আজ ভয়াল ১২ নভেম্বর, ঘূর্ণিঝড় হেরিকেন তান্ডবের কালো রাত আজ ভয়াল ১২ নভেম্বর, ঘূর্ণিঝড় হেরিকেন তান্ডবের কালো রাত - ajkerparibartan.com
আজ ভয়াল ১২ নভেম্বর, ঘূর্ণিঝড় হেরিকেন তান্ডবের কালো রাত

3:40 pm , November 11, 2022

বিশেষ প্রতিবেক ॥  দেশের বিশাল উপকূলীয় এলাকার সোয়া কোটি মানুষের কাছে ভয়াল বিভীষিকাময় ১২ নভেম্বর আজ। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাস নিয়ে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘হেরিকেন’ আড়াইশ কিলোমিটার বেগে উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৫ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো। সে ঝড়ের কালো রাতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ নিখোঁজ থাকলেও তাদের বেশীরভাগেরই আর কোন সন্ধান মেলেনি। ফুসে ওঠা বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছাস লক্ষাধিক মানুষকে সমুদ্রের অতলে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। ফলে তারা চলে যায় না ফেরার দেশে। বৃহত্তর বরিশাল ও পটুয়াখালী ছাড়াও  লক্ষ্মীপুর সহ উপকূলের ১০টি জেলার বিশাল জনপদকে সে রাতে লন্ডভন্ড করে দিয়ছিলো ভয়াল ঘূর্ণিঝড় । ’৭০ এর ১২ নভেম্বর হেরিকেন এর আঘাতে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর উপকূলে বসবাসরত প্রতিটি পরিবারের কোন না কোন সদস্য নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিলো।
উপকূলের ৭১০কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সে রাতে যে ভয়াবহ বিভীষিকা নেমে এসেছিলো তার নজির এখনো গোটা বিশ্বে বিরল। নভেম্বর এলেই গোটা উপকূলীয় এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে থাকেন। কারণ ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বরের মত ২০০৭-এর ১৫ নভেম্বর রাতেও হেরিকেন এর অনুরূপ আরেক ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ বঙ্গোপসাগর থেকে বিশাল জলোচ্ছাস মাথায় করে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার বেগে বরিশাল, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুরের বিশাল এলাকায় আচড়ে পড়েছিলো।
বাংলাদেশের দক্ষিন সীমানা জুড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশির সঞ্চালন সুনীল ঢেউ-এর মাথায় যে রূপালী উর্মিমালা আলিঙ্গন করছে, বিশ্ব মানচিত্রে তা-ই বঙ্গোপসাগর। পৃথিবীর অন্য সব সাগরের মতই প্রকৃতির সব লীলার সঙ্গিনী হয়ে মেতে আছে আমাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বঙ্গোপসাগর। প্রকৃতির সাথে বঙ্গোপসাগরের বিচিত্র লীলার যে ভয়ঙ্কর রূপ, তার অস্তিত্ব অনুভব করতে গিয়ে বাংলাদেশের উপকূলবাসীকে বার বারই চরম মূল্য দিতে হয়েছে। বঙ্গোপ সাগরে সৃষ্ট নি¤œচাপ পরবর্তী পর্যায়ে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ ধরে ছোবল হানে। সে প্রকৃতির তান্ডব এদেশের উপকূল বাসীকে বার বারই বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। এমনকি প্রকৃতির এ রুদ্ররোষে আজ পর্যন্ত দেশের উপকূল ভাগের কত মানুষ না ফেরার দেশে চলে গেছেন তার কোন সঠিক হিসেবও নেই। একইভাবে প্রকৃতির তান্ডবে উপকূল বাসীর সম্পদের ক্ষতির সীমাও অপরিসীম। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় বার বারই দেশের অর্থনীতিকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।
তবে ঘূর্ণিঝড় হেরিকেন-এর নির্মম অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে তোলা রেড ক্রিসেন্ট-এর ‘ঘূর্ণিঝড় প্রন্তুতি কর্মসূচী-সিপিপি’র প্রায় ৭৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবী উপকূলবাসীকে সময়মত সতর্ক করা এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র সহ বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার ফলে ’৭০-এর হেরিকেন পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলোতে প্রাণহানী আশাতীতভাবে হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে।
বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির কারণ ও এর গতিপথ নির্ণয় সম্ভব হলেও তার নিয়ন্ত্রন আজো মানুষের সাধ্যের বাইরে। তবে সময়মত সতর্ক করার ফলে প্রাণহানী যথেষ্ট হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি টেকশই অবকাঠামো নির্মানের ফলে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিও কিছুটা হ্রাস করা সম্ভব হলেও দক্ষিনাঞ্চল সহ উপকূলীয় কৃষি ব্যবস্থা এখনো প্রকৃতি নির্ভর। আর সে প্রকৃতি, কৃষি নির্ভর উপকূলের অর্থনীতিকে বারবারই বিপর্যস্থ করে দিচ্ছে। ফলে ক্ষুধা আর দারিদ্রতা দক্ষিন উপকূলবাসীর পিছু ছাড়ছে না।
১৯৭০-এর ১২নভেম্বর কালো রাত্রীর সে বিভীষিকা আজো উপকূলের বয়োজ্যেষ্ঠদের তাড়া করে ফিরছে। স্বজনহারা সব বয়সী মানুষ বড় দুঃসহ যন্ত্রনা নিয়েই স্মরন করছেন ভয়াল ১২ নভেম্বরকে। আজ হেরিকেন-এর ছোবলে নিহতদের স্মরণে ভোলা সহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
১২ নভেম্বরের হেরিকেনের তান্ডব গোটা উপকূলের শত শত মাইল জুড়ে শুধু বিধ্বস্ত জনপদে লাশের মিছিল আর জনবসতির ধ্বংসস্তুপের চিহৃ রেখে যায়। হাজার হাজার মানুষ ও গবাদী পশুর মৃতদেহ, আর তার পচা গলা দুর্গন্ধে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকেও চরম মানবিক বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছিলো। তাদের পরনে ছিলো না কাপড়, পেটে ছিলো না খাবার। ছিলো না মাথা গোঁজারও কোন ঠাঁই। ফলে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছিলো।
তারপরেও একের পর এক  প্রকৃতির রুদ্র রোষ থেকে বেঁচে যাওয়া উপকূলের মানুষগুলো প্রকৃতির সাথে লড়াই করেই টিকে আছে আজো । তবে ’৭০-এর সেই স্মৃতি নিয়ে এখনো যারা বেঁচে আছেন, তাদের সকলকেই আজো তাড়া করছে ভয়াল সে স্মৃতি। এমনকি সে রাতে ভয়াল হেরিকেনের তান্ডবের শিকার নিকটজনের লাশও খুঁজে পায়নি হাজার হাজার পরিবার।
ওই দুর্যোগের পরেও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাষক ঘূর্ণি উপদ্রুত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে এসেছিলের ১০দিন পরে। ততদিনে গোট বিশ্বের গণমাধ্যম সরেজমিনে হেরিকেনের তান্ডবের খবর বিস্তারিত প্রচার করে। বিশ্ব বিবেক পাকিস্তানের সামরিক শাষকদের ওই অমানবিক আচরনেরও ধিক্কার জানায়। ঘূর্ণিঝড়ের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী ভোলা সহ ঘূর্ণি উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে ছুটে আসেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ত্রান ও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন ওই দুই নেতা ।  সেদিন প্রকৃতির ভয়াল রুদ্র রোষের শিকার উপকূলীয় জনপদে অবশিষ্ট ছিলো শুধু সাগরের গর্জন এবং মানুষ আর গবাদী পশুর শব মিছিল। আর বিভৎস্য ধ্বংসস্তুপ থেকে ভেসে আসছিলো শুধু স্বজন হারাদের কান্নার রোল। পানি, খাবার আর বসনের অভাবে উপকূলের বেশীরভাগ এলাকার বাতাসই দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে গিয়েছিলো।

এই বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী মিরাজ মাহমুদ
 
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ কুশলা হাউজ, ১৩৮ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়ক,
সদর রোড (শহীদ মিনারের বিপরীতে), বরিশাল-৮২০০।
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by NEXTZEN-IT