শতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির বহুবিধ কর্মকান্ড এবং বিরাজমান সংকট সমাধানের প্রত্যাশা শতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির বহুবিধ কর্মকান্ড এবং বিরাজমান সংকট সমাধানের প্রত্যাশা - ajkerparibartan.com
শতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির বহুবিধ কর্মকান্ড এবং বিরাজমান সংকট সমাধানের প্রত্যাশা

2:55 pm , January 3, 2023

= দাশগুপ্ত আশীষ কুমার =
প্রবীণ শিক্ষক নেতা

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (BTA) একটি জাতীয় ভিত্তিক শিক্ষক সংগঠন। শর্তবর্ষ প্রাচীন কোন শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ কেন সমগ্র উপমহাদেশেও নাই। ১৯২১ সালে পরাধীন ভারত বর্ষে অবিভক্ত বাংলায় (BTA) নামে এই সংগঠনের জন্ম। পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের নানা পট পরিবর্তনের কারণে ABTA থেকে EPTA এবং পরিশেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি পর্বে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বাঙালির আত্ম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার তাগিদ থেকে EPTA পরিবর্তন করে BTA রাখা হয়। নামের এই পরিবর্তন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিলনা। ছিল জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের অঙ্গিকারের নিদর্শন মাত্র।
এই অঙ্গিকারও শুধু কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ ছিলনা। মুক্তিযুদ্ধে এই সংগঠনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রসংশিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি প্রবাসী সরকারের সংগে সম্পূর্ণ সমন্বয় রক্ষা করে শারনার্থী শিবিরগুলোতে ক্যাম্প স্কুল প্রতিষ্ঠা করে শিশু কিশোরদের শিক্ষাদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সামান্য সম্মানীর বিনিময়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শিক্ষক সমিতির সদস্যগণ শিক্ষাক্রম পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগে সংশ্লিষ্টতার কারণে বুদ্ধিজীবী হিসাবে দেশের অভ্যন্তরে শতশত শিক্ষক নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের শিকার হন।
অগণিত তরুন শিক্ষক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ইঞঅ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত মূল্যবোধ এবং আদর্শের সংগে সংগতি রেখে দেশে বিজ্ঞান ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু এবং বেসরকারি শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সুষ্পষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির এই আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য এই সংগঠনের নেতা কর্মীরা স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির নিষ্ঠুর টার্গেটে পরিণত হয়। তা সত্ত্বেও এই সংগঠন দেশের বেসরকারি শিক্ষকদের পেশাগত দাবি আদায়, সমগ্র দেশে এক ধারার শিক্ষা চালু, শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি বৈষম্য দূর এবং শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের এক স্মরণীয় অধ্যায় সৃষ্টি করে। দেশে স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই সংগঠনের অবদানও এক স্মরণীয় ইতিহাস। শিক্ষকদের একটি পেশাজীবী সংগঠনের এ ধরনের বহুমাত্রিক কর্মকান্ডের দৃষ্টান্ত এদেশে বিরল।
বরিশালবাসী ভাগ্যবান যে, মরহুম এম.এ. গফুর এর মত একজন কীর্তিমান শিক্ষাবিদ ও আদর্শবান মুক্তমনা সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব বরিশালে জন্মেছিলেন। এই আদর্শবাদী সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের ধারবাহিক কর্মপ্রচেষ্টার ফলে এই অঞ্চলে বেসরকারি শিক্ষক সমাজ সুসংগঠিত এবং বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (ইঞঅ) একটি শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মরহুম এম.এ. গফুরের মনুষ্যত্ববোধ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিল অসীম সাগরের মত। বিশেষ করে শিক্ষক সমাজের প্রতি অপরিসীম দরদ এবং সামাজিক কর্তব্য পালনে তিনি ছিলেন সাহসী যোদ্ধা। তাঁর নেতৃত্বে বরিশালে নির্মিত হয় শিক্ষকদের ঐক্য এবং স্বয়ংভরতার নান্দনিক প্রতীক বহুতল বিশিষ্ট ‘শিক্ষক ভবন’। বরিশালে শিক্ষা বোর্ড ও টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ, ডি.ডি.পি.আই অফিস রক্ষার মত বহুবিধ সামাজিক কাজের অগ্রনায়ক ছিলেন শিক্ষক নেতা এম.এ গফুর। ২০০২ সালের শেষ ভাগে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এই কীর্তিমান সংগ্রামী পুরুষের জীবনবসান হয়। তার এই আকস্মিক জীবনাবসানে বরিশাল (ইঞঅ) নেতৃত্বের মধ্যে সংকট সৃষ্টি হয়। ইঞঅ এর ভবনসহ অন্যান্য সম্পদ আত্মসাতের অসৎ উদ্দেশ্যে একটি ক্ষুদ্র চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের প্রবল প্রতিরোধের জন্য অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থে তারা ব্যর্থ হয়। সংগঠনের প্রকৃত নাম বিকৃত করে সমিতির জমি ক্রয়ের দলিলে সংগঠনের নামের সঙ্গে ব্রাকেটে উল্লেখিতÑকামরুজ্জামান গ্রুপ নাম ব্যবহার করে ঐ চক্রটি একটি পৃথক সংগঠন দাড় করায়। শিক্ষক সমিতির সম্পদ ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহারের অসৎ উদ্দেশ্যেই ঐ মহলটি সম্পত্তির দখল প্রচেষ্টায় মেতে ওঠে। বরিশালের সুধী মহল, দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিবৃন্দ অগ্রণী হয়ে এই সংকট দূর করে শিক্ষকদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করেও ঐক্য বিনষ্টকারী চক্রটিকে ঐক্যের পথে আনতে সমর্থ হননি।শিক্ষক ভবনে বর্তমানে অবস্থানকারী কমিটি নেতৃবৃন্দ প্রকৃত পক্ষে মরহুম এম.এ. গফুরের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী। বর্তমান নেতৃত্বের কর্মকান্ড বরিশালের সর্বস্তরের জনগণ কর্তৃক প্রসংশিত। শিক্ষকদের মধ্যে এই নেতৃত্বের ভিত অত্যন্ত শক্তিশালী ও ব্যাপক। বরিশালের সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক, এন.জি.ও এবং শিক্ষাসহ সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে বর্তমান নেতৃত্ব কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। এদেশের শিক্ষক আন্দোলনের বরেণ্য নেতা এবং শিক্ষক সমিতির দীর্ঘকালীন সভাপতি অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান যে সংগঠনে ছিলেন গঠনতন্ত্র মোতাবেক সেই সংগঠনের পরবর্তী নির্বাচিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শিক্ষক ভবনের অবস্থানকারী কমিটির প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। জাতীয় দুর্যোগ, করোনা মহামারি, ঝড়Ñবন্যা, শিক্ষক সমাজের দুঃসময়ে পাশে দাড়ানো শিক্ষক সংগঠনের নাম বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি। সংগঠনের দীর্ঘ ইতিহাসের কর্মকান্ডের খতিয়ান খুঁজে পাওয়া যায় সমিতির নাম বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি। এই নামে আরো কয়েকটি শিক্ষক সংগঠন থাকায় ফকির বাড়ি রোডের জমি ক্রয়ের দলিলে শুধুমাত্র পৃথক পরিচিতির জন্য ব্যাকেটে কামরুজ্জামান গ্রুপ শব্দ দুটি যুক্ত করা হয়। আর এই ব্রাকেটকে পুজি করেই চলছে শিক্ষকদের কল্যান কাজে নিয়েজিত কর্মকান্ডে মুখর একটি সংগঠনের সম্পদ দখলের অসৎ পায়তারা। সাধারণ শিক্ষকদের স্বতর্স্ফত প্রতিরোধে সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সত্যের জয় অনিবার্য। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের একটি বিবেচনা প্রসূত সঠিক সিদ্ধান্তই ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT