তীব্র শীতে জুবুথুবু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ তীব্র শীতে জুবুথুবু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ - ajkerparibartan.com
তীব্র শীতে জুবুথুবু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ

3:15 pm , January 5, 2023

সরকারি বরাদ্ধ কম ॥ শীতবস্ত্রের সন্ধানে দুস্থরা

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা তথা দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় এককোটি জনগোষ্ঠী এই মুহূর্তে হাড়কাঁপানো শীতে জুবুথুবু অবস্থা। অবস্থাপন্ন পরিবারগুলো লেপ কম্বল ও পছন্দমতো গরম কাপড়ের ভিতরে আশ্রয় নিতে পারলেও ৭০ ভাগ মানুষের দুর্ভোগ চরমে। সরকারিভাবেও এ বছর শীতবস্ত্রের বরাদ্দ কম বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় প্রশাসন। ফলে একটু গরম কাপড় ও কম্বলের সন্ধানে ছয় জেলার প্রায় ২৫ লাখ মানুষ এ দুয়ার ও দুয়ার ধর্ণা দিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ চলতি বছর সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কেউই এখনো সেভাবে শীতার্তদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। ফলে যার যেটুকু অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সে তা নিয়েই ছুটছেন জেলা ও বিভাগীয় শহরের গরম কাপড় বিক্রির দোকানে। তাদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বরিশালের সামাজিক ও রাজনৈতিক সেবা তৎপরতায়। এখানে অসহায় মানুষের মাঝে জেলা প্রশাসন থেকে কিছু কম্বল দেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কর্ণেল অবঃ জাহিদ ফারুক এর পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতা খান মামুন বিভিন্ন মাদ্রাসায় কম্বল বিতরণ করছেন বলে জানান তিনি। অন্যদিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আওয়ামী লীগের জেলা সহ-সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু বেশ কিছু কম্বল বিতরণ করেছেন শহর এলাকা ও আশপাশে। তবে তাও খুবই সীমিত আকারের। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস তার ফরএভার লিভিং সোসাইটি এর মাধ্যমে নগরীর এলাকায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে কিছু শীত কাপড় বিতরণ করেছেন। আর ডা. মনীষা চক্রবর্তী এখনো ব্যস্ত শীতার্তদের জন্য তহবিল সংগ্রহে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সংকট কেটে গেলেই ত্রাণ তৎপরতা বাড়ে নেতাদের। শীত চলে গেলে তখন গরম কাপড় পেলে কি লাভ হবে আমাদের? তবে সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৩০টি ওয়ার্ডে বসবাসকারী অসহায় হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। পাঁচ হাজার কম্বল বা গরম কাপড় এই মানুষের জন্য কিছুই নয়। সেক্ষেত্রে জেলায় কম হলেও প্রায় ১ লাখ মানুষের জন্য গরম কাপড়ের চাহিদা রয়েছে বলে জানালেন সমাজিক আন্দোলনের নেতা ও বরিশাল অর্থনীতি সমিতির সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান। আর বরিশালের বিভাগের জন্য এ চাহিদা কম হলেও ১০ লাখের উপড়ে বলে জানান পরিবেশ আন্দোলনের নেতা এনায়েত হোসেন শিবলু। অথচ বিভাগের জন্য চলতি বছর শীতবস্ত্র বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ১ লাখের মতো বলে জানা গেল বিভাগীয় কমিশনার অফিস সুত্রে।
এদিকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের কারণে এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা ক্রমশ বেড়েই চলছে। পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনা জেলার ওপর দিয়ে বইছে হিমেল হাওয়া। দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা এই মুহূর্তে যশোর জেলায় । সেখানে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে বলে জানালেন আবহাওয়া অফিস। বরিশালে যা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে গতদিন সকালে। তবে দুপুরে তা বেড়ে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়েছে। গড় তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১১ থকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাশাপাশি মৃদু বাতাসের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বৃদ্ধ ও শিশুরা। শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে কৃষক ও রাইড শেয়ারিং এর বাইক চালকদের দুর্ভোগ চরমে। তারা গত তিনদিন অনেকটা উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন। কোথাও কোথাও খাদ্যাভাবও দেখা দিয়েছে। ধার দেনা করে বরিশালের মহসীন মার্কেটে ও নগর ভবনের সামনে ফুটপাতের গরম কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছে শীত কাপড় কিনতে ভীড় করছেন অনেকে। এমননি একজন ক্রেতা পটুয়াখালী জেলার লেবুখালীর বাইক চালক মোজাম্মেল জানালেন, গরম কাপড় কিনতে গতদিন পটুয়াখালী নিউমার্কেটে গিয়ে দেখি হাজারের উপড়ে দাম চাচ্ছে একটি জ্যাকেট। তাই বরিশালে এসেছি কিনতে। ওখানে প্রচুর শীত। গত কয়েকদিন ধরে বাইক চালকদের উপার্জন বন্ধ হয়ে আছে। এই শীতে গরম কাপড় পড়েও বাইক চালানো সম্ভব নয় বলে জানান মোজাম্মেল। বরিশালের মহসীন মার্কেট ও নগর ভবনের সামনের ফুটপাতে গরম কাপড়ের ক্রেতার ভিড় চোখে পড়ার মতো। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি শিশু সন্তান নিয়ে মায়েদের ভিড়ও কম নয়। এমনই এক মা আমেনা বেগম জানালেন, গরিবের জন্য এই ফুটপাতের দোকানের পুরাতন কাপড়ই ভরসা।
এখানের দোকানগুলোতে কানটুপির চাহিদা অনেক বেশি। ১০০/১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে একটি কানটুপি। জ্যাকেট পাওয়া যাচ্ছে ৩০০/৫০০ টাকার মধ্যে।
কিন্তু ব্রান্ডের দোকানগুলোতে হাজারের নীচে কোনো গরম কাপড় নেই। পোশাক বাজার ঘুরে এচিত্র দেখা গেছে বরিশালের সদর রোডে, হেমায়েত উদ্দিন সড়ক, মহসীন ও সিটি মার্কেটে।
এদিকে গত ৪ জানুয়ারী বুধবার সকালে বরিশালে শীতের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় ১১ কিলোমিটার। যা আরো কয়েকদিন একই ধারাবাহিকতায় চলবে বলে জানিয়েছেন বরিশাল আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, দেশে মাঝারি শৈত্য প্রবাহের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলে বেড়েছে শীতের প্রকোপ। রাতে তাপমাত্রা আরো কমতে পারে বলেও জানান এই পর্যবেক্ষক।
নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট বিশেষ করে লঞ্চঘাট ও বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, শীতে রীতিমতো জুবুথুবু মানুষ। গায়ে গরম কাপড় ও টুপি পরিধান করে তারা শীতের দাপট থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা এবছর এখনো কোনো গরম কাপড় পাননি বলে জানান।
পাবে কি করে এ বছর গরম কাপড়ের চাহিদা অনেক সরকারি বরাদ্দ এসেছে কম দাবী করে সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মধু বলেন, তার উপজেলায় এক একটি ইউনিয়নে জন্য মাত্র দুইটা কম্বল ভাগে পেয়েছেন তিনি মোট কম্বল পেয়েছেন ১৫০ টি। তিনি আরো বলেন, ৫০০০ কম্বল পেলে মানসম্মান থাকে।
প্রায় একই কথা বলেন বাবুগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ফারজানা বিনতে ওহাব। তিনি জানালেন, তার এলাকার ছয় ইউনিয়নে হতদরিদ্র মানুষের জন্য কম্বলের চাহিদা কম হলেও ৫ হাজার। অথচ তিনি পেয়েছেন মাত্র ৮৫ টি কম্বল এ বছর। গত বছরের তুলনায় এটা খুবই কম বলে জানান ফারজানা বিনতে ওহাব।
এদিকে সদর উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদ খান জেলা পরিষদ থেকে ১৪৭টি কম্বল পেয়েছেন বলে জানালেন। তিনি তার মেম্বারদের প্রত্যেককে ১০টি করে দিতে পেরেছেন।
বরিশালের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সোহেল মারুফ জানালেন, এবার জেলায় কম্বল এসেছে ১৪ হাজার। প্রতিবার যে কম্বল আসে তারচেয়ে অনেক কম বরাদ্দ হয়েছে চলতি বছর। ফলে একেকটি উপজেলা সাড়ে তিনশো এর মত কম্বল পেয়েছে বলে জানান সোহেল মারুফ।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় কমবেশি এক লাখ কম্বল বরাদ্দ হয়েছে বলে জানালেন বিভাগীয় কমিশনার আমিন উল আহসান। তিনি বলেন, এটা কোনো চাহিদা অনুসারে আসেনি। সরকারের নিয়মিত বরাদ্দের অংশ হিসেবে এসেছে। বরিশাল ও পটুয়াখালীর জন্য ১৪ হাজার করে, ভোলা ও বরগুনার জন্য কিছু বেশি ঝালকাঠি, পিরোজপুরের জন্য আবার কিছু কম এভাবে বরাদ্দ এসেছে। তবে গতবারের তুলনায় সব জেলাতেই কম বরাদ্দ এসেছে এবার।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT