জীবনের শেষ বয়সে পাকা ঘরে থাকতে চান আব্দুস সাত্তার বীর-উত্তম জীবনের শেষ বয়সে পাকা ঘরে থাকতে চান আব্দুস সাত্তার বীর-উত্তম - ajkerparibartan.com
জীবনের শেষ বয়সে পাকা ঘরে থাকতে চান আব্দুস সাত্তার বীর-উত্তম

3:36 pm , December 10, 2022

সাইদ মেমন ॥ মুক্তিযুদ্ধে সাহসীকতার অবদানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাব বীরোত্তম। মাত্র ৬৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ খেতাব পেয়েছেন। তাদেরই একজন বরিশাল নগরীর বাসিন্দা ল্যান্স নায়েক আব্দুস সাত্তার। বুকে, পেটে ও পায়ে তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো বেঁচে আছেন তিনি। গেজেটের ৪৬ নং খেতাবপ্রাপ্ত এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে ৮২ বছর বয়সী এ বীর মুক্তিযোদ্ধার দিন কাটে নগরীর গণপাড়া এলাকার বাড়িতে গৃহস্থলি কাজে। যে মাটির টানে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, সেই মাটির ঘর ও উঠানকে ঘিরেই চলে তার কর্মযজ্ঞ। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘরের আশে-পাশে মাটিতে শাক-সবজি ফলানো ও পরিচর্যার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। প্রচার বিমুখ এ মানুষটি নীরবে নিভৃতে থাকতেই পছন্দ করেন। কারণ হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা এ মানুষটি বললেন, সবখানেই অনিয়ম। দেশ স্বাধীন হলেও, দেশের সকল ক্ষেত্রেই বিরুপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। তখন আর চুপ থাকতে পারেন না। প্রতিবাদী হয়ে উঠেন। আর এতেই শুরু হয় যত বিপত্তি। তাই বাড়ীর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
কারণ হিসেবে বলেন, এত বড় একটা খেতাব লইয়া রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। এজন্য নিজের উপর চাপ অনুভব করি।
তিনি বলেন, বাড়ি-গাড়ি পেতে যুদ্ধ করিনি। দেশকে মুক্ত করতে হবে, তাই কোন কিছু না ভেবেই সেই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে নেমে পড়ি যুদ্ধে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার বলেন, ১৯৬৬ সালের ১২ আগষ্ট ইপিআর বাহিনীতে যোগ দেন। ঢাকার পিলখানায় প্রশিক্ষন শেষে রাজশাহী উইংয়ে যোগদান করেন।  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালি সদস্যদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ইপিআর বাহিনীর সাহসী যোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৃতীয় রেজিমেন্টে আব্দুস সাত্তারকে একীভূত করা হয়। ব্রিগেড হিসেবে জেড ফোর্সের সূচনা লগ্নে যুক্ত হয়ে তেলঢালায় প্রশিক্ষন নেয়। সেখান থেকে মেজর শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে পুনরায় যুদ্ধে ফিরে আসেন। তিনি ময়মনসিংহের ধানুয়া-কামালপুর, সিলেটের গোয়াইনঘাট, ছাতক, টেংরা টিলা, গোবিন্দগঞ্জসহ বিভিন্নস্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। এসব যুদ্ধে অনন্য বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ন অবদান রাখেন।
যুদ্ধে স্মরনীয় ঘটনা সম্পর্কে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার বলেন, পাক বাহিনীর অস্ত্র বোঝাই তিনটি গান বোট কোদালকাঠি এলাকায় নোঙ্গর করা ছিলো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিনামাইট ধ্বংস করেন। যা মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি অতুলনীয় ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেন। এছাড়া এক পাঠান পাঞ্জাবী পাক সেনাকে নিজে ধরে মেজর শাফায়াত জামিলের কাছে হস্তান্তর করেন।
দেশকে মুক্ত করার উৎসবের দিনটিতে তিনি অংশ নিতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ৭ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে তিনটি গুলিতে বিদ্ধ হন তিনি। সেখান থেকে তাকে ভারতের শিলংয়ে সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। মার্চ মাসে তাকে স্বাধীন দেশে নিয়ে আসা হয়। হেলিকপ্টারে করে পুরাতন বিমান বন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে সিএমএইচ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে একমাস চিকিৎসার পর তৃতীয় ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে ফেরৎ পাঠানো হয়।
ভারত থেকে তার ইউনিট ও সিওকে বলেছে, জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ যদি বড় খেতাব পায়, তার মধ্যে মো. আব্দুস সাত্তারকে সেই খেতাব দেয়া হোক।
যুদ্ধের ৯ মাস ও চিকিৎসার তিনমাস এই এক বছরে তার কোন হদিস জানতো না পরিবার। সবাই ভেবেছে আমি মারা গেছি।
তিনি বলেন, সহযোদ্ধা বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা ক্যাপ্টেন নুরুল ইসলাম জানিয়েছে, যুদ্ধে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তারপর তাকে ভারতে নিয়ে গেছে। এরপর তার কি হয়েছে। বেঁচে আছেন না মরে গেছেন। তা তিনি জানেন না।
তাই সবাই ভেবেছিলো তিনি মারা গেছেন। বীর এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘বাড়ীতে ফিরে আসার পর সবাই খুব খুশি হয়েছে। বাড়িতে আসার পরে বাবা তিনশ টাকায় একটি গরু ছাইড়া দিছে। জানের বদলে জান দিয়েছে।’ তার স্ত্রী রেহেনা পারভীন বলেন, ‘উনি যখন নিখোঁজ ছিলো, তখন আমার বাবা-মায় আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমারে আবার বিয়ে দেবে। কিন্তু আমি বিয়া বই নাই। এই বইলা আমি রইছি।আমার মনে কইছে হে আছে। না আল্লে পেন্দনের কাফুর, না আল্লে কিছু। হেইভাবে রইছি। হেরপর খবর পাইয়া এই বাড়ি আইছি।’ তার ভাষায়, ‘সমন্ধ আইছে, আমার বড় বোনাইরে খামার দিয়া ফিরাইয়া দিছি’।  দেশ স্বাধীন করেছেন, পেনশন, রেশন ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পাচ্ছেন। তা নিয়ে তিনি খুশি। আর কারো কাছে কোন কিছু চাওয়ার নেই। কারণ চেয়েও পাননি। তাই এখন আর কারো কাছ থেকে কিছু চান না জানিয়ে বলেন, টিনের ঘরে মাটির ফ্লোরে থাকছেন। তাই একটু পাকা ঘরে থাকার ইচ্ছে ছিলো। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৫/৭ বার আবেদন করেছেন। এর মধ্যে একবার মাত্র ৬ লাখ টাকার একটু বেশি ব্যয়ে একবার বাড়ি করে দেয়ার জন্য এসেছিলো। এ টাকায় কিভাবে পাকা ঘর হবে জানিয়ে বলেন, সরাসরি আমি বলে দিয়েছি ‘আমার ঘর লাগবে না’। সশস্ত্র বাহিনী দিবসে বর্তমান সেনা প্রধান আবারো আবেদন দিতে বলেছেন জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আমি বলেছি “স্যার আপনি এখন বলছেন আবেদন দিতে, এখান থেকে চলে যাওয়ার পর আর আবেদন পড়েই থাকবে”। ছোট সন্তানের পীড়াপীড়িতে একটি আবেদন করা হবে জানিয়ে বলেন, ‘শেষ বয়সে একটু ইচ্ছে রয়েছে পাকা ঘরে থাকবো।’

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT