায় আশিভাগ বাড়িওয়ালার চোখেমুখে আনন্দের অনুভূতি।
সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, আমার কাছে পরামর্শ চাইতে এসেছিলো সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। ওকে আমি বারবার বলেছিলাম, তুমি ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণ করে নগরীর উন্নয়ন ঘটাও। তা না করে, সে একসাথে মেঘা প্রকল্প করতে চেয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে কি জনতার সেবক হওয়া যায়।
মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মেয়র নির্বাচিত হয়েই বিসিসির অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকুরীচ্যুত করা উচিত হয়নি তার। এসব কিছুই প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি বিচার বিশ্লেষণ করে মনোনয়ন তারই চাচা খোকন সেরনিয়াবাতকে দিয়েছেন। তিনি বরিশালের রাজনীতিতে অপরিচিত হলেও সেরনিয়াবাত পরিবারের সন্তান হিসেবে ইতিমধ্যেই তিনি নগরীতে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এর ৩০টি ওয়ার্ডের ৩০ জন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাড়া খোকন সেরনিয়াবাত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের খুব একটা জানাশুনা নেই। যে কারণে অনেকেই এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পর অনেকটাই তিনি পরিচিতি হয়েছেন। অন্যদিকে ২৪ নং ওয়ার্ডে রূপতলীর গ্যাসটারবাইন থেকে ধান গবেষণা পথে  ভাঙাচুরা সড়ক দেখিয়ে বিগত ৫ বছরের উন্নয়ন চিত্র দেখালেন কেউ কেউ। ৩০ ও ২৯ নাং ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের মাঝে খান মামুনকে নিয়ে সহানুভূতি শোনা গেল কারো কারো মুখে। এখানে ইতিমধ্যেই সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন জাতীয় পার্টির প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস। বিশেষ করে তার বরিশাল ফরএভার লিভিং সোসাইটির সেবামূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করলেন অনেকেই।
এদিকে নগরীর কলেজ রো, সি এন্ড বি কলোনী, খান সড়ক, কাজীপাড়াসহ বেশিরভাগ এলাকায় উঠে এসেছে খান মামুনের নাম। নগরবাসীর কাছে তিনি বেশ পরিচিত। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতাকে এবার অন্তত মূল্যায়ন করবে আওয়ামী লীগ এমনটাই আশা ছিল বেশিরভাগ মানুষের। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে খান মামুনের অবদান স্মরণ করে হলেও তাকেই মনোনয়ন দেয়া উচিত ছিলো বলে স্পষ্ট জানালেন বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষক এনায়েত হোসেন শিবলু। তিনি বলেন, আসলে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে, নরম-সরম ভদ্রলোক সম্ভবত কেউ আর পছন্দ করে না।
নগর চিন্তাবিদদের একজন কাজী মিজানুর রহমান বললেন,  সার্বিক বিবেচনা ও বরিশালের উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী যেই হোক তাকেই মূল্যায়ন করা উচিত হবে। কেননা,  গত পাঁচ বছর বরাদ্দ পায়নি বিসিসি। সেটা পুষিয়ে নিতে হলে এর বিকল্প নেই।
বীরপ্রতীক মহিউদ্দিন মানিক বলেন যোগ্যতার মূল্যায়ন করেন আওয়ামী লীগের প্রধান। তিনি রাজশাহী ও সিলেটের উন্নয়ন ঘটিয়ে তা দেখিয়ে দিয়েছেন। এখানে মাহমুদুল হক খান মামুন অনেকের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন। তবে যত যাই হোক খোকন সেরনিয়াবাতও খুব চমৎকার মানুষ এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ৭৫ এর ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
অন্যদিকে প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণের  মতো একজন খাঁটি বরিশাল প্রেমিক মেয়র চান নগরবাসী। সেই বিবেচনায় হিরনের বন্ধু হিসেবে প্রকৌশলী তাপসও এগিয়ে রয়েছেন নগরবাসীর পছন্দের তালিকায়। কেউ কেউ অবশ্য ইসলামি আন্দোলন ও হাতপাখা নিয়েও কথা বললেন। জানালেন, বিগত ২০১৮ এর নির্বাচন যেমনই হোক হাতপাখার ভূমিকা ছিলো প্রশংসনীয়। নির্বাচন স্বচ্ছ হলে হাতপাখার বাতাসেই ভর করতেন পারবেন নগরবাসী।
অন্যদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের অনেকেই বলেছেন, মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এর অনেক সুযোগ ছিলো বরিশালের উন্নয়নের। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিনি তেমন কিছুই করতে পারেননি। উল্টো সবকিছুতেই সমালোচিত হয়েছেন। গোঁয়ার্তুমি ছাড়া তার ঝুড়িতে আর কিছুই প্রাপ্তি নেই বলে জানালেন বাসদ নেত্রী ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ট্যাক্সের বোঝা ছাড়া তার কাছে আর কিছুই পায়নি বরিশালবাসী। তিনিই একমাত্র মেয়র যার সময় কোনো বরাদ্দ পায়নি বরিশাল সিটি করপোরেশন। উল্টো তিনি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
অপরদিকে সাদিক আবদুল্লাহর সমর্থনে বেশকিছু নেতাকর্মী বলেছেন, ৩০টি ওয়ার্ড সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এসব ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে প্রকাশ্যে না নামলে তার জন্য দীর্ঘপথ পারি দেওয়া কষ্টকর হবে।
মনোনয়ন পেয়েই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘গত পাঁচ বছরে বরিশালে কোনও উন্নয়ন হয়নি। নগরবাসী আমাকে নির্বাচিত করলে তাদের প্রত্যাশা পূরণে শতভাগ স্বচ্ছ থেকে কাজ করার চেষ্টা করবো এবং প্রধানমন্ত্রী যে বিশ্বাসে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন সে বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবো।’
এর আগে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তিনি বলেন, আমি জেলা শহর পটুয়াখালীতে গিয়েছি। সেখানকার উন্নয়ন দেখে আমার কষ্ট লেগেছে। যার ছিটেফোঁটাও বরিশালে হয়নি। এ কারণে বরিশালের উন্নয়নে আমাকে প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই প্রয়োজন এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নগরবাসী। তারাও চাচ্ছেন, আমি সিটি মেয়র নির্বাচিত হয়ে তাদের উন্নয়নে শতভাগ স্বচ্ছ থেকে কাজ করি।’
তাছাড়া চাচা-ভাতিজার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহামুদুল হক খান মামুন। যদিও তিনি এখন সম্পূর্ণ নিরবতা পালন করছেন। তারপরও তার ভক্ত ও অনুসারী সংখ্যা কম নয়। অন্যদিকে বিসিসি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টি থেকে এক বছর আগেই মেয়র পদে লড়তে মনোনয়ন নিশ্চিত করে রাখা হয়েছে। দলটি থেকে নির্বাচনে লড়বেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের এর উপদেষ্টা প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস। মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই তিনি বরিশালের হতদরিদ্র মানুষের মাঝে কাজ শুরু করেছেন। এমনকি তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ফরএভার লিভিং সোসাইটি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ওই সংগঠনে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার সদস্য রয়েছে মহানগরীতে। কম্পিউটার ট্রেনিং, গার্মেন্টস প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং, পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সেবা দিয়ে যারা প্রতিনিয়ত বরিশালের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে।  এ সম্পর্কে প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে বরিশাল ফরএভার লিভিং সোসাইটি গড়ে তুলেছিলাম। এটির কাজ এখন মহানগরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও বরিশালের বিভিন্ন উপজেলাতেও এটি কাজ করবে। প্রশিক্ষিত  ও স্বাবলম্বি যুবসমাজ তৈরি এই সংগঠনের ভিত্তি।
তাপস আরো বলেন, আমি মনোনয়ন পাওয়ার পর এই সংগঠনের কাজের গতি ও পরিধি বেড়েছে। এটি  এতোদিন অনেকটা ছায়া সিটি করপোরেশনের মতো কাজ করেছে। নগরীর জলাবদ্ধতা, যানজট ও পরিকল্পিত নগরায়ন ঘটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এই সংগঠন আমাকে সাহায্য করতে পারবে। তাছাড়া জনগণ যদি আমাকে নির্বাচিত করেন তাহলে সবার আগে আমি বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(বউক)গঠনের মাধ্যমে সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়েই বাণিজ্যিক নগরী  হিসেবে বরিশালকে প্রতিষ্ঠিত করবো ইনশাআল্লাহ।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও বরিশাল মহানগরের সভাপতি সৈয়দ ফয়জুল করিম জানিয়েছেন, তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। দু একদিনের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেয়া হবে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT