হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ - ajkerparibartan.com
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ

3:56 pm , January 21, 2023

কে এম আজাদ রহমান, আগৈলঝাড়া ॥ প্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়ায় দিন দিন কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ। গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার কিংবা খোলা মাঠের মঞ্চে এখন আর চোখে পড়ে না পুতুল নাচের আসর। পুতুল নাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থকষ্টে দিন পার করছে আগৈলঝাড়ার ঐহিত্যবাহী “দি তিশা পুতুল নাচ”সহ অন্তত ৫টি পতুল নাচের দলের  মালিক ও শিল্পীরা। পুরনো পেশা আগলে রেখে এ পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলো অর্থের অভাবে করছেন মানবেতর জীবন যাপন। একটি সূত্র জানায়, পুতুল নাচের আড়ালে অসাধু ব্যবসায়ীরা অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শনের অভিযোগ তোলায় পুতুল নাচের অনুমতি বন্ধ রাখা হয়েছে। আলম গাজী, উপেন হালদারসহ স্থানীয়রা জানান, এক সময় গ্রামগঞ্জ, হাট-বাজার কিংবা খোলা মাঠে মঞ্চ সাজিয়ে বসতো পুতুল নাচের আসর। রঙ-বেরঙের বাহারী পুতুল সাঁজিয়ে তার সাথে সুতা বেঁধে হাতের কারুকাজের পাশাপাশি বাদ্য, গান, নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হতো ‘এক ফুল দুই মালি’, ‘কাশেম মালার প্রেম’, বেহুলা সুন্দরী, নৌকা বাইচ, ‘সাগরভাসা’সহ বিভিন্ন পালা। পুতুল নাচের এই পালা দেখতে ১০ থেকে ২০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে ভীড় করতো দর্শনার্থীরা। এখন আর চোখে পড়ে না সেই দৃশ্য। প্রযুক্তির অপব্যবহার ও অসাধু লোকজনের কারসাজিতে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই পুতুল নাচ। সরকারিভাবে ঐতিহ্যবাহী এই পুতুল নাচ প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বরিশালের আগৈলঝাড়ার পেশাদার পুতুল নাচের সংগঠন এর মালিক ও শিল্পীরা।
আগৈলঝাড়ায় ৫টি পুতুল নাচের দল ছিলো। এদের মধ্যে দি তিশা পুতুল নাচ, দি গ্রাম-বাংলা পুতুল নাচ, দি থ্রি-স্টার অপেরা,  মনফুল পুতুল নাচ, দি আল্পনা পুতুল নাচ।
পুতুল নাচের দলের সাথে জড়িত মানিক বিশ্বাস, পপি ভাকুক, সজল বালাসহ শিল্পীরা জানান, এক সময় পুতুল নাচের আসর নিয়ে তারা ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে সময় পার করতেন। কিন্তু ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে পুতুল নাচের আসর না পাওয়ায় আয় রোজগার বন্ধ। তাই পেশা বদল করে এখন দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন তারা। এক একটি পুতুল নাচের দলে ২০-২৫ জন লোক কাজ করতো। প্রতি রাতে তিনটি করে পুতুল নাচের শো প্রদর্শন করা হতো। এতে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাভ হতো। একদিনে উপজেলার কদমবাড়ি মেলায় একরাতে সর্বাধিক আড়াই লাখ টাকার পুতুল নাচের টিকিট বিক্রি হয়েছিল। পুতুল নাচের প্যান্ডেলে ৩ হাজার দর্শক বসার ব্যবস্থা ছিলো।
আগৈলঝাড়ার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচের দল দি তিশা পুতুল নাচ এর মালিক ননী সরকার জানান, ২০১১ সালে আমার পুতুল নাচের দলের লাইসেন্স এর মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমি তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে বরিশাল ডিসি অফিসে লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলে লাইসেন্স নবায়ন হবে না বলে আমাকে জানায়। তিনি আরও জানান, আমার পুতুল নাচের দলে শিল্পীসহ ২৫ জন লোক ছিলো। প্রত্যেককে প্রতিদিন ৫শ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত  বেতন দিতাম। আগে প্রতিদিন বিভিন্ন যায়গায় পুতুল নাচের শো দেখিয়ে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় হতো। তবে কিছু কিছু অসাধু লোকজন এই পুতুল নাচের নামে অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শন করানোর কারনে এই পুতুল নাচ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এখন আর কেউ পুতুল নাচের আসরের জন্য তাদেরকে ডাকে না। যে কারনে বর্তমানে ঘরে বসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টাকার পুতুল নাচের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ধরণের পুতুল। তিনি আরো জানান, পুতুল নাচ বন্ধ হওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত রয়েছে।
বিভিন্ন পতুল নাচের দলের মালিক দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুতুলসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ভাড়া করে এনে নিজের দেয়া নামে পুতুল নাচের দল চালাতো বলে জানান দি গ্রাম-বাংলা পুতুল নাচ দলের সাবেক ম্যানেজার জয়ন্ত বিশ্বাস। এ ব্যাপারে ‘আগৈলঝাড়া গ্রীণ থিয়েটার’ এবং ‘ব্যান্ড মাতৃভূমি’র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক স্বপন দাস বলেন, পুতুল নাচের মাধ্যমে আমাদের আবহমান গ্রাম-বাংলার লোকজ সংস্কৃতির নানা দিক ফুটে উঠতো। এক সময় পুতুল নাচ গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ছিলো। তবে দীর্ঘদিন ধরে পুতুল নাচ প্রদর্শন বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে এর পরিচিত হ্রাস পেয়েছে। যদিও কিছু কিছু অসাধু লোকজন বাড়তি লাভের আশায় পুতুল নাচের নামে অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শন করানোর মাধ্যমে যুব সমাজকে বিপথগামী করতো। এ কারনেই হয়তো সরকার পুতুল নাচ প্রদর্শনের অনুমতি দিচ্ছে না। তবে  সরকারের উচিৎ সঠিক তদারকির পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুতুল নাচ প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে এর প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা।
আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পুতুল নাচ প্রদর্শনের অনুমতির বিষয়টি আমার ভালো জানা নেই। লাইসেন্স নবায়নের জন্য আমার কাছে কেউ আসলে আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য বলবো।
এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রইচ সেরনিয়াবাত বলেন, পুতুল নাচ আবহমান গ্রাম বাংলার একটি ঐতিহ্য। পুতুল নাচের মধ্যেদিয়ে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যকে গান ও পুতুলের নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হতো। গ্রামগঞ্জ, হাট-বাজার কিংবা খোলা মাঠে মঞ্চ সাজিয়ে বসতো পুতুল নাচের আসর। পুতুলগুলো ওই দলের সদস্যদের হাতের সাথে সূতোয় বেঁধে আড়ালে থেকে নাচানো হতো পুতুল। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। কতিপয় অসাধু লোকজন এই পুতুল নাচের নামে অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শন করতে শুরু করায় পুতুল নাচ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তবে সঠিকভাবে শুধু পুতুল নাচ প্রদর্শন করলে এখনো মানুষ স্ব-পরিবারে পুতুল নাচ উপভোগ করতে যেত। তাই এই পুতুল নাচ’কে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি দাতা সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT